রংপুর অফিস
প্রকাশ : ০৩ মার্চ ২০২৪ ১৫:০৪ পিএম
আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২৪ ১৫:০৭ পিএম
রংপুরের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম শহীদ শংকু সমজদারের বাড়ির দেয়ালে জেলা প্রশাশনের উদ্যোগে ৩ মার্চের আন্দোলনকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। প্রবা ফটো
‘আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুরে, আমার ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে। আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়।’ ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আন্দোলনে আত্মত্যাগকারীদের স্মরণ করেন। এর মধ্যে রংপুর ছিল অন্যতম। কারণ রংপুরেই প্রথম রাজপথে রক্ত ঝরে, স্বাধীনতা আন্দোলনে প্রথম শহীদ হয়েছেন। রংপুরে স্বাধীনতা আন্দোলনে ইতিহাস রচনা করে গেছেন কিশোর শংকু সমজদার, শরীফুল আলম, আবুল কালাম আজাদ ও ওমর আলী।
মুক্তিযোদ্ধাদের সূত্রে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধের আগে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল রংপুরের সর্বস্তরের মানুষ। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ যুবক, ছাত্র, দিনমজুর, কৃষক, নারী-পুরুষসহ সর্বস্তরের মানুষ কারফিউ ভাঙার জন্য শহরের কাচারী বাজারে সমবেত হয়। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও তৎকালীন জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি রফিকুল ইসলাম গোলাপ, অলক সরকার, মুকুল মোস্তাফিজ, ইলিয়াস আহমেদসহ অন্য নেতৃবৃন্দ মিছিল বের করেন। সে সময়ে রংপুর কৈলাশ রঞ্জন উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া শংকু সমজদার তার বড় ভাই কুমারেশ সমজদারের হাত ধরে গুপ্তপাড়ার বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন মিছিলে অংশ নেওয়ার জন্য।
মিছিলটি শহরের তেঁতুলতলা (বর্তমানে শাপলা চত্বর) এলাকায় আসতেই কলেজ রোড থেকে কারমাইকেল কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি শহীদ মুখতার এলাহি, জিয়াউল হকসহ অন্যদের নেতৃত্বে আরেকটি মিছিল এসে যোগ দেয় মূল মিছিলের সঙ্গে। মিছিলটি আলমনগরের অবাঙালি ব্যবসায়ী সরফরাজ খানের বাসার সামনে যেতেই কিশোর শংকু ওই বাসার দেয়ালে উর্দুতে লেখা সাইনবোর্ড দেখে তা নামাতে ছুটে যান। তখনই সরফরাজ খানের বাড়ির দিক থেকে করা গুলিতে গুলিবিদ্ধ হন শংকু। গুলির শব্দে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। মাটিতে লুটিয়ে পড়া কিশোর শংকুকে পাঁজাকোলা করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু পথেই মারা যান শংকু।
একই মিছিলে গুলিবিদ্ধ হন শহর ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, কারমাইকেল কলেজ ছাত্রলীগ নেতা শরীফুল আলম ওরফে মকবুল। তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৭ এপ্রিল মারা যান। শংকুর শহীদ হওয়ার ঘটনায় বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে পুরো রংপুর। ৩ মার্চ রংপুর সরকারি কলেজের ছাত্র মিঠাপুকুর উপজেলার আবুল কালাম আজাদ বাটার গলির মুখে এবং ওমর আলী দেওয়ানবাড়ি রোড এলাকায় স্বাধীনতাবিরোধীদের ছুরিকাঘাতে মারা যান।
৩ মার্চের স্বাধীনতা আন্দোলনের মিছিলে থাকা সাংবাদিক, লেখক নজরুল মৃধা জানান, সকাল থেকে রংপুর নগরী ছিল গুমট। সকালে বাসা থেকে পৃথকভাবে বেরিয়ে পড়েন শংকু, শরীফুল ভাই। শহরের প্রধান সড়কে আসতেই দেখেন উত্তাল মিছিল। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঝাঁপিয়ে পড়েন জয় বাংলার মিছিলে। আলনগরের ঘোড়াপীর মাজারের কাছে শংকুর চোখে পড়ে উর্দুতে লেখা একটি সাইনবোর্ড। শংকু এগিয়ে যান সাইনবোর্ডটি নামাতে। আমরা বেশ কজন সে সময় শংকুর পাশেই ছিলাম। সাইনবোর্ডে কেউ কেউ ঢিল ছুড়ছিল। ঠিক তখনি অবাঙালি সরফরাজ খানের বাড়ির ভেতর থেকে চালানো হয় গুলি। ঢিলের আওয়াজ এবং গুলির আওয়াজের পার্থক্য বুঝতে পারিনি। সে সময় একজন পাশ থেকে বলে উঠল গুলি করেছে। মাথা নিচু কর।
তিনি আরও বলেন, ওই বাড়ির সামনে কতগুলো তেলের ড্রাম ছিল। আমরা ড্রামের আড়ালে মাথা নিচু করে কিছুটা দূরে চলে আসি। কিন্তু সেই গুলি শংকুর মাথা ভেদ করে বেরিয়ে যায়। বাবাগো মাগো বলে ডাক দিতে পারেনি। লুটিয়ে পড়ল নিথর নিস্তব্ধ রক্তাক্ত দেহ পিচঢালা পথের ওপর। স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হওয়ার ২২ দিন আগে আন্দোলনমুখর বাংলার সর্বপ্রথম শহীদ রংপুরের এই কিশোর শংকু। প্রায় একই সময়ে ওই স্থানে গুলিবিদ্ধ হন শরীফুল আলম। তাকে সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হলে এক প্রকার বিনা চিকিৎসায় ১৭ এপ্রিল মারা যান। সেই দিন আরও দুজন শহীদ হন। তারা হলেন, তৎকালীন রংপুর কলেজের ছাত্র মিঠাপুকুর উপজেলার আবুল কালাম আজাদ এবং ওমর আলী নামের এক সরকারি চাকরিজীবী।
নজরুল মৃধা বলেন, ৩ মার্চ স্বাধীনতা আন্দোলনে রংপুরে যারা আত্মত্যাগ করেছে তার মধ্যে শুধু শংকু সমজদারের নামটিই সবাই জানে। কিন্তু শংকু ছাড়াও শরীফুল, ওমর আলী, আবুল কালাম আজাদকে প্রাণ হারাতে হয়েছে। বিগত সময়ে এই আত্মত্যাগকারীদের নামে রংপুরে সড়ক ছিল। কিন্তু কালের বিবর্তনে এটি হারিয়ে গেছে। আমি চাই তাদের স্মৃতি সংরক্ষণে স্মৃতিস্তম্ভ কিংবা তাদের নামে সড়কের নামকরণ করা হোক।
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের জেলা সভাপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধা আকবর আলী বলেন, শংকু ও শরীফুল স্বাধীনতাবিরোধীদের গুলিতে নিহত হন। এ ঘটনায় সারা শহরে স্বাধীনতাকামী মানুষেরা ফুঁসে ওঠে। চারদিকে উত্তেজনা বিরাজ করে। একই দিনে ওমর আলী ও আবুল কালাম আজাদও হাতে নিহত হন।
মহানগর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার সদরুল আলম দুলু বলেন, ‘৩ মার্চ শংকু সমজদার গুলিতে নিহত হন। একই মিছিলে গুলিবদ্ধ শরীফুল আলম ওরফে মকবুল চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরবর্তী সময়ে মৃত্যুবরণ করেন। তারা দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে ইতিহাস রচনা করেছে।’