× ই-পেপার প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি ফিচার চট্টগ্রাম ভিডিও সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পাবর্ত্য অঞ্চল

সংঘাতে পাহাড়ও থমথমে

গোলাম আনোয়ার সম্রাট, ঢাকা

প্রকাশ : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ১০:০৫ এএম

আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ১২:৩৫ পিএম

সংঘাতে পাহাড়ও থমথমে

মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধের আঁচ লেগেছে বাংলাদেশে। প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে পার্বত্য অঞ্চল ও সমুদ্রতীরবর্তী কক্সবাজারের কয়েকটি সীমান্ত এলাকায়। মিয়ানমারের সংঘর্ষে নিক্ষিপ্ত গোলায় এপারে হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। এরই মধ্যে আবার আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর রেষারেষিতে থমথমে হয়ে উঠেছে পার্বত্য তিন জেলা। সাম্প্রতিক সময়ে এসব জেলায় আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে প্রাণ ঝরেছে অনেকের। ঘটেছে একাধিক বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা। জনজীবনে তো বটেই, এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে পাহাড়ের পর্যটন শিল্পেও।

দুই দিন আগে গত শনিবার রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলায় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ-প্রসিত) এক কর্মীকে গুলি করে হত্যা করে প্রতিপক্ষ। এই মাসে জেলায় আরও দুই ইউপিডিএফ কর্মীকে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এরপর গত রবিবার বান্দরবানের থানচিতে ভ্রমণে আসা পর্যটকদের কাছ থেকে নগদ টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে খাগড়াছড়িতে নিজেদের কর্মী হত্যার প্রতিবাদে এ মাসের মাঝামাঝি থেকে স্থানীয় একটি বাজার বয়কট কর্মসূচি পালন করে আসছে ইউপিডিএফ।

সারি সারি পাহাড় আর বিশাল বনভূমিঘেরা দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত পার্বত্য অঞ্চলের তিন জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান। এই অঞ্চলের মানুষের অধিকার আদায় ও শান্তি চুক্তির বাস্তবায়নের দৃশ্যমান দাবির আড়ালে পাহাড়ে বর্তমানে সক্রিয় রয়েছে ছয়টি আঞ্চলিক সংগঠন। যার মধ্যে রয়েছে সন্তু লারমার জনসংহতি সমিতি (জেএসএস), প্রসিত খীসার ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ), জেএসএস (এমএন লারমা), ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক, মগ ন্যাশনাল পার্টি এবং সদ্য আবির্ভূত কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)। অভিযোগ, পাহাড়ে অস্থিতিশীলতার পেছনে রয়েছে এসব সংগঠনের পারস্পরিক দূরত্ব।

ভয়ানক পরিস্থিতি খাগড়াছড়ির

গত দেড় মাসে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর মধ্যে বড় পরিসরে দুটি বন্দুকযুদ্ধ হয়েছে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়া ও সদর উপজেলার ভাইবোনছড়া ইউনিয়নে। পানছড়ি, দীঘিনালা ও মহালছড়ি উপজেলায় বিরোধী গ্রুপের ব্রাশফায়ারে নিহত হয়েছেন অন্তত আটজন। ২৪ জানুয়ারি মহালছড়ি উপজেলা এবং রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রতিপক্ষের গুলিতে প্রসিত খীসা গ্রুপের দুই সদস্য রবি কুমার চাকমা ও শান্ত চাকমা ওরফে বিমল নিহত হন। ওই ঘটনার পর থেকে নিখোঁজ হয় দলের আরেক সদস্য রহিন্তু চাকমা ওরফে টিপন।

