রাজু আহমেদ, রাজশাহী
প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৪ ১০:১৬ এএম
আপডেট : ১৩ মে ২০২৪ ১০:২৪ এএম
রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার গণিপুর ইউনিয়নের বাজেকোলা গ্রামের তরফদার পাড়ার ৮ পরিবারকে ঠুনকো অভিযোগে সমাজচ্যুত করে রাখা হয়েছে। রবিবার তোলা। প্রবা ফটো
বিয়ে করলে সমাজের লোকজনকে এক সপ্তাহের মধ্যে একবেলা খাওয়াতে হবে এমন রীতি রয়েছে রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার বাজেকোলা গ্রামে। তবে অভাবের কারণে ছেলেকে বিয়ে দেওয়ার পরে সমাজের লোকজনকে খাওয়াতে পারেননি সাখাওয়াত হোসেন। এজন্য তাকে সমাজচ্যুত করা হয়েছে। তার সঙ্গে মেলামেশার কারণে তার অন্য ভাইদেরও একই অবস্থা করা হয়েছে।
দুই বছর ধরে সমাজচ্যুত হওয়ায় এসব পরিবারের সদস্যরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ চেয়ে গ্রামের মাতব্বরদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে উল্টো মারধরের শিকার হতে হয়েছে। পরে পুলিশ ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিলে সমাজে ফিরিয়ে নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়, কিন্তু এক মাস পার হলেও তা করা হয়নি। তবে মাতব্বরদের দাবি তারা সমাজের নিয়ম মানে না, তাই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সমাজচ্যুত হওয়া আট পরিবার হলো ওই গ্রামের মোজাম্মেল হকের পরিবার, জোনাব আলী, সাজ্জাদ হোসেন, সেলিম হোসেন, আইনুল ইসলাম, কিরন, আবদুল জব্বার ও সাখাওয়াত হোসেনের পরিবার। তারা একই পাড়ার বাসিন্দা ও পরস্পরের আত্মীয়।
ভুক্তভোগী সালাউদ্দিন বলেন, দুই বছর আগে তার বড় ভাইয়ের ছেলে পোশাকশ্রমিক রুবেল হোসেনের বিয়ে হয়। বিয়ের পর সমাজের লোকজনদের একবেলা খাওয়ানোর নিয়ম থাকলেও টাকার অভাবে তিনি তা ওই সময়ে করতে পারেননি। এজন্য সমাজের লোকজনের কাছে সময় চাওয়া হয়। তবে তারা সময় না দিয়ে উল্টো সাখাওয়াতকে সমাজচ্যুত করে। তার সঙ্গে মেলামেশা না করার জন্য সমাজের লোকজনদের নির্দেশ দেওয়া হয়। সমাজের নির্দেশ না মেনে বড় ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক রাখায় তাকে (সালাউদ্দিন) এবং চাচাতো ভাইদেরও একই অবস্থা করা হয়। সেই থেকে আটটি পরিবার সমাজচ্যুত অবস্থায় রয়েছে। তাদের সঙ্গে সমাজের অন্য লোকেরা ভয়ে মেলামেশা করতে পারছে না।
থানায় জমা দেওয়া অভিযোগে গ্রামের চার মাতব্বর রাকিব তালুকদার, আবদুল জলিল, আকবর আলী ও আবদুল জব্বারের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। সমাজচ্যুত সাখাওয়াত হোসেন বলেন, দীর্ঘ দুই বছর ধরে তাদের সামাজিক কোনো কাজে রাখা হচ্ছে না। শুরুতে একসঙ্গে নামাজ আদায় ও গ্রামের মাঠে গবাদিপশু চরানোর বাধা থাকলেও পরে তা তুলে নেওয়া হয়েছে। ফিতরা সামাজিকভাবে আদায় করে পরে তা বণ্টনের নিয়ম থাকলেও দুই বছর ধরে তারা ফিতরা দিতে পারছেন না। সমাজচ্যুতের অজুহাতে তাদের কাছ থেকে ফিতরা নেওয়া হচ্ছে না। ভুক্তভোগী অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক আবদুল জব্বার মোল্লাহ কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আটটি পরিবারকে সমাজচ্যুত করার কারণে সামাজিকভাবে হেয় হচ্ছেন। আত্মীয়-স্বজনেরাও যেমন খারাপ দৃষ্টিতে দেখছেন এবং গ্রামের লোকজন সমাজচ্যুত হওয়ার ভয়ে তাদের সঙ্গে প্রকাশ্যে মেলামেশা করতে পারছেন না। তাদের নাতি ও স্বজনদেরও নানা কথা শুনতে হচ্ছে।
এলাকায় গিয়ে লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আটটি পরিবারের সদস্যরা মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক গৃহবধূ বলেন, তারাও মিশতে চান তবে সমাজের ভয়ে পারেন না। পাশের রঘুপাড়া গ্রামের স্কুলশিক্ষক রহিদুল ইসলাম বলেন, সমাজের মাতব্বরেরা কাজটি ঠিক করেননি। তিনি সমাজপতিদের বিষয়টি সুরাহার জন্য বলেছেন একাধিকবার।
এসব বিষয়ে মাতব্বরদের পক্ষে রাকিব তালুকদার বলেন, দুই বছর আগে তাদের সমাজচ্যুত করা হয়েছে। তারা সমাজের নিয়ম মানে না, বিশৃঙ্খলা তৈরি করে। তাদের একসঙ্গে নামাজ আদায়সহ অন্যান্য কাজ করতে কোনো বাধা দেওয়া হয় না। বাগমারা থানার ওসি অরবিন্দ সরকার এ-সংক্রান্ত দুটি আলাদা লিখিত অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করে জানান, অভিযোগটি তদন্ত করার জন্য একজন উপপরিদর্শককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তারা স্থানীয়ভাবে বসে সুরাহার আশ্বাস দিয়েছিলেন। তবে এখনও কেন করা হয়নি তা দেখা হচ্ছে।
গতকাল (শনিবার) সন্ধ্যায় মাগরিবের নামাজের আগে স্থানীয় বাজেকোলা ঈদগাহ মাঠে মিমাংসার জন্য বৈঠকে বসেন মাতব্বররা। তবে সেখানে মিমাংসা না করে আবারও তাদের লাঞ্ছিত করা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।