উৎসব
মৌলভীবাজার ও নাটোর প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৭ মার্চ ২০২৪ ০৯:৫৯ এএম
আপডেট : ২৭ মার্চ ২০২৪ ১০:০২ এএম
ফাগুয়া উৎসব উদযাপন করছেন মৌলভীবাজারে চা-শিল্পে জড়িত শ্রমিকরা। সোমবার তোলা। প্রবা ফটো
গত সোমবার ছিল আবিরের দিন। এই দিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পালিত হয় ফাগুয়া উৎসব। মৌলভীবাজারের চা-শ্রমিক এবং নাটোরের মুণ্ডা সম্প্রদায়ের মানুষ দিনটি উদযাপন করেন।
মৌলভীবাজারের চা-শিল্পাঞ্চলের নারী-পুরুষ শ্রমিকরা সকালেই পারিবারিক গৃহদেবতাকে ফুলদোল দিয়েছেন। শুকনো রঙ দিয়ে রাঙিয়ে দিয়েছেন একজন আরেকজনকে। এভাবেই শুরু হয়েছে ফাগুয়া উৎসব। প্রতি বছরের মতো এবারের বসন্তে দোলপূর্ণিমার মধ্যরাত থেকে এ উৎসব সাড়ম্বরে উদযাপন করছেন চা-শিল্পের সঙ্গে জড়িত দুই লাখের বেশি শ্রমিক।
এই মানুষগুলোর কাছে যা ফাগুয়ার উৎসব, সারা দেশে সেটিই পরিচিত ‘হোলি’, ‘দোল’ বা ‘দোলযাত্রা’ উৎসব হিসেবে। উৎসবটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রেম ও প্রীতির উৎসব হলেও কালপ্রবাহে এটি সব মানুষের সামাজিক উৎসব হয়ে উঠেছে। এদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মতে, কৃষ্ণলীলার একটি প্রধান উৎসব দোলযাত্রা। মূলত সূর্য বা বিষ্ণুলীলার প্রতীক এ উৎসব। তবে ইতিহাসবিদদের মতে, রাধা-কৃষ্ণের দোলনায় দোলা বা দোলায় গমন করা থেকেই ‘দোল’ শব্দটির উৎপত্তি।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক আদিবাসী ফ্রন্টের নির্বাহী পরিচালক পরিমল সিং বাড়াইক বলেন, ‘বাংলাদেশের চা-বাগানের শতকরা ৯৮ ভাগ শ্রমিক সনাতন (হিন্দু) ধর্মাবলম্বী। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বারো মাসে তেরো পার্বণ (উৎসব)। এর ব্যতিক্রম হয় না চা-বাগানগুলোতেও। চা-শ্রমিকরা ছোট-বড় সব পূজাই পালন করেন যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে। শারদীয় দুর্গোৎসব হিন্দুদের, বিশেষ করে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি প্রধান উৎসব। শারদীয় দুর্গোৎসবের পরে আসে কালীপূজা, সরস্বতী পূজা, জন্মাষ্টমী, ব্রহ্ম তারকযজ্ঞ ও নামযজ্ঞ। চা-শ্রমিকরাও এই পূজাগুলো অতি গুরুত্বের সঙ্গে পালন করে থাকেন। তবে চা-বাগানে সপ্তাহব্যাপী রঙে রঙে রাঙিয়ে রঙ খেলা বা ফাগুয়া অর্থাৎ হোলি উৎসব পালন করা হয় মৌলভীবাজারের ৯২টি চা-বাগানসহ দেশের চা-শিল্পাঞ্চলের প্রতিটি চা-বাগানে। বিশেষত এ উৎসবটি ঘিরে চা-শ্রমিকরা বর্ণিল হয়ে ওঠেন। ফাগুয়াকে বলা চলে চা-শ্রমিকদের প্রধান ও প্রাণের উৎসব।’