এর আগে গত ২০ ডিসেম্বর দুপুরে বাবুছড়া ইউনিয়নের দেওয়ানপাড়া এলাকায় ইউপিডিএফের দুই পক্ষের মধ্যে এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে বন্দুকযুদ্ধ হয়। এতে অন্তত দুজন নিহত হলেও এলাকাটি অতি দুর্গম হওয়ায় কারও মরদেহ উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় রক্তারক্তি ঘটেছে ১১ ডিসেম্বর রাতে পানছড়িতে। সেই রাতে উপজেলার ১নং লোগাং ইউনিয়নের অনিলপাড়ায় ইউপিডিএফ-সমর্থিত গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিপুল চাকমা, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি সুনীল বিকাশ ত্রিপুরা, জেলা সহসভাপতি লিটন চাকমা ও ইউপিডিএফ সদস্য রুহিন কুমার ত্রিপুরাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। চার নেতার হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্রে রেখে সংসদ নির্বাচনের আগে পাহাড়ের পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে ওঠে। অবশ্য নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছিল ইউপিডিএফ। সংঘাতজনিত পরিস্থিতিতে খাগড়াছড়ির ১৯৬টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৯ কেন্দ্রে একটিও ভোট পড়েনি। পরিসংখ্যানমতে, পানছড়ি উপজেলার ২৪টি কেন্দ্রের মধ্যে ১১টি, দীঘিনালা উপজেলার আটটির মধ্যে তিনটি এবং সবচেয়ে দুর্গম উপজেলা লক্ষ্মীছড়ির পাঁচটি কেন্দ্রের কোনোটিতেই কোনো ভোট পড়েনি। 

স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, নির্বাচনের আগে থেকেই ইউপিডিএফের পক্ষ থেকে বিভিন্ন গ্রামে মাইকিং করে কেন্দ্রে ভোট দিতে না যেতে বলা হয়। গ্রামপ্রধানদের ডেকে নিয়ে ভোট দিলে দশ হাজার টাকা জরিমানাসহ শারীরিক নির্যাতনের হুমকিও দেওয়া হয়। নির্বাচনের দিন পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে ফাঁকা গুলি ছুড়ে আতঙ্ক ছড়ানো হয়।

ভোটের আগে ২৯ ডিসেম্বর পানছড়ির দুর্গম দুধকছড়া এলাকায় নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে ইউপিডিএফের হামলার শিকার হন তৃণমূল বিএনপির প্রার্থী উশৈপ্রু মারমার সমর্থকরা। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার দুর্গম বর্মাছড়িতে নৌকার প্রচার চালাতে গেলে তাদের ওপর গুলি চালানো হয়। উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকসহ কয়েকজনকে অপহরণের চেষ্টাও চালানো হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় রক্ষা পান তারা।

খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক দিদারুল আলম গণমাধ্যমকে বলেছেন, ইউপিডিএফ রাষ্ট্র ও সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। ভোটারদের হুমকি দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনে বাধা দেওয়া হয়েছে। 

১১ ডিসেম্বর চারজনের প্রাণহানির জের ধরে ১৫ ডিসেম্বর থেকে পানছড়ি বাজার বয়কটের ঘোষণা দেয় ইউপিডিএফ। এ অবস্থায় প্রায় দেড় মাস স্থানীয় বাজারগুলো অচল ছিল। পরে ২৯ জানুয়ারি এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ১-১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাজার বয়কট কর্মসূচি স্থগিতের ঘোষণা দেয় ইউপিডিএফ। ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ফের একই কর্মসূচি পালন করে আসছে তারা। ফলে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে পাহাড়ের খেটে খাওয়া সহজ-সরল মানুষ। তবে নিজেদের এমন মৌলিক দাবি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার সাহসও পাচ্ছে না তারা। 

তবে ইউপিডিএফের প্রসিত খীসা গ্রুপের অন্যতম সংগঠক অংগ্য মারমা ভোটে বাধা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, তারা সাংগঠনিকভাবে আগেই নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। সাধারণ মানুষ সেই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে। কারণ স্থানীয়রা এই সরকার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তবে ভোটের আগে চার নেতা নিহত হওয়ার ঘটনায় পাহাড়ের রাজনীতিতে নতুন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলেও জানিয়েছেন অংগ্য।

