মিয়ানমারে সংঘাত
কক্সবাজার অফিস
প্রকাশ : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ১৩:৩৭ পিএম
আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ১৬:১৬ পিএম
বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে সতর্ক অবস্থানে বিজিবি সদস্যরা। সম্প্রতি তোলা। প্রবা ফটো
বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় শনিবার রাতে থেকে রবিবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) সকাল পর্যন্ত মিয়ানমার থেকে থেমে থেমে গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের শব্দ ভেসে এসেছে। এতে করে সীমান্তে আবারও উদ্বেগ ও উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।
টানা কয়েকদিন শান্ত থাকলেও শনিবার রাতে নতুন করে গোলাগুলির শব্দ শোনেছেন বান্দরবানের ঘুমধুম সীমান্তের মানুষ। কক্সবাজারের টেকনাফের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায়ও শনিবার সন্ধ্যা থেকে রবিবার সকাল পর্যন্ত গোলাগুলির শব্দ শোনা গেছে।
সীমান্তের ওপারে বিরাজমান সংঘাতময় পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সীমান্তবাসীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশেরও আশঙ্কা করছেন জনপ্রতিনিধিসহ স্থানীয়রা।
ঘুমধুম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আজিজ জানান, ঘুমধুম সীমান্তের পরিস্থিতি টানা এক সপ্তাহ শান্ত থাকলেও রবিবার ভোর ৪টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত গোলাগুলির শব্দ শোনা গেছে। সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের অভ্যন্তর থেকে থেমে থেমে এসব গোলাগুলির শব্দ এসেছে। ওখানে কি হচ্ছে তা পরিষ্কারভাবে বলা যাচ্ছে না। ফলে সীমান্তের মানুষের মনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুস সালাম জানান, শনিবার সন্ধ্যার পর সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপের জালিয়াপাড়ার পূর্ব পাশে মিয়ানমার থেকে পর পর কয়েকটি মর্টার শেলের বিকট শব্দ শোনা গেছে। এতে করে শাহপরীর দ্বীপ প্রকম্পিত হয়েছে। শনিবার রাত থেকে রবিবার ভোর রাত পর্যন্ত থেমে থেমে গুলির শব্দ শোনা গেছে।
গত সোমবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যার পর থেকে শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত টেকনাফ উপজেলার সীমান্তে কোনো ধরনের গোলাগুলি ও বিস্ফোরণে বিকট শব্দ আর শোনা যায়নি। টানা তিনদিন বন্ধ থাকার পর শুক্রবার বিকাল ও ভোর রাতে এবং শনিবার সন্ধ্যার পর থেকে আবারও গোলাগুলির শব্দ ভেসে আসায় সীমান্তে বসবাসকারি বাংলাদেশি নাগরিকদের মধ্যে আতঙ্কে দেখা দিয়েছে।
ইউপি সদস্য আব্দুস সালাম জানান, শনিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে সাবরাং ইউনিয়নের উল্টো দিকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে মংডু শহরের ফাদন চা, নুরুল্লাহপাড়া, কাদির বিল ও শায়রাপাড়া এলাকায় সেনাবাহিনী ও স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে লড়াইরত আরাকান আর্মির (এএ) মধ্যে ধরনের সংঘর্ষ শুরু হয়েছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। সেখানে রাতভর ৪০ থেকে ৪৫টি মর্টার শেল নিক্ষেপ ও থেমে থেমে গোলাগুলি হয়েছে।
হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মোহাম্মদ আলম জানান, শনিবার দিনভর হোয়াইক্যং ইউনিয়নের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু সন্ধ্যার পর থেকে কাঞ্জরপাড়া, খারাংখালী ও উনচিপ্রাং সীমান্তের ওপারে মিয়ানমার অভ্যন্তর থেকে থেমে গোলাগুলি ও ভারী গোলাবর্ষণের শব্দ ভেসে আসে। এতে সীমান্তবাসীরা রাতভর আতঙ্কে ছিল। তবে রবিবার ভোর থেকে হোয়াইক্যং সীমান্তের পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে বলে জানান, স্থানীয় এ ইউপি সদস্য।
স্থানীয়দের ধারণার বরাতে ইউপি সদস্য মোহাম্মদ আলম জানান, রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী বাহিনীর নেতা নবী হোসেনের লোকজন মিয়ানমার সীমান্তের অভ্যন্তরে আত্মগোপনে রয়েছে। শুক্রবার সকালে মিয়ানমারের ওপার থেকে যেসব গোলাগুলির শব্দ পাওয়া গেছে তা তাদের দ্বারা সংগঠিত হতে পারে। সীমান্তের ওপাড়ে এখনও যুদ্ধ চলমান আছে। ফলে সেখান থেকে এখনও গোলাগুলির বিকট শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে সীমান্ত এলাকায় চিংড়ি খামারের শ্রমিকরা কাজে যেতে ভয় পাচ্ছে।
হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপির) চেয়ারম্যান নুর আহমেদ আনোয়ারী বলেন, টানা কয়েকদিন শান্ত ছিল সীমান্ত। শনিবার সন্ধ্যার পর থেকে রবিবার ভোর পর্যন্ত উনচিপ্রাং, কাঞ্জরপাড়া ও খারাংখালী সীমান্তে নাফ নদীর ওপাড়ে গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের বিকট শব্দ শুনছেন স্থানীয় লোকজন। তারা বিষয়টি আমাকে জানালে আমি ইউএনওকে অবহিত করেছি।
শাহপরীর দ্বীপ বাজারপাড়ার আব্দুল গনি ও জাফর আলম বলেন, শনিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ওপারে মিয়ানমার অভ্যন্তরে গোলাগুলি ও ভারী অস্ত্রের বিকট শব্দের আওয়াজ শোনা যায়নি। এতে অশান্ত পরিবেশ ও ভয়ভীতি অনেকটা কেটে উঠছিল। এমন সময় সন্ধ্যার পর থেকে একের পর একটি বিকট শব্দে কেঁপে উঠেছে শাহপরীর দ্বীপ। এতে করে সীমান্তে বসবাসকারিরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আদনান চৌধুরী বলেন, গত সোমবার সন্ধ্যার পর থেকে শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত সীমান্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল। এসময়ে বিস্ফোরণ ও গোলাগুলির শব্দ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। তবে শুক্রবার রাত শনিবার ভোর রাতে কয়েকটি সীমান্ত এলাকায় গোলাগুলির শব্দ শোনা গিয়েছিল। এরপর শনিবার দিনভর সীমান্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও সন্ধ্যার পর থেকে রবিবার ভোর পর্যন্ত হোয়াইক্যং এবং শাহপরীর দ্বীপ সীমান্ত দিয়ে বিকট শব্দ শোনা গেছে।
মিয়ানমারের অভ্যন্তর সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে সীমান্তে বিজিবি, কোস্টগার্ড ও পুলিশের টহল বাড়ানো হয়েছে এবং সীমান্তবাসীকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে বলেও জানান এ সরকারি কর্মকর্তা।
পরিস্থিতি নতুন করে উত্যপ্ত হওয়ার মধ্যেই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির অনেকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে বলে খবর পাওয়া গেছে । ছোট ছোট দলে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা ইতিমধ্যে রুখে দিয়েছে বিজিবি।
এদিকে সীমান্তে চলমান সংঘাতে জের ধরে বান্দরবানের ঘুমধুম সীমান্তবর্তী ৫টি সরকারী প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ২০ দিন ধরে বন্ধ রয়েছে।
নাইক্ষ্যংছড়ির উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাকারিয়া বলেন, শিশুদের শিক্ষার বিষয়টি মাথায় রেখে মাঠ পর্যায়ে খোঁজখবর নিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে উপজেলা পর্যায়ে স্কুল গুলো খোলার সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। এ বিষয়ে আজ-কালের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।