এমভি আব্দুল্লাহর ইঞ্জিন ক্যাডেট
হাসান মাহমুদ শাকিল, লক্ষ্মীপুর
প্রকাশ : ১৫ মে ২০২৪ ১৩:৫৩ পিএম
আপডেট : ১৫ মে ২০২৪ ১৫:৩১ পিএম
সোমালিয়ান জলদস্যুদের হাত থেকে মুক্তি পাওয়া জাহাজ এমভি আব্দুল্লাহর ইঞ্জিন ক্যাডেট আইয়ুব খান স্বজনদের পেয়ে উচ্ছ্বসিত। প্রবা ফটো
‘জলদস্যুদের কাছ থেকে আমাদের রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক নোবাহিনী চেষ্টা চালিয়েছিল। তখন জলদস্যুরা আমাদের গান পয়েন্টে (অস্ত্র তাক) রাখত। যুদ্ধ জাহাজ সরে না গেলে মেরে ফেলার হুমকি দিত। দস্যুরা যখন অস্ত্র তাক করে রাখত, তখন মনে হতো এই বুঝি জীবন শেষ। আর বুঝি কখনও মায়ের কোলে ফেরা হবে না।’ বুধবার (১৫ মে) সকালে এমন উৎকণ্ঠার কথা জানিয়েছেন ৩৩ দিন পর সোমালিয়ান জলদস্যুদের হাত থেকে মুক্তি পাওয়া জাহাজ এমভি আব্দুল্লাহর ইঞ্জিন ক্যাডেট আইয়ুব খান।
এদিকে, আইয়ুবকে ফিরে পেয়ে তার মা হোমায়রা বেগমসহ আত্মীয়স্বজনদের মাঝ থেকে আতঙ্ক দূর হয়েছে। তাকে কাছে পেয়ে সবাই এখন উচ্ছ্বসিত। সকাল থেকেই আত্মীয়স্বজনরা তাকে দেখতে বাড়িতে আসা-যাওয়া করছেন।
আইয়ুব লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার সোনাপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের রাখালিয়া গ্রামের মৃত আজহার মিয়ার ছেলে।
আইয়ুব বলেন, ‘একমাস রোজা রাখায় জলদস্যুরা নাবিকদের জাহাজেই ঈদের নামাজ পড়তে দেয়। তবে নামাজরত অবস্থায় পাহারায় রেখেছে জলদস্যুরা। ওই নামাজের ছবি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ায় দস্যুরা নাবিকদের বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেয়। জলদস্যুরা তাদের কোনো ধরনের সহযোগিতা করেনি। খাসি কিংবা গরু জবাইয়ের যে বিষয়টি গণমাধ্যমে উঠে এসেছে তা সত্য নয়। জাহাজে খাবারের জন্য হালাল মাংস রাখা হয়। তা নাবিকদেরই ছিল।’
তিনি বলেন, ‘ঈদের দিন নামাজ পড়তে পারলেও আনন্দ ছিল না। কারণ বন্দিদশা থেকে কবে মুক্ত হব তা নিয়েই দিন গুনতে হয়েছে নাবিকদের। একজন দো-ভাষীর মাধ্যমে নাবিকরা জানতে পেরেছে- জলদস্যুরা জাহাজ মালিকের সঙ্গে কথা বলেছে। মুক্তিপণ নিয়ে দস্যুদের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে। টাকা দিলেই মুক্তি পাবে নাবিকরা। পরে ঈদের ২-৩ দিন পর হেলিকপ্টারের মাধ্যমে মুক্তিপণ নিয়ে যাওয়া হয় জাহাজের কাছে। সেদিনই সবচেয়ে বেশি জলদস্যু ছিল। সবার হাতে অত্যাধুনিক অস্ত্র ছিল। তারা সব নাবিককে জাহাজের ১৫ নম্বর কন্টেইনারের ওপর দাঁড় করায়। তখন জাহাজের ক্যাপ্টেন ভেতরে ছিল। তাকে দেখতে না পেয়ে মুক্তিপণ দেওয়া হচ্ছিল না। পরে তিনি এলে হেলিকপ্টার থেকে মুক্তিপণের ডলারের ব্যাগ জাহাজে ফেলা হয়। এরপর টাকা নিয়ে ভাগ হয়ে যায় জলদস্যুরা। তিনভাগে জাহাজ ছাড়ে দস্যুবাহিনীরা।’
আইয়ুব আরও জানান, ১২ মার্চ বাংলাদেশ সময় দুপুরে ভারত মহাসাগরে জলদস্যুর কবলে পড়ে এমভি আব্দুল্লাহ। ঠিক তখন আইয়ুব ইঞ্জিন কক্ষে ছিলেন। দস্যুরা মৎস্য জাহাজে ছিল। সেখান থেকে স্পিডবোর্ট নামিয়ে আক্রমণ করেন। সবার হাতে অত্যাধুনিক অস্ত্র ছিল। তাদের দেখে জাহাজের সবাই আত্মগোপনে যায়। জাহাজে উঠেই দস্যুরা সবাইকে বের হয়ে আসতে বলে। একপর্যায়ে সবাই বের হয়ে আসে। তাদের আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে ছবি-ভিডিওকল করে বিষয়টি সবাইকে জানাতে সক্ষম হয় নাবিকরা। পরে দস্যুরা তাদের মোবাইলফোনগুলো নিয়ে যায়।
