বগুড়া অফিস
প্রকাশ : ২২ এপ্রিল ২০২৪ ১৫:৪৭ পিএম
আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০২৪ ১৬:৪৩ পিএম
বগুড়া শহরের সাতমাথায় রোডমার্চের অংশ হিসেবে মিছিল ও সমাবেশ করে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল। প্রবা ফটো
তিস্তাসহ ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে তিন দিনব্যাপী রোডমার্চ করছে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)। সোমবার (২২ এপ্রিল) এরই অংশ হিসেবে বগুড়ায় তিস্তা অভিমুখে রোডমার্চ করেছে দলটি। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শহরের সাতমাথায় কর্মসূচির অংশ হিসেবে মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
বাসদ বগুড়া জেলা সদস্য সচিব অ্যাড. দিলরুবা নূরীর সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য দেন দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ, বাসদ কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য নিখিল দাস, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও সিরাজগঞ্জ জেলা আহবায়ক নব কুমার কর্মকার, নওগাঁ জেলা আহবায়ক জয়নাল আবেদীন মুকুল, রজশাহী জেলা আহবায়ক আলফাজ হোসেন, নাটোর জেলা আহবায়ক দেবাশীষ রায় এবং বাসদ বগুড়া জেলা সদস্য সাইফুজ্জামান টুটুল।
সমাবেশে বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, ‘মানব দেহের শিরা-উপশিরার মতো ছড়িয়ে থাকা নদী ও পলি দিয়ে গঠিত বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি আজ পানির অভাবে মরুকরণের হুমকির মুখে। এ অভাব প্রাকৃতিক কারণে নয়, মানুষের সৃষ্টি। চীন, নেপাল, ভুটান ও ভারত থেকে আসা নদীগুলো বাংলাদেশে প্রবেশ করে জালের মতো ছড়িয়ে গেছে। এ নদীগুলোই বাংলাদেশের প্রাণ প্রবাহ। কিন্তু আন্তর্জাতিক সমস্ত আইন ও নীতি লঙ্ঘন করে ভারত ৫৪টি নদীর উজানে বাঁধ দিয়ে একতরফা পানি প্রত্যাহার করে নেওয়ার আগ্রাসী তৎপরতার ফলে পানির প্রবাহ কমে গিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশের অভ্যন্তরে নদী দখল ও দূষণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘এক সময় দেশে ১ হাজার ২০০টি নদী ছিল। সরকার সমূহের ভ্রান্তনীতি ও দখল-দূষণের কারণে নদী মরে গিয়ে এখন ২৩০-এ নেমে এসেছে। খরা মৌসুমে বেশিরভাগ নদীতেই পানি থাকে না। এক সময়ের প্রমত্তা অনেক নদীই এখন খাল-নালায় পরিণত হয়েছে। দেশের চতুর্থ বৃহত্তম আন্তর্জাতিক নদী তিস্তার ভূগর্ভস্থ ও ভূ-উপরিস্থিত জলপ্রবাহ নিয়ে এর অববাহিকার পরিমাণ প্রায় ৩০ হাজার বর্গ কিলোমিটার। যার মধ্যে বাংলাদেশে ২০ হাজার বর্গ কিলোমিটার আর ভারতে ১০ হাজার বর্গ কিলোমিটার। বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার উজানে গজলডোবায় বাঁধ দেওয়ার কারণে পানি পাচ্ছে না বাংলাদেশ।’
নিখিল দাস বলেন, ‘খরা মৌসুম আসতে না আসতেই তিস্তার পানি প্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে কখনও ৫০০ কিউসেকের নিচে নেমে যায়। অথচ ঐতিহাসিক গড় অনুযায়ী পানির প্রবাহ থাকার কথা কমপক্ষে ১০ হাজার কিউসেক। প্রমত্তা তিস্তার এ বেহাল দশা কেন? পদ্মা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্রের পরে তিস্তা চতুর্থ বৃহত্তম নদী। উত্তর সিকিমে কৈলাস হ্রদ থেকে শুরু করে হিমালয় পর্বতের বুক চিরে সাপের মতো এঁকেবেঁকে ভারতের জলপাইগুড়ি হয়ে বাংলাদেশের নীলফামারী জেলার ছাতনাই দিয়ে প্রবেশ করেছে তিস্তা। ৩১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ তিস্তা আন্তর্জাতিক নদী হওয়া সত্ত্বেও ভারত বাংলাদেশের স্বার্থ উপেক্ষা করে একতরফা বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ৫ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে সেচের জন্য পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ পানি পাচ্ছে না।’
সভাপতির বক্তব্যে দিলরুবা নূরী বলেন, ‘তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যাসহ ভারত থেকে আগত সব আন্তর্জাতিক নদীর পানি বণ্টনের বিষয়টি ভারতের শাসকগোষ্ঠী রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগিয়ে সমস্ত প্রকারে বাংলাদেশকে পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত করে চলেছে। বাংলাদেশের বর্তমান সরকারসহ অতীতের সব সরকার নির্লজ্জভাবে দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে ভারতের প্রতি নতজানু থেকেছে। আমাদের শাসক শ্রেণির একাংশ ভারতকে বন্ধু রাষ্ট্র এবং আরেকাংশ হিন্দু রাষ্ট্র বলে ভোটের রাজনীতিতে ফায়দা তুলতে চায়। কিন্তু বাস্তবে ভারত বন্ধু বা হিন্দু রাষ্ট্র নয়, ভারত একটি সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র। ফলে ভারত পার্শ্ববর্তী দেশের ওপর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামরিক-সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ব ও প্রভাব বিস্তার করতে চায়।’
সমাবেশে অন্য নেতৃবৃন্দ বলেন, ভারত সরকার আন্তর্জাতিক নীতি লঙ্ঘন করে ভাটির দেশ বাংলাদেশের ন্যূনতম স্বার্থ বিবেচনা না করে একের পর এক নদীর পানি প্রত্যাহার করছে। বাংলাদেশের সরকারের উচিত আন্তর্জাতিক সমস্ত ফোরামে বিষয়টি উপস্থাপন করা। কিন্তু সে ধরনের কোনো পদক্ষেপ আজও পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বাসদসহ বিভিন্ন বাম প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দলসমূহের পক্ষ থেকে বারবার দাবি জানানো সত্ত্বেও ভারত ও বাংলাদেশ সরকারের কারোরই কানে এ দাবি প্রবেশ করছে না। দেশপ্রেমিক জনগণের প্রতি ভারতের পানি আগ্রাসন, নদী দূষণ ও দখলদারদের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন গড়ে তোলার আহবান জানান তারা।