× ই-পেপার প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি ফিচার চট্টগ্রাম ভিডিও সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবস

শহরের বুক থেকে হারিয়ে গেছে স্রোতস্বিনী দুই নদী

রাজু আহমেদ, রাজশাহী

প্রকাশ : ১৪ মার্চ ২০২৪ ০০:১৬ এএম

আপডেট : ১৪ মার্চ ২০২৪ ১০:৩৪ এএম

রাজশাহী শহরের হারিয়ে যাওয়া বারাহী ও স্বরমঙ্গলা (রাইচান) নদী। প্রবা ফটো

রাজশাহী শহরের হারিয়ে যাওয়া বারাহী ও স্বরমঙ্গলা (রাইচান) নদী। প্রবা ফটো

যাত্রীদের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনে রাজশাহীর সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম এখন সড়কপথ। যদিও একসময় যাতায়াত ও পরিবহনের প্রধান মাধ্যমই ছিল প্রাকৃতিক জলপথ নদী। রাজশাহী শহরের বুক চিরে তখন প্রবাহিত হতো দুই বিশাল নদী। সেগুলো দিয়ে নানা রঙের পালওয়ালা ছোট-বড় নৌকায় করে আশপাশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে উৎপাদিত নানা ফসল, বনজ ঔষধি পণ্য ও কৃষিজাত পণ্য পৌঁছে যেত দূর-দূরান্তে। এমনকি ইউরোপের মতো দেশগুলোয়। শহরে ছিল ছোট-বড় অনেক গুদাম। ছিল নদীঘাট। তবে এর সবই এখন ইতিহাস। অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে শহরের মধ্য দিয়ে প্রবহমান সেই নদী দুটিও এখন হারিয়ে গেছে। যদিও রয়ে গেছে তার পথরেখা।

হারিয়ে যাওয়া সেই নদীগুলো একটি বারাহী, আরেকটি স্বরমঙ্গলা (রাইচান)। দুটোই ছিল পদ্মার শাখা নদী। প্রবাহিত হতো পৃথকভাবে। বারাহী নদীপথ দিয়ে চলাচল করত নওগাঁ জেলাসহ বাগমারা ও তানোরে উৎপাদিত সরুচাল, পাট আর পানবোঝাই বড় বড় নৌকা। অন্যদিকে স্বরমঙ্গলা নদীপথে চলাচল করত নাটোর জেলাসহ পুঠিয়া, দুর্গাপুর, পবা ও মোহনপুর থানায় উৎপাদিত পান, পাট, কার্পাশ তুলা, রেশমগুটি ও নীলের মতো অর্থকরী ফসল।

স্রোতস্বিনী নদী এখন কোথাও ড্রেন, কোথাও জলাভূমি!

বারাহী ও স্বরমঙ্গলা নদী দুটি এখনও বেঁচে আছে বটে, তবে ধুঁকেধুঁকে, কোনোমতে ড্রেনের রূপ নিয়ে। রাজশাহীবাসী এখন প্রমত্তা সেই নদী দুটিকে চেনে ড্রেন হিসেবে! আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকায় নগরবাসীর ব্যবহৃত বর্জ্য ও বর্জ্যমিশ্রিত দূষিত পানি সেই ড্রেনে গিয়ে পড়ে। যার সংযোগ রয়েছে মূল পদ্মার সঙ্গে।

পদ্মা নদী ও রাজশাহীর ইতিহাস নিয়ে একাধিক বই লিখেছেন নদীগবেষক মাহাবুব সিদ্দিকী। তিনি বলেন, ‘বারাহী নদী রাজশাহী শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। এটি পদ্মার অন্যতম শাখা নদী। শহরের কুমারপাড়া ও সাহেবগঞ্জের (১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দের বন্যা ও নদীভাঙনে সাহেবগঞ্জ মৌজার অধিকাংশই গঙ্গায় বিলীন হয়ে গেছে) মধ্য দিয়ে এবং মন্নুজান প্রাইমারি স্কুলের পশ্চিম পাশ দিয়ে এ নদী প্রবাহিত হয়েছে। এখানে একটি স্লুইস গেট রয়েছে। এখানে বড় ড্রেনের আকৃতি নিয়ে বারাহী নদী সাহেববাজার বড় মসজিদকে পশ্চিমে রেখে জিরো পয়েন্ট অতিক্রম করেছে। এখানে বারাহী নদী এখন পরিচিত এক নম্বর ড্রেন নামে। এরপর তুলাপট্টি, রানীবাজার, ষষ্ঠীতলা এবং নগরভবনের গ্রিন প্লাজার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে এটি গ্রেটার রোড অতিক্রম করেছে। রেললাইনের পাশ দিয়ে এই নদী পূর্বমুখী পথে গোরহাঙ্গা মোড় অতিক্রম করেছে। তবে এই অংশটুকু বর্তমানে ভরাট হয়ে গেছে। স্টেশন রোড অতিক্রম করে রেলওয়ে অফিস চত্বরের ভেতর দিয়ে এগিয়ে এক পর্যায়ে স্টেডিয়ামের পূর্ব পাশ দিয়ে অগ্রসর হয়ে বিজিবি সেক্টর হেড কোয়ার্টারের মধ্য দিয়ে এটি বড় বনগ্রামে প্রবেশ করেছে। এখানে নদী তীরবর্তী মৌজাটি পবা গাঙপাড়া নামে পরিচিত। অর্থাৎ এলাকাটির নামকরণ হয়েছে বারাহী নামের নদী বা গাঙ থেকে। এরপর বারাহী বড় বনগ্রাম, মুশরইল, কৃষ্ণগঞ্জ, মতিয়ারবিল, সন্তোষপুর, বায়া, সিন্দুরকুসুম্বী হয়ে নওহাটা ব্রিজের সামান্য পশ্চিমে মহানন্দখালী গ্রামে এসে বারনই নদীতে পতিত হয়েছে। বারাহী তীরবর্তী একসময়ের বিখ্যাত নদীবন্দর বায়া এবং কৃষ্ণগঞ্জ। গঙ্গার বিলুপ্ত শাখা বারাহীর চিহ্ন বিজিবি ক্যাম্প থেকে মোহনা অবধি এখনও দৃশ্যমান। রাজশাহী শহরের অধিকাংশ তরল বর্জ্য এখন বহন করছে বারাহী নদী। এর দৈর্ঘ্য ১৫ কিলোমিটার।’