তিনি আরও জানান, ১৫ দিন আগে মুক্তিপণ দিলে দস্যুরা তাদের ছেড়ে দেয়। সেখান থেকে তারা দুবাই সারজা বন্দরে যান। জাহাজের কয়লা হস্তান্তর শেষে তারা দেশের উদ্দেশে রওয়ানা দেন। দুবাই যাওয়ার পর তাদের মাঝ থেকে আতঙ্ক কাটতে থাকে। এরপর মঙ্গলবার (১৪ মে) চট্টগ্রাম বন্দরে এসে আত্মীয়স্বজনদের দেখে উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। যে ঈদ তারা আতঙ্কে কাটিয়েছেন। পরিবার-স্বজনদের পেয়ে সেই ঈদ আনন্দ তাদের মাঝে ফুটে উঠেছে। অবশেষে আইয়ুব তার মায়ের কোলে ফিরে স্বস্তি পেয়েছেন। শান্তির ঘুম দিয়েছেন আপন নীড়ে এসে।
আইয়ুব বলেন, ‘আক্রমণের পর জাহাজের ইঞ্জিন বন্ধ করতে বলে দস্যুরা। এরপর তারা আমাদের সোমালিয়ার দিকে নিয়ে যায়। প্রায় আড়াই দিন লেগেছে সোমালিয়ায় যেতে। প্রথম কয়েকদিন আমাদের সবাইকে একটি রুমে আটকে রাখে। সবাইকে একই বাথরুম ব্যবহার করতে হয়েছে। দস্যুরা প্রথম কয়েকদিন আমাদের খাবার খেয়েছে। সোমালিয়ায় পৌঁছানোর পর তারা নিজেদের খাবার সংগ্রহ করে। আক্রমণের সময় দো-ভাষী ছিল না। সোমালিয়ায় গেলে দস্যুরা দো-ভাষী দেয় আমাদের সঙ্গে কথা বলার জন্য। এদিকে আমাদের কাছে থাকা খাবার ও ফ্রেশ পানি পুরিয়ে আসছিল। বিষয়টি আমরা তাদের বুঝাতে সক্ষম হয়েছি। কারণ ফ্রেশ পানি শেষ হয়ে গেলে আমাদের সমস্যা হতো। আবার জাহাজ চালাতেও ফ্রেশ পানির প্রয়োজন হয়।
মা-সহ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আইয়ুব খান বলেন, ‘প্রচণ্ড ভয়ে আমাদের দিন কাটাতে হয়েছে। আর সবচেয়ে বেশি ভয় হয়েছে মাকে নিয়ে। কারণ বাবাকে হারানোর একমাস পরই বিপদে পড়েছি। এটি কীভাবে মা সহ্য করছেন তা নিয়েই সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা হয়েছিল। এখন মায়ের কোলে ফিরেছি। এ আনন্দ সব কষ্ট, সব ভয় জয় করে নিয়েছে।’
আইয়ুবের খালু শফিকুর রহমান বলেন, ‘দস্যুদের আক্রমণের প্রায় এক মাস আগেই আইয়ুবের বাবা মারা যান। সেই শোক না কাটতেই আইয়ুবসহ ২৩ নাবিক সোমালিয়ার জলদস্যুদের কবলে পড়ে। এতে পুরো পরিবারের ওপর অমাবস্যার অন্ধকার নেমে আসে। ধীরে ধীরে জাহাজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় মুক্তিপণ দিলে আইয়ুবদের ছেড়ে দেওয়া হবে। সেই আশ্বাসেই আইয়ুবদের নিয়ে আতঙ্ক কিছুটা কমে। তার ফিরে আসা সবার জন্য আনন্দের। চট্টগ্রাম গিয়ে তাকে নিয়ে এসেছি।’
আইয়ুবের মা হোমায়রা বেগম বলেন, ‘আইয়ুব আমার কোলে ফিরে এসেছে, এটি আল্লাহর কাছে আমার চাওয়া ছিল। নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করেছি আল্লাহ যেন আইয়ুবসহ সবাইকে ফিরিয়ে দেয়। আল্লাহর কাছে হাজারও শুকরিয়া সবাই সহিহ সালামতে ফিরে এসেছে।’
মঙ্গলবার (১২ মার্চ) বাংলাদেশ সময় দুপুরে ভারত মহাসাগরে জলদস্যুর কবলে পড়ে বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ এমভি আব্দুল্লাহ। এ সময় শিল্পগ্রুপ কেএসআরএমের মালিকানাধীন এসআর শিপিংয়ের জাহাজটি জিম্মি করে নেয় সোমালিয়ান দস্যুরা। এদিন বিকালে জাহাজটি সোমালিয়ার দিকে নিয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া যায়। জাহাজে লক্ষ্মীপুরের আইয়ুব খানসহ মোট ২৩ জন নাবিক ছিল।