ইউপিডিএফের নেতাকর্মীদের হত্যার অভিযোগ নিয়ে কথা হয় ইউপিডিএফের (গণতান্ত্রিক) কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মিটন চাকমার সঙ্গে। তিনি বলেন, এসব ঘটনায় আমাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বরং গত সাড়ে ছয় বছরে প্রসিত গ্রুপের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে গণতান্ত্রিকের আটজন নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার মুক্তা ধর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, পাহাড়ে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত পুরোনো এক সংকট। আধিপত্য বিস্তারের জেরে এবং নিজেদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণেই সহিংসতা ঘটছে। তবে সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধে সেনাবাহিনী ও বিজিবির সঙ্গে সমন্বয় রেখে পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে।

রাঙামাটিতে অভিযোগের তীর জেসএসএসের দিকে

রাঙামাটিতে চলতি মাসেই ইউপিডিএফের (প্রসিত) তিন কর্মীকে গুলি করে হত্যা করেছে প্রতিপক্ষ। গত ৪ ফেব্রুয়ারি বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নের মাচালং ব্রিজপাড়া এলাকায় একটি চা-দোকানে দুই ইউপিডিএফ কর্মীকে গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটে। সবশেষ গত শনিবার রাতে বাঘাইছড়ি উপজেলার বঙ্গলতলী ইউনিয়নের বঙ্গলতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এক ইউপিডিএফ কর্মীকে গুলি হত্যা করা হয়।

সবকটি ঘটনার সঙ্গে জেএসএসের দুই গ্রুপ জড়িত বলে ইউপিডিএফ অভিযোগ করেছে। ইউপিডিএফ রাঙামাটি জেলার সংগঠক সচল চাকমা জানান, জুম্ম জনগণের ন্যায্য দাবি আদায়ে ইউপিডিএফের আন্দোলন বানচাল করে দেওয়ার জন্য তাদের নেতাকর্মীদের হত্যা করা হচ্ছে।

তবে জেএসএস (সন্তু লারমা) বাঘাইছড়ির সাংগঠনিক সম্পাদক ত্রিদিব চাকমা বলেন, সাজেকে আমাদের সাংগঠনিক কোনো কার্যক্রম নেই। ইউপিডিএফের অভিযোগ ভিত্তিহীন।

জেএসএস (এম এন লারমা) বাঘাইছড়ির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক জ্ঞান সিন্দু চাকমা এক বিবৃতিতে বলেন, ইউপিডিএফ (প্রসিত) আমাদের দায়ী করে বিভিন্ন অপপ্রচার ও অপব্যাখ্যামূলক বক্তব্য প্রচার করছে। তারা দায়ী করলেও আমাদের সংগঠন এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নয়।

রাঙামাটিতে গত ছয় মাসের বেশি সময় ধরে বড় কোনো সংঘাতে জেএসএসের কারও হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার খবর আসেনি। তবে সংগঠনটির সঙ্গে একাধিকবার বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে অন্য সংগঠনের। 

পার্বত্য চট্টগ্রামে হত্যা, নির্যাতন, অপহরণ ও যৌন সহিংসতার ঘটনা নিয়ে চলতি বছরের ১০ জানুয়ারি একটি বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল ইউপিডিএফ। এতে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে পাহাড়ে হত্যার শিকার হয়েছে ২৫ জন, গ্রেপ্তার হয়েছে ৪৯ জন, শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে ২১ জন, অপহরণ হয়েছে ৪৩ জন এবং যৌন সহিসংতার শিকার হয়েছে ২৩ জন নারী ও শিশু।

রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজী মুছা মাতব্বর বলেন, ‘অন্তত ৪-৫টি পাহাড়ি সংগঠনগুলো এলাকায় চাঁদাবাজিতেও লিপ্ত। রাঙামাটির পর্যটন শিল্প বিকাশে বড় বাধা আঞ্চলিক সংগঠনগুলো।’

রাঙামাটির পুলিশ সুপার মীর আবু তৌহিদ বলেন, ‘যারা অপরাধী, যারা সন্ত্রাসী তাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখানো হচ্ছে। পার্বত্য রাঙামাটি জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ তৎপর রয়েছে।’

