নৌকায় ইতালিযাত্রার স্বপ্ন নিয়ে
সাইফুল ইসলাম, মাদারীপুর
প্রকাশ : ০৩ মে ২০২৪ ২১:৩৬ পিএম
আপডেট : ০৪ মে ২০২৪ ০০:০০ এএম
শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে জানাজার নামাজ শেষে মরদেহগুলো পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। প্রবা ফটো
অবশেষে গ্রামের বাড়ি পৌঁছল তিউনিসিয়ায় ভূমধ্যসাগরে নৌকায় দালালদের নির্যাতনে মারা যাওয়া আট বাংলাদেশির মরদেহ। ৭৮ দিন পর বাড়িতে মরদেহ পৌঁছলে আহাজারিতে ভেঙে পড়েন নিহতের স্বজনরা। আনুষ্ঠানিকতা শেষে শুক্রবার (৩ মে) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে মরদেহগুলো পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
নিহতরা হলেন, মাদারীপুরের রাজৈরের কোদালিয়া গ্রামের মিজানুর রহমান কাজীর ছেলে সজীব কাজী, পশ্চিম স্বরমঙ্গল গ্রামের ইউসুফ আলী শেখের ছেলে মামুন শেখ, সেনদিয়ার গ্রামের সুনীল বৈরাগীর ছেলে সজল বৈরাগী, উত্তরপাড়া গ্রামের পরিতোষ বিশ্বাসের ছেলে নয়ন বিশ্বাস, কেশরদিয়া গ্রামের কাওসার, গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার বড়দিয়া গ্রামের দাদন মিয়ার ছেলে রিফাদ, ফতেয়পট্টি এলাকার মো. রাসেল ও গয়লাকান্দি গ্রামের পান্নু শেখের ছেলে ইসরুল কায়েস আপন।
সূত্র জানায়, শুক্রবার সন্ধ্যায় অ্যাম্বুলেন্সযোগে রাজধানী ঢাকা থেকে রাজৈর উপজেলার স্বরমঙ্গল গ্রামের মামুন শেখের মরদেহ আসার খবরে বুকফাঁটা আর্তনাদ নিহত মামুনের মা হাফিজা বেগমের। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে আশপাশের পরিবেশ। মামুনের মরদেহ বাড়িতে পৌঁছনোর পর কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরাও। এর কিছুক্ষণ পরে একে একে আরও সাতজনের মরদেহ আসে গ্রামের বাড়িতে। এর আগে বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা ২০ মিনিটের দিকে তিউনিসিয়া থেকে সৌদিয়া এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দের পৌঁছয় নিহত আট বাংলাদেশির মরদেহ। পরে মরদেহগুলো নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিকেলে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে শুক্রবার বিকালে পরিবারের কাছে মরদেহ বুঝিয়ে দেয় ঢাকা জেলা প্রশাসন ও বিমানবন্দর থানা পুলিশ।
নিহত মামুনের বড় ভাই সজীব শেখ বলেন, ‘আমার ভাইয়ের মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। এভাবে যেন কেউ অবৈধপথে কাউকে বিদেশে না পাঠায়। দালালরা মুখে বলে এক কথা, আর কাজে আরেক। কথার সাথে কাজের কোনো মিল নাই।’
নিহত সজল বৈরাগীর ফুফাতো বোন আরতী বৈরাগী বলেন, ‘আমার মামাতো ভাইয়ের মতো যেন আর কারও মৃত্যু না হয়। সজলের অকালমৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। ধারদেনা করে দালালদের লাখ লাখ টাকা দিলেও নিরাপদে ইতালি পৌঁছতে পারেনি আমার ভাই। এমন ঘটনায় দোষীদের বিচার হওয়া উচিত।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মানব পাচারকারী চক্রের সক্রিয় সদস্য গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের সুন্দরদী গ্রামের মোশারফ কাজী। তার সহযোগী হিসেবে কাজ করেন পার্শ্ববর্তী গজারিয়া গ্রামের রহিম শেখ। তারা আশপাশের গ্রামের তরুণদের প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশে পাঠানোর নামে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেন। এ বিষয়ে জানতে মোশারফের মোবাইল ফোনে কল করা হলে তিনি ধরেননি।
স্বজন, পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৪ জানুয়ারি মাদারীপুরের রাজৈর ও গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার কয়েকজন যুবক ইতালির উদ্দেশে বাড়ি থেকে বের হন। প্রথমে তারা দুবাই হয়ে উড়োজাহাজে করে লিবিয়ায় পৌঁছান। পরে ১৪ ফেব্রুয়ারি লিবিয়া থেকে দালালদের মাধ্যমে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ইতালির উদ্দেশে রওনা হন। মাঝপথে তিউনিসিয়ায় ভূমধ্যসাগরে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে যাওয়ার পথে তাদের নির্যাতন করা হয়। এতে আটজনের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া এক পাকিস্তানি নাগরিকও মারা যান। খবর পেয়ে কয়েকজনকে জীবিত উদ্ধার করে স্থানীয় কোস্ট গার্ড।
নিহত ব্যক্তিদের স্বজনরা ঢাকার বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের বলেন, ৩০ জন যেতে পারবেন, এমন একটি ছোট নৌকায় ৫২ জনকে নিয়েছিলেন দালালরা। যে আটজন মারা গেছেন, তাদের নৌকার পাটাতনের নিচে জোর করে রাখা হয়েছিল। তারা অক্সিজেন-সংকটের কারণে পাটাতন থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেন। কিন্তু দালালরা তাদের মারধর করে আবার সেখানে পাঠায়। এভাবে নির্যাতন ও অক্সিজেন সংকটের কারণেই তাদের মৃত্যু হয়েছে।
মাদারীপুরের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এ ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের স্বজনরা মামলা করলে সব ধরনের আইনি সহযোগিতা করা হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হবে। তবে ভুক্তভোগীরা মামলা করতে আগ্রহী কম।’ মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মারুফুর রশিদ খান বলেন, ‘অবৈধভাবে সমুদ্রপথে বিদেশযাত্রা বন্ধের জন্য প্রয়োজন সচেতনতা। মানুষ সচেতন হলে অকালে এমন মৃত্যু আর হবে না। এজন্য জনপ্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে।’