জ্বালানি তেল সরবরাহ
হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ১১ মে ২০২৪ ১৬:০৩ পিএম
গভীর সমুদ্রে জাহাজ থেকে পাইপলাইনে সরাসরি চট্টগ্রামে তেল নিয়ে আসার পর এবার পাইপলাইনে চট্টগ্রাম থেকে জ্বালানি তেল যাবে ঢাকায়। ছবি : সংগৃহীত
জ্বালানি তেল পরিবহনে আরেকটি মাইলফলক ছুঁতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। গভীর সমুদ্রে জাহাজ থেকে পাইপলাইনে সরাসরি চট্টগ্রামে তেল নিয়ে আসার পর এবার পাইপলাইনে চট্টগ্রাম থেকে জ্বালানি তেল যাবে ঢাকায়। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ডিসেম্বরেই চট্টগ্রাম থেকে পাইপলাইনে ঢাকায় জ্বালানি তেল পরিবহন করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এর আগে কক্সবাজারের মহেশখালী থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত পাইপলাইন সফলভাবে চালু হয়েছে।
চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় পাইপলাইনে জ্বালানি তেল পরিবহন প্রকল্পের পরিচালক মো. আমিনুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার ফতুল্লা পর্যন্ত ২৫০ কিলোমিটার পাইপলাইন বসানোর কাজ শেষ। গত ফেব্রুয়ারি মাসে কাজ শেষ হয়। এখন শুধু প্রকল্পের আওতায় নির্মাণ করা বিভিন্ন স্টেশনে যন্ত্রপাতি স্থাপনের কাজ বাকি আছে। এগুলো সেপ্টেম্বরের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। এরপর অক্টোবর মাসে পাইপলাইনের কমিশনিং করার পর ডিসেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে চট্টগ্রাম থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি তেল পরিবহন।’
কক্সবাজার জেলার মহেশখালী গভীর সমুদ্রে জাহাজ থেকে জ্বালানি তেল সংগ্রহের পর পাইপলাইনে প্রথমে মহেশখালী কালারমারছড়া রিজার্ভ ট্যাংকে চলে আসবে তেল। সেখান থেকে একই প্রকল্পের আওতায় স্থাপন করা পাইপলাইনে তেল আনা হবে চট্টগ্রাম নগরীর পতেঙ্গা এলাকায় ইস্টার্ন রিফাইনারিতে। সেখান থেকে পাইপলাইনে সরাসরি চলে যাবে ঢাকায়।
দেশের সামগ্রিক চাহিদার পুরো তেল আমদানি হয় চট্টগ্রাম দিয়ে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে বড় জাহাজে করে তেল চট্টগ্রামে নিয়ে আসার পর সেখান থেকে ছোট ছোট অয়েল ট্যাংকারে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হয়। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে দেশে জ্বালানি তেলের চাহিদা ৫৮ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকা ও তার আশপাশের এলাকার চাহিদা ১৫ লাখ মেট্রিক টন। শুধু ডিজেলের চাহিদা ১২ লাখ মেট্রিক টন। এতদিন বিপুল পরিমাণ এই জ্বালানি তেল সড়ক ও নৌপথে ট্যাংকারে পরিবহন করা হতো। কিন্তু বৈরী পরিবেশের কারণে বিভিন্ন সময় তেল পরিবহন বাধাগ্রস্ত হতো। অন্যদিকে মাঝেমধ্যে অয়েল ট্যাংকার দুর্ঘটনার কবলে পড়ে তেল নদীতে পড়ে পরিবেশের ক্ষতি হতো। তাই জ্বালানি তেল পরিবহন সহজ, সুষ্ঠু, নিরবচ্ছিন্ন এবং দ্রুত সময়ে পরিবহনের জন্য ২০১৬ সালে চট্টগ্রামের পতেঙ্গার গুপ্তখাল থেকে ঢাকার ফতুল্লা পর্যন্ত পাইপলাইনে তেল পরিবহনের উদ্যোগ নেয় বিপিসি।
ওই বছর অক্টোবরে প্রকল্পটি একনেক সভায় পাস হয়। এরপর ২০১৭ সালের ১৪ ডিসেম্বর প্রকল্পটি পদ্মা অয়েল কোম্পানির তত্ত্বাবধানে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে বাস্তবায়নের জন্য নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। পদ্মা অয়েল কোম্পানির পক্ষে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ করছে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড। ওই সময় ২০২০ সালের ৩০ জুনের মধ্যে প্রকল্প শেষ করার কথা থাকলেও সেটি সম্ভব হয়নি। ইতোমধ্যেই প্রকল্পটির ৮৫ শতাংশ কাজ শেষ।
প্রকল্প পরিচালক মো. আমিনুল হক বলেন, ২৫০ কিলোমিটার পাইপলাইনের মধ্যে চট্টগ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল পর্যন্ত ২৪১ দশমিক ২৮ কিলোমিটার পর্যন্ত ১৬ ইঞ্চি ব্যাসের ভূগর্ভস্থ পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন স্থাপন এবং গোদনাইল থেকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা পর্যন্ত ৮ দশমিক ২৯ কিলোমিটার ১০ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপলাইন স্থাপনের কাজ গত ফেব্রুয়ারি মাসে শেষ হয়েছে। এর বাইরে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে একটি, মিরসরাই উপজেলার গোপীনাথপুরে একটি, চৌদ্দগ্রামের রতনদিয়া, চাঁদপুরের কচুয়া এবং মুন্সীগঞ্জের হোসেনদি এলাকায় একটি করে মোট পাঁচটি এসভি স্টেশন স্থাপনের কাজ একেবারে শেষ পর্যায়ে। প্রকল্পের আওতায় একটি ডিসপাস টার্মিনাল, একটি ইন্টারমিডিয়েট পিকিং টার্মিনাল এবং একটি রিসিভ টার্মিনাল নির্মাণ করা হচ্ছে। এর বাইরে কুমিল্লায় ২০ হাজার মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার একটি পেট্রোলিয়াম ডিপো নির্মাণ করা হচ্ছে। এগুলোর কাজও প্রায় শেষ।’
তিনি আরও বলেন, ‘চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত স্থাপিত পাইপলাইনটি চালু হলে দেশের জ্বালানি তেল পরিবহনে একটি আমূল পরিবর্তন আসবে। সময় এবং অর্থ দুটোর সাশ্রয় হবে। পরিবহনের সময় জ্বালানি তেলের যে অপচয় হতো সেটিও এখন আর হবে না।’