গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প
ভেড়ামারা (কুষ্টিয়া) সংবাদদাতা
প্রকাশ : ০৮ মে ২০২৪ ১৭:০১ পিএম
প্রকল্পের তিনটি পাম্প অচল হয়ে পড়ায় খালে পানি সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়। প্রবা ফটো
পদ্মায় পানি কম থাকায় কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় অবস্থিত দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে কর্তৃপক্ষ। এর আগে এ প্রকল্পের তিনটি পাম্প অচল হয়ে পড়ায় খালে পানি সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়। বর্তমানে একটি পাম্প সচল থাকলেও পদ্মা নদীতে স্তর নেমে যাওয়ায় কৃষিজমিতে পানি সরবরাহ করা যাচ্ছে না।
সেচ প্রকল্প পুনরায় কবে চালু হবে তা বলতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। তবে পদ্মায় পানিপ্রবাহ না বাড়া পর্যন্ত সেচ চালুর সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন পাম্প হাউসের নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান।
মিজানুর রহমান বলেন, জিকে সেচ প্রকল্পের প্রধান পানির উৎস পদ্মা। পদ্মায় পানি কমে গেছে। পাম্প চালু করতে প্রয়োজন নদীর সঙ্গে যুক্ত ইনটেক চ্যানেলে ন্যূনতম পানির স্তর ৪ দশমিক ৫ মিটার রিডিউসড লেভেল (আরএল) থাকতে হয়। কিন্তু বর্তমানে নদীতে প্রয়োজনীয় পানির স্তর নেই। পানির স্তর বৃদ্ধি পেলে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, পানির স্তর নির্দিষ্ট পরিমাণের নিচে নামলে পাম্প মেশিনের কয়েল ও বিয়ারিংয়ের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এতে মেশিনে শব্দ ও ঝাঁকুনি হয়। এসব সমস্যার কারণে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় পাম্প বন্ধ রাখা হয়েছে।
পাবনা জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড ও উত্তরাঞ্চল পানি পরিমাপক বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী মোফাজ্জল হোসেন জানান, পদ্মায় পানি কমেছে। গতকাল (রবিবার) হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পানির লেভেল ৪ দশমিক ৩০ মিটার ছিল। আপাতত পানির স্তর কমের দিকে বলেও জানান তিনি।
সেচ প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, জিকে প্রকল্পের আওতায় চলতি বোরো মৌসুমে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও মাগুরাÑ এই চার জেলার ১৩টি উপজেলার ১৯৪ কিলোমিটার প্রধান খালের মাধ্যমে ১০ মাস পানি দেওয়ার কথা ছিল। যথাসময়ে পানি সরবরাহ না হওয়ায় সেচ প্রকল্পাধীন এলাকার প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমিতে ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার পাশাপাশি খরচ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এদিকে প্রকল্পের পানি না পেয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা।
জিকে সেচ প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, চার জেলার কৃষির গুণগত মান বৃদ্ধি, স্বল্প ব্যয় ও উৎপাদন বাড়ানো ছিল এই প্রকল্পের লক্ষ্য। চার জেলার ১৩ উপজেলার ৪ লাখ ৮৮ হাজার একর জমি প্রকল্পের আওতাধীন ছিল প্রথমদিকে। পরে প্রকল্পের এলাকা আস্তে ধীরে কমে আসে।
২০২১ সালের জানুয়ারিতে সেচ সুবিধা দিতে জিকে সেচ প্রকল্পের দুটি পাম্প চালু করা হয়। কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মাগুরা ও ঝিনাইদহের কৃষকদের এই সুবিধা দেওয়ার কথা ছিল। এগুলো একযোগে সেকেন্ডে ১ হাজার ২০০ কিউসেক পানি সরবরাহে সক্ষম। চালুর পর থেকে পাম্প দুটি ১০ মাস পানি সরবরাহ করে। এর মধ্যে দুটি পাম্প অচল হয়ে যায়। পরে একটি মেরামত করা হয়।
ভেড়ামারা উপজেলার চাঁদগ্রাম এলাকার কৃষক ও পানি ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি বুলবুল কবির বলেন, ‘আমার ধানের জমিতে পানির দরকার কিন্তু পাচ্ছি না। কখনও পাম্প নষ্ট, কখনও নদীতে পানি নেই, এমন জানতে পারছি। এ মৌসুমে জিকে ক্যানেলে পানি না থাকায় আশপাশের নলকূপেও পানি উঠছে না। পুকুর, জলাশয় শুকিয়ে গেছে। প্রধান খালে পানি থাকলে এ ধরনের সমস্যা হতো না। এবার ফসল ফলাতে বিঘায় ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা বাড়তি খরচ করতে হয়েছে। তারপরও উৎপাদন সেভাবে হবে বলে মনে হয় না।
তিনি বলেন, ফারাক্কার বিরূপ প্রতিক্রিয়া এবং পানিচুক্তি করেও পানির ন্যায্য হিস্যা না পাওয়ায় পদ্মার বুকে বালুর চর দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের পাম্প স্টেশন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান জিকে পাম্পের বর্তমান অবস্থা ও সচল করার পরিকল্পনার বিষয়ে বলেন, পদ্মার হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ও লালন শাহ সেতুর এক কিলোমিটার ভাটিতে দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প জিকে প্রজেক্ট। সেচের মাধ্যমে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির স্বার্থে সরকার ১৯৫৪ সালে ভেড়ামারা জিকে সেচ প্রকল্পের কাজ নেয়। ১৯৬৯ সালে কাজ শেষ হয়। প্রকল্পের প্রধান তিনটি পাম্প ২০০৫ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত জাপানের ইবারা করপোরেশন প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে।
তিনি আরও বলেন, ৩ নম্বর পাম্পটি জাপানের ইবারা করপোরেশনের মাধ্যমে মেরামতের প্রক্রিয়ার মধ্যে চলমান রয়েছে ও কাজের অগ্রগতি হয়েছে। কিছু যন্ত্রাংশ লাগবে, সেগুলো আমদানির প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। ২ নম্বর পাম্পটির সমস্যা বড় এবং মেরামত ব্যয়সাপেক্ষ। সেজন্য ত্রুটিযুক্ত পাম্পগুলো মেরামত করতে ডিপিটি প্রক্রিয়া গঠন করা হয়েছে, যা পরিকল্পনা কমিশনে প্রক্রিয়াধাীন।
এছাড়া তিনি জানান, ডিপিটিতে অন্তর্ভুক্ত নতুন ১০ সাবসিডিয়ারি পাম্প স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তা যদি পাস হয় তাহলে তিনটি মূল পাম্প পুনর্বাসনসহ সাবসিডিয়ারি পাম্পগুলো সেচ প্রকল্পের পাম্প হাউসে স্থাপন সম্ভব হবে।