শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ১১:১৬ এএম
আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ১২:৩৫ পিএম
নিহত শ্রমিক নেতা শহিদুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত
গাজীপুরের টঙ্গীতে আলোচিত শ্রমিক নেতা শহিদুল ইসলাম হত্যা মামলার অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পুলিশ। হত্যার আট মাস পর গত শনিবার রাতে ১৪ জনকে আসামি করে অনলাইনে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। অভিযোগপত্রে আছে প্রিন্স জ্যাকার্ড সোয়েটার লিমিটেডের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপক এবং স্থানীয় প্রভাবশালী আমির হোসেনের নাম। এ দুজনের নির্দেশে শহিদুলকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করে পুলিশ। গাজীপুর শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অ্যাডিশনাল এসপি) ও মামলার তদন্ত কমিটির প্রধান ইমরান আহম্মেদ অভিযোগপত্র দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
শ্রমিক নেতা শহিদুল ইসলাম গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার রাজাবাড়ী ইউনিয়নের মিটালু গ্রামের বাসিন্দা।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা ১৪ আসামি হলেন- মাজাহারুল ইসলাম, আকাশ আহম্মেদ ওরফে বাবুল, রাসেল মণ্ডল, রাইতুল ইসলাম ওরফে রাতুল, সোহেল রানা, জুলহাস আলী, সোহেল হাসান সোহাগ, শাহীনুল ইসলাম, শাকিল মোল্লা, আমির হোসেন, হালিম মিয়া, রফিকুল ইসলাম, জুয়েল মিয়া ও আবু সালেহ।
গত বছরের ২৫ জুন টঙ্গীর সাতাইশ বাগানবাড়ী এলাকায় ‘প্রিন্স জ্যাকার্ড সোয়েটার লিমিটেড’ কারখানায় শ্রমিকদের পাওনা টাকা আদায়ে কাজ করতে গিয়ে নিহত হন শহিদুল ইসলাম। তিনি বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের গাজীপুর জেলা শাখার সভাপতি ছিলেন। এ ঘটনায় ২৬ জুন টঙ্গী পশ্চিম থানায় ছয়জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত সাতজনের বিরুদ্ধে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি কল্পনা আক্তার মামলা করেন। প্রাথমিক অবস্থায় মামলার তদন্ত করে টঙ্গী পশ্চিম থানার পুলিশ। পরবর্তী সময়ে ৬ জুলাই মামলার তদন্তভার পায় জেলা শিল্প পুলিশ।
আসামি আমির হোসেন টঙ্গীর সাতাইশ এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি। তার বিক্রি করা জমিতেই গড়ে ওঠে প্রিন্স জ্যাকার্ড সোয়েটার কারখানা। আমির হোসেন ওই কারখানায় ঝুট ব্যবসা করতেন। স্থানীয়রা জানান, অভিযুক্ত হালিম মিয়া আমির হোসেনের ভাই কামরুলের জমি ব্যবসার প্রজেক্ট ইনচার্জ হিসেবে এলাকায় পরিচয় দেন। আবু সালেহ প্রিন্স জ্যাকার্ড সোয়েটার লিমিটেডের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপক (অ্যাডমিন ম্যানেজার)। মাজাহারুল বাংলাদেশ পোশাক শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের টঙ্গী পশ্চিম থানার সাধারণ সম্পাদক। বাকি আসামিরা কেউ শ্রমিক নেতা, কেউ স্থানীয় বাসিন্দা।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, গত বছরের মে ও জুন মাসের বেতন এবং ঈদ বোনাসকে কেন্দ্র করে ২৫ জুন প্রিন্স জ্যাকার্ড কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দেয়। খবর পেয়ে ওই দিন বিকালে শ্রমিকদের বেতন আদায় করে দিতে কারখানায় যান শহিদুল, মোস্তফা, আক্কাছ ও শরিফ। বেতন-ভাতার বিষয়ে কথা বলে সন্ধ্যায় কারখানা থেকে বের হন শহিদুলসহ তার তিন সহযোগী। এ সময় স্থানীয় প্রভাবশালী আমির হোসেন ও কারখানার প্রশাসনিক ব্যবস্থাপক আবু সালেহর ইশারায় মাজাহারুলরা শহিদুলকে মারধর করেন। পরে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে শহিদুল মারা যান।
অভিযোগপত্র ও মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শ্রমিক নেতা শহিদুল ইসলাম বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকদের বেতনের সমস্যা নিয়ে কাজ করতেন। তার সঙ্গে কাজ করতেন মোস্তফা, আক্কাছ, শরিফসহ আরও তিন শ্রমিক নেতা। বিভিন্ন কারখানায় কমিটি দেওয়াকে কেন্দ্র করে তাদের সঙ্গে শ্রমিক নেতা মাজাহারুল ও রাসেল মণ্ডলদের বিরোধ হয়। শহিদুলের নেতৃত্বে তার সহযোগীরা কাজ করতেন গাজীপুর মহানগরীর গাছা থানায় এবং মাজাহারুলের নেতৃত্বে তার সহযোগীরা কাজ করতেন টঙ্গীর সাতাইশ এলাকার বিভিন্ন কারখানায়। ঘটনার দিন শহিদুল ও তার সহযোগীরা হঠাৎ করেই বেতন-ভাতার সমস্যা সমাধান করতে টঙ্গীর সাতাইশের প্রিন্স জ্যাকার্ড কারখানায় ঢুকে পড়েন। বিষয়টি ভালোভাবে নেননি মাজাহারুল ও তার লোকজন।
মামলার বাদী কল্পনা আক্তার বলেন, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপক জড়িত থাকলে কারখানার মালিক জড়িত থাকে না কীভাবে? আসামি আমির হোসেন ও হালিম মিয়া প্রভাবশালী জমি ব্যবসায়ী কামরুলের লোক। কামরুলের নির্দেশেই তারা কাজ করত। কিন্তু অভিযোগপত্রে কামরুল বা কারখানার মালিকের নাম নেই। এ বিষয়ে আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেব।
শহীদুলের স্ত্রী বলেন, তার স্বামী কারখানায় গিয়েছিল শ্রমিকদের দাবি ও পাওনা আদায়ে মালিকপক্ষের লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে। সেখানে শহীদুলের কোনো শত্রু নেই। কারখানা মালিকের একজন লোক রয়েছে যার নাম হানিফ। সে নিজে ঘটনাস্থলে থেকে তার স্বামী শহিদুলকে হত্যা করিয়েছে। পরে পুলিশ হালিম নামে একজন বয়স্ক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে। তাহলে যে হানিফ আমার স্বামীকে হত্যা করেছে সেই হানিফ কোথায় গেল?
তিনি বলেন, আমার স্বামীকে আর ফিরে পাব না, আমার সন্তানরা পাবে না তাদের বাবাকে। আমার স্বামীকে ইন্ধন ছাড়া হত্যা করা হয়নি। আমি চাই সঠিক তদন্ত হোক। নামের সঙ্গে মিল তৈরি করে প্রকৃত আসামি যেন লুকানোর চেষ্টা করা না হয়।
মামলার তদন্ত কমিটির সভাপতি ও গাজীপুর শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইমরান আহম্মেদ বলেন, মামলাটি বিভিন্ন কারণে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর। তদন্ত ও সাক্ষ্যপ্রমাণে স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী আমির হোসেন ও কারখানার কর্মকর্তা আবু সালেহর নাম উঠে এসেছে। মূলত তাদের ইশারায় অন্য আসামিরা শহিদুলের ওপর হামলা চালিয়েছেন। সবকিছু পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাইবাছাই করেই অভিযোগপত্র দিয়েছি।