শান্ত বান্দরবানে উড়ছে অশান্তির বার্তা

তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে সবচেয়ে শান্ত ছিল বান্দরবান। কিন্তু গত কয়েক বছরে এই জেলা ‘খারাপ’ সংবাদের শিরোনাম হয়েছে বেশ কয়েকবার। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জনপদে ‘স্বাধীনতার দাবি’ নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে সশস্ত্র গোষ্ঠী কুকিচিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) নামে একটি সংগঠন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সাবেক শিক্ষার্থী নাথান বমের নেতৃত্বাধীন এই সংগঠনের সন্ত্রাসী উপদল কুকিচিন আর্মির (কেএনএ) একাধিক সশস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তি। জঙ্গি সংগঠনকেও আশ্রয় ও প্রশিক্ষণ দিয়েছে কেএনএফ। নতুন এই আঞ্চলিক সংগঠনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দমনে গঠিত শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটি ইতোমধ্যে আলোচনার চেষ্টা চালালেও তা তেমন ফলপ্রসূ হয়নি।

গত রবিবার বান্দরবানের থানচিতে ভ্রমণে আসা কয়েকজন পর্যটকের কাছ থেকে ১ লাখ ৮১ হাজার টাকা ও ১৫টি মোবাইল ছিনিয়ে নিয়েছে কেএনএফ সন্ত্রাসীরা। ভেলাখুম পর্যটন স্পটে এই ঘটনা ঘটে জানিয়ে থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ মামুন বলেন, ভুক্তভোগীরা আমার কার্যালয়ে এসেছিলেন। তাদের থানায় যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছি।

থানচি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জসিম উদ্দিন বলেন, ওই এলাকায় সম্প্রতি সন্ত্রাসীদের অপতৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় পর্যটক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। পর্যটকরা প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে রেমাক্রি খালের মুখ পর্যন্ত ভ্রমণ করতে পারবেন। নাফাকুম, আমিয়াকুম, ভেলাকুমে যাওয়ার তো প্রশ্নই আসে না।

স্থানীয় সূত্র জানায়, জন্মলগ্ন থেকে রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার বড়থলি ইউনিয়ন, বান্দরবানের রুমা, রোয়াংছড়ি ও থানচি উপজেলার দুর্গম এলাকাগুলো টার্গেটে নেয় কেএনএফ। এসব এলাকায় বম, পাংখোয়া, লুসাই, খুমী, খেয়াং ও ম্রোÑ এই ছয় জাতিসত্তার অধিকারের দাবিতে সশস্ত্র কার্যক্রম পরিচালনা করছে কেএনএফ।

কেএনফের সন্ত্রাসী তৎপরতায় বারবার পাহাড় ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞায় পড়তে হচ্ছে পর্যটকদের।

কেএনএফ ও অন্যদের সঙ্গে বিরোধে হত্যাকাণ্ড নিয়ে অনুসন্ধান থেকে জানা যাচ্ছে, গত বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে বান্দরবানের বিভিন্ন উপজেলায় কমপক্ষে পাঁচজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। অপহরণেরও ঘটনা ঘটে। ৭ এপ্রিল রোয়াংছড়ি সদর ইউনিয়নের খামতাংপাড়ায় গোলাগুলিতে নিহত হন বম জাতিগোষ্ঠীর আটজন। শান্তি চুক্তির আগে কিংবা পরে একসঙ্গে এত মানুষ নিহত হওয়ার মতো বড় ঘটনা ঘটেনি। ২৭ এপ্রিল রুমা উপজেলার পাইন্দু ইউনিয়নের দুর্গম মুয়ালপিপাড়া থেকে বয়রামসাং বম নামে কেএনএফের এক সদস্যের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরবর্তীকালে মে-জুন মাসেও বান্দরবানে কমপক্ষে নয়জন নিহত কিংবা মৃত অবস্থায় উদ্ধার হয়। 

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা যায়, ১৩ ফেব্রুয়ারি রুমার রিঝুকপাড়ার উহ্লাচিং মারমা নামে এক জুম চাষিকে গুলি করে আহত করে সন্ত্রাসীরা। পরদিন ১৪ ফেব্রুয়ারি রুমার সচেতন নাগরিকের ব্যানারে কেএনএফের বিরুদ্ধে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ১৮ ফেব্রুয়ারি থানচি উপজেলার ১১ মাইল বাকলাইপাড়ায় সীমান্ত সড়কের কাজে নিয়োজিত একটি ট্রাকে আগুন ধরিয়ে কেএনএফ। একই দিন রুমা বাস স্টেশনের লাইনম্যান লুপ্রু মারমা বাড়ি থেকে স্টেশনে যাওয়ার সময় পলিকাপাড়া শ্মশান এলাকায় তার ওপর হামলা চালিয়ে আহত করে কেএনএফ। 

গত বছরের ১৩ মার্চ র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার আল মঈন সাংবাদিকদের জানান, পাহাড়ে যৌথ বাহিনীর জঙ্গি সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাসহ ৬৮ জন গ্রেপ্তার হন। এ ছাড়া কেএনএফের ১৭ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। পাহাড়ে জঙ্গি ও সশস্ত্র সংগঠনগুলো সম্পূর্ণ নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত থাকবে।

কেএনফের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড রুখতে ২০২৩ সালের ৩০ মে গঠিত হয় শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটি। বান্দরবানের বিভিন্ন জাতিসত্তার প্রতিনিধি নিয়ে গঠিত এই কমিটি কয়েক দফায় বৈঠক করেছে কেএনএফের সঙ্গে। চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি ভার্চুয়াল বৈঠকে একত্র হয় শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটির সদস্য ও কেএনএফের প্রতিনিধিদল। এক ঘণ্টার এ বৈঠকে আগামী মার্চে সরাসরি আলোচনা করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেএসএসের এক শীর্ষ নেতা বলেন, শান্তি চুক্তির পর বান্দরবানে ২০ জন জেএসএস নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। 

বান্দরবান দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি ও মানবাধিকারকর্মী অংচ মং মারমা বলেন, এ ব্যাপারে সুশীল সমাজের ভূমিকা রাখার তেমন সুযোগ নেই। তবে জেলার মাসিক আইনশৃঙ্খলা বৈঠকে মতামত উপস্থাপন করা যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথাযথ পদক্ষেপ নেবেÑ সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।

এ ব্যাপারে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক লক্ষ্মী পদ দাশ বলেন, অতীতে কী হয়েছে সেটা আমি বলতে চাই না। তবে বান্দরবান জেলার সার্বিক পরিস্থিতি বর্তমানে শান্তই বলা যায়। আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে সব গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের সহাবস্থানে এখানে সহনশীলতা তৈরি হয়েছে।

অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বান্দরবানের পরিস্থিতি ভালো উল্লেখ করে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) হোসাইন মো. রায়হান কাজেমী বলেন, পুরো জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্য দলমত নির্বিশেষে সামাজিক ও রাজনৈতিক দলের নেতাসহ সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।

ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের শুরু

দুই দশকের সশস্ত্র লড়াই শেষে ১৯৯৭ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি সই করে পাহাড়ের প্রথম রাজনৈতিক দল জেএসএস। তবে জেএসএসের ছাত্রসংগঠন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের একটি বড় অংশ ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং ১৯৯৮ সালে প্রসিত বিকাশ খীসার নেতৃত্বে গড়ে তোলে ইউপিডিএফ। আবার প্রসিত খীসার নেতৃত্বে ইউপিডিএফ আদর্শচ্যুত হয়েছে- বছর সাতেক আগে এমন অভিযোগ তুলে ২০১৭ সালে সংগঠনটির একাংশ গড়ে তোলে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) নামে আলাদা সংগঠন। ২০০৬ সালে আরও একবার ভাঙে জেএসএস। ২০১০ সালে একাংশের নেতাকর্মীরা গঠন করেন জেএসএস (এমএনলারমা)। এই অংশটি সংস্কারবাদী হিসেবে পরিচিত। এই চার সংগঠনের নিজস্ব বিরোধে বারবার লাল হয়েছে সবুজ পাহাড়।

ইউপিডিএফ বিভক্ত হওয়ার পর গত সাড়ে ছয় বছরে দুই পক্ষের অন্তত ৬৬ জন নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে অর্ধশতাধিক মূল ইউপিডিএফের নেতাকর্মী; বাকিরা গণতান্ত্রিক অংশের। প্রসিত খীসাবিরোধী এই অংশটির বর্তমান নেতৃত্বে রয়েছেন প্রসিতের বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা শ্যামল কান্তি চাকমা তরু।

বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যমতে, ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত পার্বত্য অঞ্চলে খুন হয়েছে চার শতাধিক মানুষ। অপহরণের শিকার হয়েছে পাঁচ শতাধিক মানুষ। প্রসিতপন্থি ইউপিডিএফের দাবি ইউপিডিএফ প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিপক্ষের হাতে সংগঠনটির ৩৫৮ নেতাকর্মী হত্যার শিকার হয়েছেন। এ ছাড়া সংস্কারপন্থি জেএসএস (এমএন লারমা) দলের ৮৩ জন খুন হয়েছেন প্রতিপক্ষের হাতে।

ইউপিডিএফের প্রসিত খীসা গ্রুপের অন্যতম সংগঠক অংগ্য মারমার দাবি, ১৯৯৮ সালে তারা দল গঠনের পর এখন পর্যন্ত তাদের ৩৫৮ জন নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। তার মধ্যে ৩০০ জন হত্যার শিকার হয়েছেন সন্তু লারমার জেএসএসের হাতে। বাকি ৫৮ জনকে হত্যা করেছে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) ও জেএসএস (সংস্কারপন্থি)।

ইউপিডিএফের (প্রসিত) মুখপাত্র অংগ্য মারমা বলেন, ইউপিডিএফের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, মামলা, খুন অব্যাহত রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। আগে পুলিশ-প্রশাসনের প্রতি পাহাড়ের মানুষের কিছুটা আস্থা থাকলেও এখন আর নেই। এ থেকে স্পষ্ট, পাহাড়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির দিকে।

ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) বান্দরবান জেলার সাধারণ সম্পাদক শ্রী উবামং মারমা বলেন, পার্বত্য চুক্তির ২৬ বছর অতিবাহিত হতে চলল, কিন্তু চুক্তি অনুসারে আজও পার্বত্য চুক্তির মূল বিষয়গুলো সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি। এ কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে পেশি শক্তির ব্যবহার অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে নেতৃত্বে দ্বিধাবিভক্তি থাকলে পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ জুম্ম জনগণের স্বার্থরক্ষা হবে না। জুম্মদের জাতীয় অস্তিত্ব ও জন্মভূমি সংরক্ষণে নিজেদের বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। 

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য ও শিক্ষাবিদ নিরূপা দেওয়ান বলেন, সমতলের চেয়ে পাহাড়ে বেশিসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়োজিত। তারপরও কিছু দিন পরপর পাহাড় অশান্ত হয়ে ওঠে, হত্যাকাণ্ড ঘটে। বলতে গেলে এটা একটা রুটিনওয়ার্ক হয়ে গেছে। এত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থাকার পরও আমরা সাধারণ মানুষ কেন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগব?

পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির চেয়ারম্যান ও বান্দরবান জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কাজী মো. মজিবর রহমান বলেন, ‘পার্বত্য চুক্তির পর ২৬ বছর ধরে একটি পক্ষকে তোষামোদ করার কারণে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং ৪-৫টি সংগঠন সৃষ্টি হয়ে বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত হয়েছে। যারা প্রকাশ্যে সশস্ত্র প্রশিক্ষণের কথা বলে, বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে চিরুনি অভিযান পরিচালনা করে কঠোরভাবে দমন করতে হবে।’


[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন বান্দরবানের সুফল চাকমা, রাঙামাটির রিকোর্স চাকমা ও খাগড়াছড়ির খোকন বিকাশ ত্রিপুরা জ্যাক] 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০১৭১২০৩৩৭১৫ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা