প্রীতি উরাংয়ের মৃত্যুর এক মাস
ইসমাইল মাহমুদ, মৌলভীবাজার
প্রকাশ : ০৬ মার্চ ২০২৪ ১১:৫৬ এএম
আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২৪ ১১:৫৯ এএম
নিহত শিশু প্রীতি উরাংয়ের মা নমিতা উরাং। প্রবা ফটো
ডেইলি স্টার পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ আশফাকুল হকের বাসার গৃহকর্মী প্রীতি উরাংয়ের (১৫) মৃত্যুর এক মাস পূর্ণ হচ্ছে আজ ৬ মার্চ। গত ৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বহুতল ভবনের নয় তলায় অবস্থিত আশফাকুল হকের বাসা থেকে পড়ে মারা যায় প্রীতি। এ মৃত্যুকে হত্যা দাবি করে নিরপেক্ষ তদন্তপূর্বক অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মৌলভীবাজারের সর্বত্র চলছে মানববন্ধন, শোক সমাবেশ, পোস্টারিং। প্রতিদিনই কোনো না কোনো কর্মসূচি পালন করছে চা শ্রমিক নেতা, বাগান পঞ্চায়েত কমিটি, নাগরিক কমিটিসহ বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ও সচেতন নাগরিক সমাজ।
প্রীতি উরাংয়ের অস্বাভাবিক ও অকাল মৃত্যুর বিষয়ে বাংলাদেশ চা জনগোষ্ঠী যুব পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. শাহীন মিয়া প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ডেইলি স্টারের মৌলভীবাজার প্রতিনিধি মিন্টু দেশোয়ারা প্রীতিকে নিয়ে আশফাকুল হকের বাসায় কাজের জন্য দিয়েছিলেন। দেওয়ার পরে প্রীতির মা-বাবা তার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করতে পারেনি, ১-২ মাস পরপর যোগাযোগ হতো। প্রায় দুই বছর পর মিন্টু দেশোয়ারা প্রীতির মা-বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের শ্রীমঙ্গল শহরে যেতে বলেন। সেখানে যাওয়ার পর তিনি (মিন্টু দেশোয়ারা) তাদের নিয়ে চলে যান ঢাকায়। মা-বাবা মিন্টু দেশোয়ারার সঙ্গে ঢাকা গিয়ে দেখেন তাদের মেয়েটি মৃত। প্রীতির মা-বাবা আশপাশের মানুষের কাছে জানতে পারেন, মেয়েটিকে নির্যাতন করা হয়েছে। আমরা বাংলাদেশ যুব পরিষদের পক্ষ থেকে প্রীতির মৃত্যু ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।’
মিরতিংগা চা বাগানের শ্রমিক নেতা রাধেশ্যাম পাল বলেন, ‘আমাদের মিরতিংগা চা বাগানের শ্রমিক সন্তান প্রীতি উরাং পেটের দায়ে কর্মরত ছিল ঢাকায় ডেইলি স্টারের নির্বাহী সম্পাদক আশফাকুল হকের বাসায়। আমরা জেনেছি প্রীতি উরাংকে হত্যা করা হয়েছে, বিল্ডিং থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছে, এটা কতটুকু সঠিক আমরা জানি না। প্রশাসনের কাছে এটাই অনুরোধ করছি, যদি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রমাণিত হয়Ñ প্রীতি উরাংকে নির্যাতন ও হত্যা করা হয়েছে, তাহলে এর বিচার চাই এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
বাংলাদেশ ট্রাইব্যুনাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন মৌলভীবাজার জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মানবাধিকার কর্মী স্মরণ সিং বলেন, প্রীতি উরাং চা বাগানের মেয়ে। সে ডেইলি স্টারের নির্বাহী সম্পাদক আশফাকুল হকের বাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করত। গত ৬ ফেব্রুয়ারি সে অস্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করে। আমরা সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি।
মিরতিংগা চা বাগান পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি মন্টু অলমিক বলেন, ‘প্রীতি উরাং আমাদের বাগানেরই। মেয়েটির মা-বাবার সঙ্গে কথা বলে মিন্টু দেশোয়ারা ঢাকায় নিয়ে যায়। সে সময়ে প্রীতির মা-বাবাকে বলে, আমরা কিছু টাকা-পয়সা দেব। প্রায় দুই বছর হয়ে গেলেও মিন্টু প্রীতির মা-বাবাকে ঢাকায় নিয়ে যাননি, মেয়েটিকে দেখাননি। তারপর একদিন হুট করে মিন্টু বাগানে এসে বলে উনাদের (প্রীতির মা-বাবা) যেতে হবে তার সঙ্গে। তখন উনারা বলছে, কোথায়? তখন মিন্টু দেশোয়ারা বলেন, শ্রীমঙ্গল। শ্রীমঙ্গল নিয়ে গিয়ে মিন্টু বলেন, ঢাকায় যেতে হবে, ঢাকাতে মেয়ে অসুস্থ। এখন ঢাকায় গিয়ে দেখেন হাসপাতালে উনাদের মেয়ের লাশ। আমরা বাগান পঞ্চায়েত কমিটি মনে করছি, প্রীতিকে হত্যা করা হয়েছে। আমরা প্রীতি হত্যার বিচার চাই।’
মৌলভীবাজার চা জনগোষ্ঠী আদিবাসী ফ্রন্টের নির্বাহী পরিচালক পরিমল সিং বাড়াইক বলেন, ‘প্রীতি উরাং মিরতিংগা চা বাগানের উরাওঁ আদিবাসী সম্প্রদায়ের এক কিশোরী। আমরা যতটুকু জেনেছি, অভাবের তাড়নায় তার মা-বাবা গৃহকাজের জন্য ঢাকায় ডেইলি স্টারের নির্বাহী সম্পাদক আশফাকুল হকের বাসায় পাঠিয়েছিলেন। গত ৬ ফেব্রুয়ারি তার মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশে যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে, আমরাও আদিবাসী সংগঠনের পক্ষ থেকে মানববন্ধন করেছি। আমরা চাই, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হোক এবং পরিবারটি যাতে ন্যায়বিচার পায়, রাষ্ট্রের কাছে, সরকারের কাছে দাবি, পরিবারটি কীভাবে কন্যা হারানোর ব্যথা ভুলতে পারে তার ব্যবস্থা করা হোক অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে।’
প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে আলাপকালে প্রীতি উরাংয়ের মা নমিতা উরাং বলেন, ‘আমার মেয়েকে ঢাকা নিয়ে এভাবে অত্যাচার করা হয়েছে, হত্যা করা হয়েছে। মিন্টু সাংবাদিক আমাদের আইয়া কয়, শ্রীমঙ্গল যেতে। শ্রীমঙ্গল যাবার পর কয়, ঢাকা যেতে হবে। আমি বলি, কেন যাব ঢাকা? পরে আমরা ঢাকাতে গেছি। ওইখানে লোকগুলা কইতাছে, প্রীতির মা কে? প্রীতির মা কে? এখানে আমার বুলি-উলি (কথা) বারয় না। মাথা-উথা ঘুরাইয়া আমি বিনাস। এত সুন্দর ফুলের মতো মেয়েটারে নিয়া মারি লাইলো। আমি আমার মেয়ের হত্যার বিচার চাই। সরকারের কাছে আমি এইটাই চাই- বিচার। প্রীতির মৃত্যুর শাস্তি চাই।’