ইসমাইল মাহমুদ, মৌলভীবাজার
প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০২৪ ১০:১৫ এএম
আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২৪ ১১:৪৪ এএম
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার জাগছড়া চা-বাগানের ১৪ নম্বর সেকশনের টিলায় দাঁড়িয়ে আছে ‘ভূতবাংলো’। প্রবা ফটো
মৌলভীবাজারের বিভিন্ন চা-বাগানে ভূতবাংলো নামে পরিত্যক্ত বাড়ি রয়েছে। এ যুগের শিক্ষিত মানুষ ভূতে বিশ্বাস না করলেও অনেক চা-বাগানের অধিকাংশ মানুষ ভূতে বিশ্বাস করে। ভূতবাংলো নামে পরিচিত পরিত্যক্ত বাড়িতে যেতে ভয় পায় এবং এসব বাড়িতে যেতে নিষেধ করেন কেয়ারটেকাররা।
জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার শ্রীগোবিন্দপুর চা-বাগানের কারখানা ব্যবস্থাপক ফয়সল শামীম পাভেল এমনই একটি বাড়ির গল্প বললেন। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমাদের বাগানের এ ধরনোর কোনো বাংলো নেই। তবে পাশের পাত্রখোলা চা-বাগানে একটি ভূতবাংলো রয়েছে। ভূত নামে কোনো কিছুর অস্তিত্ব না থাকলেও কিছু বিষয় আছে।’ তিনি বলেন, ‘এর আগে আমি জেলার জুড়ী উপজেলার রত্না চা-বাগানে ছিলাম। সেখানে আমার বাংলোর পাশে একটি পরিত্যক্ত ঘরকে স্থানীয়রা লাশ কাটা ঘর নামে ডাকত। মূলত এটি ছিল হাসপাতাল। আমি বাগানে যোগ দেওয়ার পর ওই ঘর মেরামত করে বাবুর্চিকে দিয়েছিলাম থাকার জন্য। কিন্তু ওই বাবুর্চি থাকতে পারেননি। প্রথম রাত থেকেই ঘরে কোনো কিছু হাঁটাচলা করছে জানিয়ে তিনি কান্নাকাটি শুরু করেন। পরে তার ঘর বদলে দিই।’
বাস্তবে ভূত দেখেছেন এমন তথ্য কোনো চা-বাগানের কারও কাছে পাওয়া যায়নি। তবু অনেকেই বিশ্বাস করেন, অশরীরী আত্মা ভূত হয়ে ঘুরে বেড়ায়। অনেকেরই বিশ্বাস, অপঘাতে মৃত্যু, খুনের শিকার, দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া মানুষ ভূত হয়ে যায়।
গত শনিবার বিকালে জাগছড়া চা-বাগানের ১৪ নম্বর সেকশনে গিয়ে ভূতবাংলোর টিলায় ওঠার সময় পথ আগলে দাঁড়ান বাগানের শ্রমিক কানু তাঁতি। তিনি বলেন, ‘বাবু, ইকানে ভূত আছে। যাইয়েন না। ৪০-৫০ বছর আগে ইখানে যে বড় সাহেব ছিলেন তিনি ভূতের ঢরে পালাই গেছেন। এরপর আর কেই ইখানে আইন না।’ কানু নিজে ভূত না দেখলেও তিনি সেখানে যেতে ভয় পান। তার কথা উপেক্ষা করে টিলার ওপর গিয়ে দেখা যায়, পুরো বাংলোটি জরাজীর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। দরজা-জানালা সব বন্ধ রয়েছে। কাচের জানালা দিয়ে ভেতরে কিছু ভাঙা মালপত্র দেখা যায়। ঘরটা ‘৪০-৫০ বছর’ ধরে এভাবেই পড়ে আছে বলে জানিয়েছেন বাগানের লোকজন। কেন ঘরটি মেরামত করা হয় না বা এখানে কেন বসবাস করা হয় না, সে বিষয়ে বাগানের দায়িত্বশীল কেউ কথা বলতে রাজি হননি। তারা কী সত্যিই মনে করেন এখানে ভূত থাকে? এ বিষয়েও কেউ মুখ খুলতে চাননি।
