রিকোর্স চাকমা, রাঙামাটি
প্রকাশ : ১১ মে ২০২৪ ১৫:৪৫ পিএম
সাজেক থেকে গত বছর ডায়রিয়া আকান্ত এক রোগীকে কম্বল আর বাঁশের সাহায্যে কাঁধে বহন করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। প্রবা ফটো
পার্বত্য জেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকাগুলোয় আজও পৌঁছেনি আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা। ওদিকে সমাজে প্রচলিত আছে গভীর কুসংস্কার। বৈদ্য-কবিরাজি চিকিৎসার ওপর নির্ভরশীল তারা। এর ফল অতিসাধারণ রোগে এ যুগেও প্রাণ হারাচ্ছে পাহাড়িরা।
সাম্প্রতিক সময়ে রাঙামাটির বরকল উপজেলার ভূষণছড়া ইউনিয়নের দুর্গম চান্দবীঘাট পাড়ায় বাবা-মেয়েসহ পাঁচজনের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে অজ্ঞাত রোগে মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে পাহাড়ে। স্থানীয়রা গ্রামের একটি পুরোনো বটগাছ কেটে ফেলার কারণে তাদের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করেছিল। অজ্ঞাত রোগে প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ মারা যাচ্ছে বলে খবর ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনার পর স্বাস্থ্য বিভাগের একটি চিকিৎসক দল যায় সেই চান্দবীঘাটে। রোগের লক্ষণ দেখে জানা যায় পাঁচজনেরই মৃত্যু হয়েছিল স্বাভাবিক রোগে। অথচ গ্রামে ভূতে ভর করার গুজবে আতঙ্কে ছড়িয়ে।
ওই সময় চান্দবীঘাট পাড়া থেকে ফিরে এসে মেডিকেল টিমের প্রধান বরকল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মংক্যছিং মারমা সাগর জানিয়েছিলেন, যারা মারা গেছেন তারা স্বাভাবিক রোগেই মারা গেছেন। তাদের কারও লিভার, কিডনি ও প্যারালাইসিসজনিত জটিলতা ছিল। আর যারা তখন অসুস্থ ছিলেন, তারাও সর্দি, কাশি, জ্বর নিয়ে ভুগছিলেন। গ্রামের মানুষ বৈদ্যদের দিয়ে কবিরাজি চিকিৎসা করে লতা-পাতা সিদ্ধ করে খাওয়ানোর ফলে তারা এই সমস্যায় পড়েছিল।
শুধু বরকলের চান্দবীঘাটে নয়; রাঙামাটির দুর্গম উপজেলাগুলোয় প্রতি বছরই পানিবাহিতসহ অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃতের খবর পাওয়া যায়। বিশেষত আয়তনে জেলার সবচেয়ে বড় উপজেলা বাঘাইছড়ির সাজেক ইউনিয়ন, জুরাছড়ির দুমদুম্যা ও মৈদং এবং বিলাইছড়ি উপজেলার বড়থলি ইউনিয়নের বাসিন্দারা ডায়রিয়াসহ অন্য পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়। ওইসব এলাকায় সুপেয় পানির সংকট বছরজুড়েই থাকে। গ্রামের মানুষ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হলেও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় দুর্গম এলাকার বাসিন্দারা উপজেলা সদরে এসে চিকিৎসা নিতে না পারায় অসুস্থ হয়েই মারা যায়।
কুসংস্কারের ওপর বিশ্বাস রাখায় অনেকেই সরকারি চিকিৎসা কিংবা টিকা গ্রহণ করতে চায় না। কুসংস্কারের ফলে টিকাভীতিসহ নানা কারণেই এসব এলাকার মানুষ চিকিৎসাসেবার বাইরে রয়েছে। পাহাড়ে উপজেলা পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও সেগুলো দূরে হওয়ায় সেখানে গিয়ে স্থানীয়রা চিকিৎসা থেকে বিরত থাকে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, প্রতি বছর রাঙামাটিসহ তিন পার্বত্য জেলার পাহাড়ি বিভিন্ন প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ ডায়রিয়াসহ পানি ও মশাবাহিতসহ বিভিন্ন রোগে মারা যায়। চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার অপ্রতুলতা ছাড়াও তারা বৈদ্য-কবিরাজ ও গাছগাছালি পূজা করে। এতে সাধারণ অসুস্থ হয়েও চিকিৎসার অভাবে মারা যাচ্ছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা ম্যালেরিয়ার ‘রেড জোন’ বা ‘হট স্পট’ হিসেবে পরিচিত। তবে ২০১৭-২৩ সাল পর্যন্ত রাঙামাটিতে ম্যালেরিয়া আক্রান্ত হয়ে কারও মৃত্যু হয়নি। কিন্তু এ জেলায় ম্যালেরিয়া আক্রান্ত রোগীর ৯০ শতাংশই পাওয়া যাচ্ছে সীমান্ত এলাকায়। জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচির রাঙামাটির দায়িত্বপ্রাপ্ত সার্ভিল্যান্স মেডিকেল অফিসার ডা. এন্ড্রু বিশ্বাস জানান, শহর এলাকায় মশা ও মশার জীবাণু নির্মূলে কার্যক্রম থাকলেও সীমান্তবর্তী এলাকায় সেটি নেই। গহিন জঙ্গলের কারণে মশার বিস্তার বেড়েই চলেছে।
চলতি বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি রাঙামাটির সাজেক ইউনিয়নে শিয়ালদহলুই মৌজায় দুটি আঞ্চলিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. প্রবীর খিয়াং বলেন, পাহাড়ের প্রত্যন্ত এলাকায় এখনও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যায় হয়নি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দুর্গম এলাকার মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে থাকে ভুল চিকিৎসা নয়তো কুসংস্কারের কারণে। রাঙামাটির সাবেক সিভিল সার্জন ডা. নীহার রঞ্জন নন্দী জানিয়েছেন, দুর্গম পাহাড়ি এলাকার মানুষ এখনও কুসংস্কারে বিশ্বাসী। তারা অসুস্থ হলে বৈদ্য-কবিরাজের দ্বারস্থ হয় এবং নদীর পাড়ে পূজা করে। স্বাস্থ্যসেবায় অপ্রতুলতার কারণে সবখানে চিকিৎসাসেবাও পৌঁছানো যায়নি।