জিয়াউর রহমান, নেত্রকোণা
প্রকাশ : ০৩ মে ২০২৪ ১৫:২৫ পিএম
আপডেট : ০৩ মে ২০২৪ ১৫:২৮ পিএম
নেত্রকোণার হাওরে ব্যস্ত সময় কাটছে কৃষকদের। বৃষ্টির আগেই ফসল ঘরে তুলতে চান তারা। প্রবা ফটো
তীব্র দাবদাহে পুড়ছে দেশ। অসহনীয় গরমে অতিষ্ঠ মানুষ। স্বস্তিতে নেই পশুপাখিও। গরম থেকে বাঁচতে বৃষ্টির অপেক্ষায় পুরো দেশ। বৃষ্টির আশায় দেশের বেশিরভাগ জেলায় বিশেষ নামাজও অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু নেত্রকোণা জেলার হাওর এলাকার কৃষক ফয়েজ আহমেদ ও সলিল চক্রবর্তীরা বলছেন, ‘অনেকে গরম সইতে না পেরে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করছেন। কিন্তু আমরা বৃষ্টি চাই না। হাওরে অহন বৃষ্টি অইলে মরণ ছাড়া গতি নাই।’
ফয়েজ আর সলিলের মতো ‘বৃষ্টিবিরোধী’ মনোভাব দেখা গেল এই অঞ্চলের বেশিরভাগ কৃষকের মাঝে। কারণটাও জানা গেল তাদের কাছেই।
কৃষকরা জানান, আবহাওয়ার পূর্ভাবাসে বলা হয়েছে তীব্র দাবদাহের পর আজ শুক্রবার থেকে দেশের উত্তর-পূর্ব অঞ্চল সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া নেত্রকোণা এবং পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের চেরাপুঞ্জিতে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। এমনটি হলে নেত্রকোণায় নদ-নদী ও হাওরে পানি বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। তাতে হাওর এবং জেলার নিম্নাঞ্চলে বোরো ধান হুমকির মুখে পড়তে পারে। স্থানীয় প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারাও এক সপ্তাহ ধরে স্থানীয় কৃষকদের দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দিচ্ছেন। ধান কেটে ঘরে তোলার আগে বৃষ্টি হলেই বিপদ! তাই তীব্র রোদ উপেক্ষা করেই হাওরের মাঠে মাঠে ধান কাটায় ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা।
স্থানীয় কৃষক ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলার ১০ উপজেলায় এ বছর ১ লাখ ৮৫ হাজার ৩২০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে হয়েছে ৪১ হাজার ৭০ হেক্টর। বেশিরভাগই ব্রি-২৮ ও ব্রি-৮৮-এর মতো উচ্চফলনশীল হাইব্রিড জাতের। এসব ধানের জীবৎকাল ১৪৫ দিন হওয়ায় মাঠের প্রায় সব ধান কাটার উপযোগী হয়েছে। গত রবিবার পর্যন্ত ৭০ শতাংশ ক্ষেতের ধান কাটা হয়েছে। মৌসুমি শ্রমিকের পাশাপাশি ৭ শতাধিক কম্বাউন্ড হারভেস্টর দিয়ে চলছে ধান কাটা।
কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি ধান কাটা হয়েছে মদনের উচিতপুর হাওর, ফতেপুর হাওর, খালিয়াজুরির কীর্তনখোলা হাওর, লক্ষ্মীপুর হাওর, চুনাই হাওর, কাটকাইলের কান্দা, বৈলং হাওর, লেপসাই হাওর, চৈতারা হাওর, আশাখালী হাওর, পায়া হাওর, দৈলং সাপমারা হাওরসহ বিভিন্ন এলাকার।
খালিয়াজুরি উপজেলার পুরানহাটি গ্রামের কৃষক শফিকুল ইসলাম বলেন, সব ধানই পেকে গেছে। গত সোমবার থেকে মাইকে ঘোষণা দিয়ে দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে কৃষি বিভাগ থেকে। পানি আসার আশঙ্কায় আমরা ধান কেটে ফেলছি। এলাকায় শ্রমিক সংকট থাকলেও মেশিনের সাহায্যে এখন দ্রুত ধান কাটা যাচ্ছে।
মদন উপজেলার উচিতপুর এলাকার কৃষক আরিফুল মিয়া বলেন, এ বছর প্রচণ্ড রোদ থাকায় নিরাপদে ধান কাটা ও শুকানো যাচ্ছে। গবাদিপশুর খড়ও শুকিয়ে জমা করা হচ্ছে। বাগজান গ্রামের কৃষক ফয়েজ আহমেদ বলেন, ‘এ বছরের মতো এত শান্তিতে কৃষকরা খুব কম সময়ই ধান কেটেছেন। কারণ প্রতিদিন তীব্র রোদ। অনেকে গরম সইতে না পেরে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করছেন। কিন্তু আমরা বৃষ্টি চাই না। এখন বৃষ্টি হলে আমাদের সর্বনাশ হয়ে যাবে।’
মোহনগঞ্জ উপজেলার ডিঙ্গাপোতা হাওরপাড়ের খুরশিমুল গ্রামের সবচেয়ে বড় কৃষক সলিল চক্রবর্তী। তিনি বলেন, ‘রইদ থাকায় ধীরে ধীরে ধান কাটা হচ্ছে। অহন শুনতাছি বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে। বাকি ক্ষেতের ধান দ্রুত কেটে ফেলব। হাওরে অহন বৃষ্টি অইলে মরণ ছাড়া গতি নাই।’
জানতে চাইলে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নূরুজ্জামান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘কৃষি আবহাওয়া তথ্য পদ্ধতি উন্নতকরণ প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ৩ মে (আজ) থেকে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অনেক জায়গায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। তাই বৃষ্টিপাতের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে হাওরে বোরো ধান দ্রুত কাটার জন্য আমরা কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি। যেসব ধান ৮০ শতাংশ পরিপক্ব হয়েছে তা দ্রুত কেটে নিরাপদ ও শুকনো স্থানে রাখার জন্য বলা হচ্ছে।’
পাউবোর নেত্রকোণা জেলা কার্যালয়ের নির্বাহী পরিচালক মো. সারওয়ার জাহান বলেন, অতিবৃষ্টির ফলে পাহাড় থেকে নেমে আসা পানির প্রভাবে জেলার নদ-নদী, হাওরসহ নিম্নাঞ্চলে পানি বাড়বে। ফলে হাওরের সোনালি ধান কেটে দ্রুত ঘরে তোলার জন্য বলা হচ্ছে। এ নিয়ে কৃষকদের মধ্যে সচেতনতামূলক ও অবহিতকরণ প্রচার করা হচ্ছে।
এদিকে সরকারিভাবে এখনও ক্রয় শুরু না হওয়ায় প্রান্তিক কৃষকরা স্থানীয় হাটবাজার ও মহাজনদের কাছে কম দামে ধান বিক্রিতে বাধ্য হচ্ছেন। এ নিয়ে তারা হতাশ ও ক্ষুব্ধ। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মোয়েতাছেমুর রহমান জানান, আগামী ৭ মে থেকে ধান সংগ্রহের অভিযান শুরু হয়ে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত চলবে।