মৌলভীবাজারের কয়েকটি বাগান ঘুরে ও চা-শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চা-শিল্পাঞ্চলে ফাগুয়া উৎসবের প্রথম দিনে বা আবিরের দিন থেকে শ্রমিকরা শুকনো রঙ দিয়ে একজন আরেকজনকে রাঙিয়ে তুলতে থাকেন। পরের দিন বাগানে বাগানে শুরু হয় রাধা-কৃষ্ণের কীর্তন। বাগানের নারী-পুরুষ সব শ্রমিকই কীর্তনে যোগ দেন। পরের দিনও চলে রঙের খেলা। শ্রমিকদের কাছে এ এক অপূর্ব আনন্দোৎসব। চা-শ্রমিক মেয়েরা এদিন রাধার সাজে পোশাক অলংকার পরে এবং ছেলেরা কৃষ্ণ সেজে উৎসবে যোগ দেন। প্রতিটি চা-বাগানে ১০ থেকে ১২ জনের একটি করে দলের প্রত্যেক সদস্য দুই হাতে দুটি ছোট লাঠি নিয়ে লাঠিনৃত্যে অংশ নেন। দলের মধ্যে যে কৃষ্ণ সাজেন, তার হাতে থাকে বাঁশি। শ্রমিকদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঘুরে তারা লাঠিনৃত্য করে থাকেন। বাগানে এই লাঠিখেলা নৃত্য একমাত্র ফাগুয়া উৎসবেই হয়ে থাকে।
চা-শ্রমিকরা লাঠি খেলার সময় ওড়িশা, বাংলা ও হিন্দি গান গেয়ে মাদল, বাঁশি ও লাঠির শব্দের তালে তালে মুখরিত করে তোলেন চা-শ্রমিক পল্লীগুলো। দেশ-বিদেশের অসংখ্য মানুষ চা-শ্রমিকদের প্রাণের উৎসব, প্রেমের উৎসব ফাগুয়া দেখতে চা-বাগান এলাকায় ভিড় করেন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ফাগুয়ার উৎসবে একাত্ম হন সবাই।
নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে নাটোর সদর উপজেলার মুণ্ডা জনগোষ্ঠীও পালন করেছে ‘ফাগুয়া উৎসব’। গত সোমবার রাতে নাটোর সদর উপজেলার দরাপপুর আদিবাসী পল্লীতে এ উৎসব পালিত হয়। এ সময় মুণ্ডা সম্প্রদায়ের সব বয়সি নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণী, কিশোর-কিশোরী এ উৎসবে মেতে ওঠেন। উৎসবের শুরুতে খোলা স্থানে খড়কুটো ও গাছের ডালের সমন্বয়ে একটি ঘরসদৃশ স্থাপনা তৈরি করা হয়। পরে সম্প্রদায়ের পুরোহিত সেখানে পূজা-অর্চনাশেষে ওই স্থাপনায় আগুন ধরিয়ে দেন। স্থাপনায় দাউ দাউ করে আগুন ধরে গেলে সেখানে উপস্থিত সবাই ওই স্থাপনাকে লক্ষ্য করে মাটির ঢিল নিক্ষেপ করতে থাকেন। পরে সেখানে উপস্থিত সবাই একে অপরকে আবির ও রঙ মাখিয়ে আনন্দে মেতে ওঠেন। এ ছাড়া উৎসবের অংশ হিসেবে তরুণরা ‘বুন্দিয়া খেলা’য় (কেরোসিন মাখানো কাপড়ের বল বানিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে শূন্যে ছোড়াছুড়ি খেলা) মেতে ওঠেন।
জাতীয় আদিবাসী পরিষদ নাটোর জেলা শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক কালীদাস রায় জানান, আমাদের অনেক ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতি হারিয়ে যাচ্ছে। এই ধরনের উৎসব পালন আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য চেতনাকে আরও মজবুত করে তোলে।