মাহাবুব সিদ্দিকী বলেন, ‘রাজশাহী শহরের তালাইমারী বিজিবি ক্যাম্পের পার্শ্ববর্তী গঙ্গা থেকে উৎপত্তি স্বরমঙ্গলা (রাইচান) নামের নদীটির। পাশেই শহর রক্ষা বাঁধ। এখানে স্লুইস গেট রয়েছে। স্বরমঙ্গলা এর নিচ দিয়ে কাজলা মহল্লায় প্রবেশ করে অক্ট্রয় মোড়ে এসে মহাসড়ক অতিক্রম করেছে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় এবং রুয়েটের মধ্য দিয়ে সীমান্ত রচনা করে খালের আকৃতি নিয়ে এগিয়ে গেছে। রুয়েটের মধ্য দিয়ে অর্ধ কিলোমিটারব্যাপী নিম্ন জলাভূমিটি রেললাইন পর্যন্ত বিস্তৃত। বর্ষা মৌসুমে এটি নদীর আকৃতি নিয়ে ফিরে আসে। স্থানীয়ভাবে এই স্থান নাওডোবা নামে পরিচিত। কথিত আছে ধনপতি সওদাগরের নৌকা এখানে প্রবল স্রোতের কবলে পড়ে ডুবে যায়। রেললাইন অতিক্রম করে নদীটি (জামালপুর) নামোভদ্রা, নারকেলবাড়িয়া, ললিতাহার হয়ে মহাসড়ক (বাইপাস) অতিক্রম করেছে। উৎস থেকে ললিতাহার পর্যন্ত নদীটি স্বরমঙ্গলা নামে পরিচিত। তবে এই অংশটি অনেককাল আগেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আবাদি জমি হয়ে ওঠায় এবং আবাসিক ভবন নির্মিত হওয়ার ফলে নদীর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া এখন দুঃসাধ্য। ললিতাহার থেকে এ নদীরেখা কালুমেড়, বালানগর, পান্তাপাড়া, ঘোলহাড়িয়া, শিরোলিয়া, কাপাশমুল হয়ে ফলিয়ার বিলে পতিত হয়েছে। নদীর এই অংশটি রাইচান নামে পরিচিত। রাইচানের ওপর একাধিক সড়ক সেতু ও কালভার্ট নির্মিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য, সড়ক সেতুটি রামচন্দ্রপুর হাট থেকে নওহাটা অভিমুখী সড়কের ওপর নির্মিত প্রায় ৮০ গজ দীর্ঘ। এটি ফলিয়ার বিল থেকে রাইচান হোজা নদী নাম নিয়ে দুর্গাপুর পৌরশহর হয়ে পানানগর পৌঁছে গেছে। এখান থেকে দমদমা নামক স্থানে এসে হোজা নদী বিলুপ্ত হয়ে গেছে।’

দয়া নদী এখন জলাভূমি

স্বরমঙ্গলার শাখা এবং তৎকালীন গঙ্গার অন্যতম প্রশাখা দয়া নামের নদীটির উৎপত্তিস্থল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিম দেয়ালসংলগ্ন রুয়েটের সীমানায়। এখান থেকে অর্ধকিলোমিটার পথ পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিম ও উত্তরের দেয়াল অতিক্রম করার পর রেললাইন। রেললাইনের নিচে দয়া নদীর ওপর ছোট একটি রেলওয়ে কালভার্ট। বিশ্ববিদ্যালয়ের কবরস্থানের পাশ দিয়ে পাকা সড়ক লাগোয়া অনেক দিনের পুরোনো নিম্ন জলাভূমিটি আসলে দয়া নদী। মেহেরচন্ডী কড়াইতলা পর্যন্ত নদীর আকৃতি নিয়ে প্রবাহিত হয়েছে এটি। ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে রেললাইনের ওপর দিয়ে উড়াল সেতু নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণের পর এ জলাভূমির সম্পূর্ণ অংশ ভরাট হয়ে গেছে। দয়া নদী মেহেরচন্ডী, খড়খড়ি, ললিতাহার, বামনশিকড়, কুখুণ্ডী, মল্লিকপুর, তেবাড়িয়া, সারাংপুর, শিরোলিয়া হয়ে ঘোলহাড়িয়া গ্রামে এসে রাইচান নদীর সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে। এ নদীর পাড়ে অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীতে রেশম শিল্পের একাধিক ছোট ছোট কারখানা গড়ে উঠেছিল।

