কাওছার আহমদ, সিলেট
প্রকাশ : ১২ মে ২০২৪ ১৩:৪৫ পিএম
সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী। ছবি : সংগৃহীত
সিলেট নগরীতে নতুন গৃহকর (বার্ষিক গৃহকর) বাতিলের দাবিতে দল-মত নির্বিশেষে এক কাতারে দাঁড়িয়েছেন নগরবাসী। এতে বেকায়দায় পড়েছেন সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী। সিসিক কর্তৃক নতুন ধার্যকৃত বার্ষিক গৃহকর অস্বাভাবিকভাবে কয়েকশ গুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে নতুন গৃহকর নিয়ে নগরবাসীকে উদ্বিগ্ন না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সিটি মেয়র মো. আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী।
সিসিক সূত্র জানায়, এক লাফে নতুন গৃহকর (বার্ষিক গৃহকর) ৫ থেকে ৫০০ গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে সিসিক। এতে নগরজুড়ে ক্ষোভ বিরাজ করছে। অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি করা এ গৃহকর বাতিলের দাবিতে প্রতিদিন নগরীতে প্রতিবাদ মিছিল, মানববন্ধন ও লিফলেট বিতরণ করছে বিভিন্ন সংগঠন। নতুন নির্ধারিত এ গৃহকরকে অযৌক্তিক দাবি করে বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে রাজপথে নেমে এসেছেন সাধারণ মানুষও। আগামীকাল সোমবার দুপুর ২টায় নগরীর ঐতিহাসিক কোর্ট পয়েন্টে সিলেটের নাগরিক বৃন্দ নামের সংগঠনের ব্যানারে আবারও বড় ধরনের সমাবেশ করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সমাবেশটি সফল করতে সিটি করপোরেশন এলাকার সকল নাগরিকের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। ওই সমাবেশ থেকে মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর কাছে স্মারকলিপি প্রদান করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সিসিক সূত্র জানায়, পঞ্চবার্ষিক কর পুনর্মূল্যায়নের পর গত ৩০ এপ্রিল হোল্ডিং ট্যাক্সের নতুন তালিকা প্রকাশ করে সিসিক। নতুন তালিকায় হোল্ডিং ট্যাক্স আবাসিক ভবনের প্রতি বর্গফুট ৫ টাকা ও বাণিজ্যিক ভবনের প্রতি বর্গফুটের জন্য ৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে আবাসিক ভবনের প্রতি বর্গফুট ৩ টাকা ও বাণিজ্যিক ভবনের প্রতি বর্গফুটের জন্য ৫ টাকা নির্ধারিত ছিল, যদিও মেয়রের কাছে আবেদন করে অনেকে এর চেয়ে কম ট্যাক্স দিতেন।
সিসিকের রাজস্ব শাখা সূত্র জানায়, ২০১৯-২০ সালে মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান শেষে হোল্ডিং সংখ্যা পুনর্নির্ধারিত হয়। এতে নগরের পুরোনো ২৭টি ওয়ার্ডে হোল্ডিং নির্ধারিত হয় ৭৫ হাজার ৪৩০টি। এসবের ট্যাক্স আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ১১৩ কোটি ২৭ লাখ ৭ হাজার ৪০০ টাকা। নতুন হোল্ডিং ট্যাক্স ধার্যের সময় ধরা হয় ২০২১-২২ সাল। সেই করারোপের তালিকাই ৩০ এপ্রিল প্রকাশ করা হয়েছে। তবে সিটি করপোরেশনে নতুনভাবে যুক্ত হওয়া ১৫টি ওয়ার্ডের হোল্ডিং ওই তালিকায় আসেনি।
রাজস্ব শাখার সূত্র আরও জানায়, নগরের ভবনগুলোর আয়তন ও ধরন অনুযায়ী নতুনভাবে ট্যাক্স নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এতে কারও আপত্তি থাকলে তারা ১৪ মে পর্যন্ত আবেদন করে জানাতে পারবেন। আবেদন রিভিউ বোর্ডে শুনানির মাধ্যমে যৌক্তিকভাবে নিষ্পত্তি করা হবে। এরপরও রিভিউ বোর্ডের নিষ্পত্তির ওপর কারও আপত্তি থাকলে বিভাগীয় কমিশনার বরাবর আপিল করার সুযোগ আছে। তবে সিটি করপোরেশনের এই অ্যাসেসমেন্টকে ত্রুটিপূর্ণ ও অযৌক্তিক বলে দাবি করছেন নগরের বাসিন্দারা। নগরীর লামাবাজার এলাকায় বাসা রুবেল আহমদের। আগে তাকে বছরে হোল্ডিং ট্যাক্স দিতে হতো ৮০০ টাকা। তবে পুনর্মূল্যায়নের পর তার হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারিত হয়েছে ১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। ফলে তার হোল্ডিং ট্যাক্স বেড়েছে দুইশ গুণেরও বেশি।
এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে রুবেল আহমদ বলেন, গত ৮-১০ বছরে আমার বাসার কোনো পরিবর্তন হয়নি। একই রকমই আছে। তবু ট্যাক্স দুইশ গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এটা একেবারেই অযৌক্তিক। হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণে সিটি করপোরেশনের অ্যাসেসমেন্টকে ত্রুটিপূর্ণ দাবি করে তিনি বলেন, মাঠ পর্যায়ে অ্যাসেসমেন্ট করে ট্যাক্স পুনর্নির্ধারণের কথা বলা হলেও আদতে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে যাননি। অফিসে বসেই ইচ্ছামাফিক তারা কর নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
কেবল রুবেল আহমদ নয়, এমন অভিযোগ নগরীর প্রায় সব ভবন মালিকদেরই। পুনর্নির্ধারিত হোল্ডিং ট্যাক্স সম্পর্কে অবহিত ও আপত্তি গ্রহণ করতে নগর ভবনের সামনে আলাদা বুথ স্থাপন করেছে সিসিক। প্রায় প্রতিদিনই অসংখ্য মানুষ এই বুথে ভিড় করেছেন। তারা সবাই নতুন নির্ধারিত হোল্ডিং ট্যাক্স নিয়ে আপত্তি জানাচ্ছেন।
সিলেট ডায়াবেটিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক লোকমান আহমেদ বলেন, নগরবাসীর সঙ্গে আলোচনা করে সহনীয় পর্যায়ে হোল্ডিং ট্যাক্স বৃদ্ধি করলে এ জটিলতা সৃষ্টি হতো না।
নগর কর্তৃপক্ষ বলছে, নতুন হোল্ডিং ট্যাক্স সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর মেয়াদকালেই নির্ধারণ করা হয়। বর্তমান পরিষদ তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে গত বৃহস্পতিবার বিকালে সংবাদ সম্মেলনে আসেন আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি বর্ধিত হোল্ডিং ট্যাক্সের বিষয়ে তার ওপর আনা অভিযোগ প্রসঙ্গে বলেন, সিটি করপোরেশনে আমার মেয়াদে নতুন করে হোল্ডিং ট্যাক্স বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে করোনা পরিস্থিতি, দ্রব্যমূল্যেরে ঊর্ধ্বগতি বিবেচনা করে সেটা আর বাস্তবায়ন করা হয়নি। আমি সেটি স্থগিত করেছিলাম।
সাবেক মেয়র বলেন, হোল্ডিং ট্যাক্স বাড়ানোর আগে সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে আলাপ করা উচিত ছিল। সে ক্ষেত্রে গণশুনানি করে হোল্ডিং ট্যাক্স বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যথার্থ হতো। তাই বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় বর্ধিত হোল্ডিং ট্যাক্স আদায় স্থগিত করা উচিত।
নতুন গৃহকর বাতিলের দাবিতে যত প্রতিবাদ
নতুন এই গৃহকর বাতিলের দাবিতে ৩০ এপ্রিলের পর থেকে প্রতিদিনই নগরীতে বিক্ষোভ করছে বিভিন্ন সংগঠন। সিটি মেয়রের কাছে স্মারকলিপি দিয়েও এই দাবি জানানো হচ্ছে। সিলেট চেম্বার, মেট্রোপলিটন চেম্বার, সিলেট রিয়েল এস্টেট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে পৃথক বিবৃতি দিয়েও হোল্ডিং ট্যাক্স বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত স্থগিত করে নতুন করে অ্যাসেসমেন্টের দাবি জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া বিএনপি, জাসদ, বাসদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল পৃথক বিবৃতির পাশাপাশি পৃথক কর্মসূচিও পালন করেছে।
গত বৃহস্পতিবার সিলেটের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে সিলেটের নাগরিক বৃন্দের ব্যানারে প্রতিবাদী মানববন্ধন ও সমাবেশ হয়। একই দাবিতে গত শুক্রবার দুপুরে নগরীর শিবগঞ্জ এলাকায় মানববন্ধন হয়। এতে মোতাওয়াল্লি আলহাজ্ব মহিবুস সাকুর ও আজিজুস সাকুরসহ এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজন বক্তব্য দেন। এ ছাড়া বাসদের জেলা শাখার উদ্যোগে গণসংযোগ ও লিফলেট বিতরণ করা হয়। জেলা বাসদের আহ্বায়ক আবু জাফরের নেতৃত্বে শুক্রবার বিকালে বড়বাজার, ইলেকট্রিক সাপ্লাই রোড এলাকায় সর্বসাধারণের মধ্যে লিফলেট বিতরণ করা হয়। অস্বাভাবিক হোল্ডিং ট্যাক্স বৃদ্ধির তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরও। বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে দেওয়া এক বিবিৃতিতে অবিলম্বে এই অস্বাভাবিক ট্যাক্স প্রত্যাহারের দাবি জানান তিনি।
এ বিষয়ে সিসিকের প্রধান রাজস্ব মো. মতিউর রহমান খান বলেন, নতুন হোল্ডিং ট্যাক্স নিয়ে কারও আপত্তি থাকলে ১৪ মে পর্যন্ত আপত্তি জানাতে পারবেন। পরে রিভিউ বোর্ডে শুনানির মাধ্যমে তা নিষ্পত্তি করা হবে।
সিটি মেয়র মো. আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘২০১৯-২০ সালে ভবনগুলোর আয়তন ও ধরন অনুযায়ী নতুনভাবে হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে হোল্ডিং ট্যাক্স নিয়ে যদি কোনোরূপ অসংগতি কিংবা অমিল পাওয়া যায়, অবশ্যই ফরম ডি-এর মাধ্যমে আপত্তি জানিয়ে আবেদন করার ব্যবস্থা রয়েছে। জনগণের ভোগান্তি বা কষ্ট হয়, এমন কোনো কাগজে আমি স্বাক্ষর করব না।’