রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ১১ বছর
প্লাবন শুভ, ফুলবাড়ী (দিনাজপুর)
প্রকাশ : ২৪ এপ্রিল ২০২৪ ০৯:৩০ এএম
আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২৪ ০৯:৩৩ এএম
রানা প্লাজা ধসে দুই পা হারান দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার রেবেকা বেগম। হাতে ভর করেই চলছে তার জীবন। মঙ্গলবার তোলা। প্রবা ফটো
আজ ২৪ এপ্রিল। ঢাকার সাভারে রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ১১ বছর। সেদিন কাকডাকা ভোরে ঘুম থেকে ওঠেন দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার গৃহবধূ রেবেকা বেগম। স্বামী মোস্তাফিজুর রহমানকে খাইয়ে নিজে না খেয়েই পরিবারের সাত সদস্য মিলে রানা প্লাজার দ্বিতীয় তলায় কাজে যান। পাশের লাইনে রেবেকার মা তখন ডাকছিলেন খাওয়ার জন্য। এ সময় হঠাৎ বিকট শব্দে ভবনটি ভেঙে পড়ে। সেই কক্ষেই দুই পা দেয়ালের নিচে চাপা পড়ে আটকা পড়েন রেবেকা। বয়স তখন ১৭ বছর। দুই দিন পর সেখান থেকে স্থানীয় কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবী তাকে উদ্ধার করেন। এ ঘটনায় রেবেকার পরিবারের দুজন কোনোমতে প্রাণে বেঁচে ফিরলেও মাসহ বাকিরা হারিয়ে গেছেন রানা প্লাজার ভেঙে পড়া ভবনের কংক্রিটের ভেতর।
ফুলবাড়ী উপজেলার আলাদিপুর ইউনিয়নের বারাইহাট চেয়ারম্যানপাড়া গ্রামের রাজমিস্ত্রি মোস্তাফিজুর রহমানের স্ত্রী রেবেকা। তার বয়স এখন ২৮ বছর। ২০১৩ সালের সেই ঘটনায় দুই পা হারিয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয় রেবেকা বেগমকে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে রাবাইহাট চেয়ারম্যানপাড়ায় রেবেকা বেগমের সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ঘটনার পর জ্ঞান ছিল না। জ্ঞান আসলে দেখি পায়ের ওপর সিমেন্টের বিম চাপা পড়েছে। পরে আমাকে উদ্ধার করে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে নেওয়া হয়।’ সেখানে এক বছর ধরে রেবেকার চিকিৎসা চলে। সে সময় তার বাম পা কোমর থেকে ও ডান পা গোড়ালি থেকে কেটে ফেলতে হয়। এরপর দীর্ঘ ১১ বছর পার হয়ে গেছে। এরই মধ্যে একটি ছেলে ও একটি মেয়েসন্তানের মা হয়েছেন রেবেকা। ছেলে মাদানী নূরের বয়স পাঁচ বছর আর মেয়ে সিরাতুন মনতার বয়স ১০ বছর। সে এখন পঞ্চম শ্রেণিতে।
রেবেকা বলেন, রানা প্লাজা ধসের পর সরকারি ঘোষণা ছিল, যেসব শ্রমিক শরীরের দুটি অঙ্গ হারিয়েছেন, তাদের ১৫ লাখ এবং যারা একটি অঙ্গ হারিয়েছেন তারা ১২ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ পাবেন। কিন্তু রেবেকাকে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে অনুদান দেওয়া হয়েছে ১০ লাখ টাকা। রেবেকা একটি পা হারিয়েছেন, সংশ্লিষ্টদের এমন ভুল তথ্যের কারণে তিনি সরকার ঘোষিত পুরোপুরি অর্থ পাননি।
অনুদানের টাকা স্থায়ী আমানত হিসেবে ব্যাংকে রেখেছেন রেবেকা। সেই টাকা থেকে প্রতি মাসে যা পান তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চলছে। তাছাড়া ব্র্যাক হিউম্যানিটারিয়ান প্রোগ্রামের আওতায় ৫ শতাংশ জমির ওপর একটি দুর্যোগসহনীয় বাড়ি পেয়েছেন। তবে তাকে ও বাচ্চাদের দেখাশোনার জন্য তার স্বামী বাইরে কাজ করতে পারেন না।
রেবেকা বলেন, তার দুই পায়ে চারবার করে আটবার ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে অপারেশন করতে হয়েছে। বর্তমানে দুই পায়ের হাড় বের হয়ে আসায় প্রচণ্ড ব্যথা হচ্ছে। চিকিৎসক দ্রুত অপারেশন করতে বলেছেন। কিন্তু অর্থের অভাবে তা করাতে পারছেন না রেবেকা। রেবেকার স্বামী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রানা প্লাজা ধসের দুই বছর আগে পছন্দ করে তারা বিয়ে করেছিলেন। তিনি রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন আর রেবেকা রানা প্লাজায় পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। বেশ ভালোই চলছিল সংসার। রানা প্লাজা তাদের সংসার লন্ডভন্ড করে দিয়েছে। ওই দুর্ঘটনায় ইট-পাথরের স্তূপে হারিয়ে গেছেন মা চান বানু। মারা গেছেন দাদি কোহিনূর ও ফুপু রাবেয়া।
একই দুর্ঘটনায় নিখোঁজ হয়েছেন ফুলবাড়ী উপজেলার কাজিহাল ইউনিয়নের কাজিহাল ডাঙা গ্রামের আতাউর রহমানের স্ত্রী পোশাকশ্রমিক গুলশান আক্তার শাবানা। ছেলেসহ পরিবারের লোকজন নিয়ে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের মাধ্যমে প্রতি বছর দিনটি স্মরণ করেন স্বামী আতাউর রহমান।
আতাউর রহমান বলেন, ঘটনার দিন সকালে রানা প্লাজায় কাজে যোগ দেন তার স্ত্রী। ট্র্যাজেডির পর দীর্ঘ সময় ধরে তাকে খোঁজাখুঁজি করে সন্ধান করতে পারেননি। তবে নিখোঁজদের তালিকায় শাবানার নাম ছিল। সেই তালিকার সূত্র ধরে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১৩ লাখ টাকা পাওয়া গেলেও পাননি স্ত্রীকে কিংবা তার মরদেহ।