স্টারলিং কোম্পানি হিসেবে ব্রিটিশ, স্কটিশ ও ইংরেজরা এ উপমহাদেশে চা উৎপাদন শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় আঠারো শতাব্দীর মাঝামাঝি মৌলভীবাজারে চা চাষ হয়ে আসছে। বর্তমানে এ জেলায় রয়েছে ৯১টি চা-বাগান। ব্রিটিশ শাসনামল, পাকিস্তান আমল ও স্বাধীন বাংলাদেশে এসব বাগান গড়ে তোলা হয়েছে। সব বাগানই শহর থেকে দূরে পাহাড়ি জনপদে অবস্থিত। শুরু থেকেই বাগানের টিলাজাতীয় স্থানে ব্যবস্থাপকদের সপরিবার বসবাসের জন্য বাংলো তৈরি করা হয়। ব্রিটিশ শাসনামলে গড়ে ওঠা অধিকাংশ বাংলো এখন জরাজীর্ণ ও পরিত্যক্ত। এসব বাংলো নিয়ে চা-বাগান এলাকায় রয়েছে নানা কল্পকাহিনী। এগুলো ভূতবাংলো নামে পরিচিত। কারও কারও মতে, ভূতের উপদ্রবে এসব বাংলো ছেড়ে পালিয়েছিলেন বাগান ব্যবস্থাপক ও সহকারী ব্যবস্থাপকরা। চা-বাগানের বহু শ্রমিক যুগ যুগ ধরে বিশ্বাস করে আসছেন, এসব পরিত্যক্ত বাংলোতে এখনও ভূত বসবাস করে।
দ্য কনসোলিডেটেড টি অ্যান্ড ল্যান্ডসের (ফিনলে) জাগছড়া চা-বাগানের ১৪ নম্বর সেকশনের সুউচ্চ টিলায়, কমলগঞ্জ উপজেলার ন্যাশনাল টি কোম্পানির পাত্রখোলা চা-বাগানের হাজারীবাগে, জুড়ী উপজেলার রত্না চা-বাগান, কমলগঞ্জ উপজেলার বজলুবাগসহ জেলার বেশ কয়েকটি চা-বাগানে স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে রয়েছে এসব ভূতবাংলো।
পাত্রখোলা চা-বাগান এলাকার সমাজকর্মী লিটন গঞ্জু বলেন, ‘পাত্রখোলা চা-বাগানের হাজারীবাগ এলাকায় উঁচু টিলায় অবস্থিত বড় সাহেব (ব্যবস্থাপক) বাংলো প্রায় চার দশক ধরে পরিত্যক্ত। এখানে রয়েছে ১০টি কক্ষ, বৈঠকখানা, বারান্দা, রান্নাঘর, গাড়ির গ্যারেজ। এই বাংলো নিয়ে আছে বেশ কিছু কল্পকাহিনী। বাগানের প্রবীণ ব্যক্তিদের কাছ থেকে জেনেছি, এই বাংলোয় একসময় ভূতের উপদ্রব ছিল। বড় সাহেব যখন বাংলোয় থাকতেন না তখন তার রূপ ধরা একজনকে বাংলোয় ঘোরাফেরা করতে ও খাওয়াদাওয়া করতে দেখা যেত। বড় সাহেব বাংলোয় আসার সময় হলে বড় সাহেবের রূপধারীকে আর দেখা যেত না।
এ রকম অদ্ভুত সব ঘটনা প্রায় প্রতিদিনই ঘটত বলে শুনেছি। ফলে ভূতের উৎপাতে তৎকালীন বড় সাহেব পরিবার নিয়ে ওই বাংলো ত্যাগ করেন। বাংলোটি এখন ভূতবাংলো নামে পরিচিত। স্থানীয়দের ধারণা, এখনও এখানে ভূত বসবাস করে। তাই একা কেউ ওই বাংলো এলাকায় যায় না। চা-বাগানের শ্রমিকরা ওই এলাকায় কাজে যেতে হলে কয়েকজন মিলে একসঙ্গে যায়।’