পরিবর্তনের শুরু ১৮৫০-এর বন্যার পর

নদী গবেষক মাহাবুব সিদ্দিকী জানান, ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে নাটোর জেলায় জলাবদ্ধতা ও রোগবালাই বেড়ে যাওয়ায় ব্রিটিশরা মনে করেন জনপদটি বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এ কারণে ১৮২২ সালের দিকে ফৌজদারি ও চিফ জুডিসিয়াল আদালতসমূহ নাটোর থেকে রাজশাহীর বোয়ালিয়ার শ্রীরামপুর ও বুলনপুর মৌজায় প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরপর থেকেই রাজশাহী মহানগরী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করে। তবে শ্রীরামপুর ও বুলনপুর মৌজা পদ্মা তীরবর্তী হওয়ায় এই এলাকায় নির্মিত অনেক ভবন বিভিন্ন বন্যায় নদীতে তলিয়ে যায়। ১৮৫০-এর বন্যা যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এরপর পদ্মার প্রলয় ঠেকাতে ১৮৫৫ সালের দিকে নদীতীরে বাঁধ নির্মাণ শুরু করা হয়।

১৮৯৫-এর দিকে শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হলে শহরের ভেতর প্রবাহিত শাখা নদী দিয়ে বড় আকারের নৌকা নিয়ে মূল পদ্মায় প্রবেশ বন্ধ হয়ে যায়। বুলনপুর থেকে তালাইমারী পর্যন্ত পদ্মা তীরে বাঁধ নির্মাণের ফলে শাখা নদীর উৎসমুখে পলি জমতে শুরু করে। এদিকে ১৯২৯ সালের দিকে রাজশাহীর সঙ্গে রেল যোগাযোগ স্থাপনের ফলে পদ্মা নদীর গুরুত্ব কমতে থাকে। রেল যোগাযোগ ভালোভাবে শুরু হওয়ার পর রামপুর বোয়ালিয়া থেকে পদ্মা নদীপথে ব্যবসা-বাণিজ্য কমে আসে উল্লেখযোগ্য হারে। ট্রেন চালুর ফলে রাজশাহীর সঙ্গে কলকাতার সরাসরি ব্যবসা-বাণিজ্যের দুয়ার উন্মুক্ত হয়।

এদিকে অযত্ন ও অবহেলায় শাখা নদীর সঙ্গে মূল পদ্মার সংযোগস্থলে পলি জমতে থাকে। মূল নদীর মুখে বসানো হয় স্লুইস গেট। যা মূল নদীর সঙ্গে শাখা নদীর বিচ্ছেদ ঘটায়। শাখা নদীর বিশাল ভূখণ্ডের এখানে ওখানে বাঁধ দিয়ে কৌশলে প্রথমে পুকুর বানিয়ে, পরে তা ভরাট করে দখল করে নেওয়া হয়। তবে এখনও রাজশাহী নগরী এবং এর উপকণ্ঠ এলাকাগুলোতে শাখা নদী দুটির রেখা রয়ে গেছে।

নদীরক্ষায় সোচ্চার নাগরিক সমাজ

এদিকে নদীরক্ষায় সোচ্চার হয়ে উঠেছে রাজশাহী মহানগরের নাগরিকরা। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, নদীগুলো পরিকল্পনার অভাবে এবং দখলদারদের কবলে পড়ে হারিয়ে গেছে। যা প্রকৃতিরও ভয়ানক ক্ষতি করছে। এখন দখল ও দূষণের কবলে পড়ছে মূল পদ্মা নদী। 

নদী গবেষক মাহাবুব সিদ্দিকী জানিয়েছেন, নদীরক্ষায় আরও সোচ্চার হতে হবে নাগরিকদের। তিনি ও রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) রাজশাহী শাখার সভাপতি জামাত খান দাবি করেছেন, সিএস ও আরএস খতিয়ান দেখে বিলীন হওয়া নদীগুলো রক্ষার ব্যবস্থা করা হোক। অন্তত নদীর জায়গাগুলোতে জলাধার গড়ে তোলা হোক। যা নগরায়ণকে আরও সুন্দর এবং নিরাপদ করে তুলবে। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রাজশাহী জেলা সভাপতি আহমেদ শফি উদ্দিনও পদ্মাকে দখল ও দূষণমুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০১৭১২০৩৩৭১৫ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা