বগুড়া অফিস
প্রকাশ : ১১ মে ২০২৪ ১৬:২৩ পিএম
বাঁয়ে অরুণ কান্তি রায় ও ডানে রফি নেওয়াজ রবিন। ছবি কোলাজ : প্রবা
বগুড়ার গাবতলীতে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে প্রভাবশালী নেতা হিসেবে পরিচিত রফি নেওয়াজ খান রবিন। একবার ইউনিয়ন পরিষদ এবং একবার উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন সাবেক এই ছাত্রলীগ নেতা। সদ্য অনুষ্ঠিত প্রথম ধাপের উপজেলা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নবাগত এক প্রার্থীর কাছে পরাজিত হয়েছেন তিনি। তার এই পরাজয় ভাবিয়ে তুলছে জেলার অন্য উপজেলায় প্রতিদ্বন্দ্বী পোড় খাওয়া নেতাদের। আগামী ২১ মে থেকে ৫ জুনের মধ্যে তিনটি ধাপে জেলার আরও ৯টি উপজেলা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হবে। অবশ্য রবিনের পরাজয়ের পেছনে দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে দূরত্ব বজায়, ত্যাগীদের বাদ দিয়ে নিজের লোকদের সুবিধা পাইয়ে দেওয়াসহ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন স্থানীয় রাজনীতিকরা।
বগুড়া পৌরসভা আওয়ামী লীগের সভাপতি রবিন ২০১৯ সালে দেড় লাখ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছিলেন। পাঁচ বছরের ব্যবধানে সেই রবিনই এবার নবাগত প্রার্থীর কাছে পরাজিত হয়েছেন। রবিনের পরাজয়ের কারণ খোঁজার চেষ্টা করেছে প্রতিদিনের বাংলাদেশ। স্থানীয় রাজনীতিক ও সাধারণ ভোটাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূলত রবিনের প্রতি দলের নেতাকর্মীদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভই তার পরাজয়ের কারণ। তারা বলছেন, ত্যাগী নেতাকর্মীরা সুযোগ পেয়ে রবিনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন।
গাবতলী উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হয় গত বুধবার। নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশ বিষয়ক উপকমিটির সদস্য অরুণ কান্তি রায় সিটন। তিনি ঘোড়া প্রতীকে পেয়েছেন ৪১ হাজার ৬০৯ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী রবিনের আনারস প্রতীকে ভোট পড়ে ৩৯ হাজার ৭৫২টি। এর আগে ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে রবিন প্রায় দেড় লাখ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছিলেন। তখন প্রথমে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছিলেন রবিনের শ্বশুর আযম খান। তার আকস্মিক মৃত্যু হলে রবিনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। নেতাকর্মীরাও রবিনকে ‘উপযুক্ত নেতা’ হিসেবে বেছে নেন।
স্থানীয় নেতাকর্মীরা জানান, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে গাবতলী উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটি গঠন হয়। ত্যাগীদের বাদ দিয়ে রবিন তার শ্যালক ফয়সাল খান জনিকে সাধারণ সম্পাদক পদে বসান। সভাপতি করেন তারই আস্থাভাজন মোস্তফা আব্দুর রাজ্জাক মিলুকে। ‘পকেট কমিটি’ গঠনের কারণে ত্যাগী নেতাকর্মীরা রবিনের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে তৃণমূলেও। এমনকি যুবলীগ এবং ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েন।
অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা চেয়ারম্যান থাকাকালে পছন্দের নেতাকর্মী ও স্বজন ছাড়া রবিনের কাছ থেকে কেউ সুযোগ-সুবিধা পাননি। উল্টো দাম্ভিক আচরণ দেখিয়েছেন রবিন। দিনে দিনে জন্ম নেওয়া ক্ষোভ ও বিরক্তি থেকে ওই পক্ষগুলো নিজেদের অস্তিত্ব ও মর্যাদা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে ‘রবিন ঠেকাও’ মিশন নিয়ে মাঠে নেমে পড়ে। দলীয় প্রতীক ছাড়া উপজেলা নির্বাচন আয়োজনকে তারা মোক্ষম সুযোগ হিসেবে বেছে নেয়। তারা রবিনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারেÑ এমন যেকোনো একজনকে সমর্থন দেওয়ার পরিকল্পনা করে। সেক্ষেত্রে তারা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা সিটনকে বেছে নেয়। বিএনপি নেতাকর্মীরাও গোপনে রবিন ঠেকাও মিশনে শরিক হয়। স্থানীয় নেতারা ওয়ার্ড পর্যায়ের কর্মীদের রবিনের বিপক্ষে কাজ করার নির্দেশনা দেন।
দলীয় সূত্রগুলো জানায়, এবার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রতীক না দেওয়ায় তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বেঁকে বসতে পারেনÑ এটা আঁচ করতে পেরেছিলেন রবিন। ভোটের আগে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য জেলা আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার হস্তক্ষেপ কামনা করেছিলেন তিনি। কিন্তু তাতেও আশানুরূপ সাড়া মেলেনি। এমন পরিস্থিতিতে চরম বেকায়দায় পড়ে রবিন তার জয় নিশ্চিত করতে বিকল্প হিসেবে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করার পরিকল্পনা করেন।
অভিযোগ রয়েছে- ৯৮টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে রবিন অন্তত ৩০টি কেন্দ্রের প্রিসাইডিং, সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকে তার পক্ষে কাজ করাতে চেয়েছিলেন। নির্বাচন চলাকালে গাবতলী উপজেলার রামেশ্বরপুর ইউনিয়নের মাঝপাড়া কুসুমকলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও সোনারায় উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে তার পক্ষে জাল ভোট দেওয়ার ঘটনা ধরা পড়ায় বিষয়টি জানাজানি হয়। ৩০০টি জাল ভোট দেওয়ার অপরাধে ৫০ হাজার টাকাসহ আটক এমদাদ হোসেন নামে রবিনের এক এজেন্টকে আদালত এক বছর কারাদণ্ড দেন। এ ছাড়া শাজাহান আলী, হাফিজার রহমান, আব্দুল মোত্তালিব ও এটিএম আমিনুল ইসলাম নামে অপর চার নির্বাচনী কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে প্রশাসন।
এ ব্যাপারে গাবতলী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আব্দুস সালাম ভুলন বলেন, রবিন দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের বাদ দিয়ে আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে রাজনীতি করেছেন। অপমানে-দুঃখে আমার মতো অনেক প্রবীণ নেতা রাজনীতি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু পারেননি। ত্যাগী নেতাকর্মীরা কেউ এবারের নির্বাচনে রবিনের পক্ষে ছিল না। ইউপি চেয়ারম্যানরাও তার পক্ষে ছিল না।
তবে রবিনের পরাজয়ের পেছনে দলের নেতাকর্মীদের ক্ষোভ রয়েছেÑ এমনটা মানতে নারাজ গাবতলী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোস্তফা আব্দুর রাজ্জাক মিলু। তিনি মনে করেন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের হওয়ায় তাদের সিংহভাগ ভোট পেয়েছেন সিটন। এ কারণে তিনি বিজয়ী হয়েছেন।