এস এম রানা, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ১৪:২২ পিএম
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল। ছবি: সংগৃহীত
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলের ভেতর-বাইরে ধারাবাহিকভাবে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। গত বছরের ২৮ অক্টোবর উদ্বোধনের পরদিন থেকে গত ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সাতটি দুর্ঘটনায় দুজন নিহত ও ১৫ জন আহত হয়েছে। এর মধ্যে টানেলের ভেতরে ঘটেছে তিনটি দুর্ঘটনা। বাকি চারটি দুর্ঘটনা ঘটেছে টানেলের উভয় প্রান্তের সংযোগ সড়কে। এসব দুর্ঘটনার পর আইনি কার্যক্রমের জন্য ডাক পড়ছে পুলিশের। কিন্তু টানেলের দুই পাড়ের থানার পুলিশ জরুরি মুহূর্তে টানেলে প্রবেশ করতে পারছে না। দুর্ঘটনার পর উদ্ধার কার্যক্রম ও আইনি ব্যবস্থা নিতে গিয়েও পুলিশের গাড়িকে টোল পরিশোধ করতে হচ্ছে। এমতাবস্থায় দুর্ঘটনার পর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
আবার ২০২১ সালে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে টানেলের দুই প্রান্তে দুটি থানা নির্মাণের প্রস্তাব নেওয়া হলেও সেই থানা এখনও অনুমোদন পায়নি। নতুন থানার প্রস্তাব চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) থেকে ঢাকার পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানোর পর সেটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। আর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রস্তাবটি ২০২২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি থানা গঠনের পরবর্তী কার্যক্রম নিতে মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয়ে পাঠায়। সেই থেকে এখন পর্যন্ত (১৫ ফেব্রুয়ারি) দুই বছরেও নতুন থানার প্রস্তাবটি অনুমোদন পায়নি।
অবশ্য নতুন থানা অনুমোদনের আশার কথা জানা গেছে গতকাল বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) সভায়। ওই সভায় টানেলের দুই প্রান্তের দুটিসহ চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রস্তাবিত চারটি থানাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের দুই ডজন প্রস্তাব উঠেছে। সেই অর্থে দুই বছর ধরে আটকে থাকা প্রস্তাবটি গতকাল নিকার সভায় উঠল। পরে কার্যক্রম ত্বরিত গতিতে চললে দ্রুতই নতুন থানা অনুমোদন পেতে পারে সিএমপি।
প্রস্তাবটি দুই বছর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে আটকে থাকায় সিএমপির কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা তৈরি হয়েছে। যদিও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মনরক্ষার্থে মহানগর পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা এই বিষয়ে মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকছেন। অবশ্য, গত ৪ ফেব্রুয়ারি সিএমপির ৪৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের উপস্থিতিতে বক্তব্য দেওয়ার সময় সিএমপি কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় বলেন, ‘নতুন থানার প্রস্তাব অনুমোদনের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে।’ বাস্তবিক অর্থে, প্রক্রিয়াধীন থাকার ছদ্মাবরণে কার্যত প্রস্তাবটি ‘আটকে’ থাকার বিষয়টি তুলে ধরেন এই সিএমপি কর্মকর্তা।
নতুন থানার প্রস্তাব অনুমোদন মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয়ে আটকে থাকলেও নতুন ভবন নির্মাণের কাজ বন্ধ রাখেনি টানেল কর্তৃপক্ষ। এরই মধ্যে টানেল কর্তৃপক্ষ পুলিশের জন্য দুটি ভবনের নির্মাণকাজ প্রায় শেষ করেছে। আগামী মার্চ মাসের মধ্যেই ভবনের কাজ পরিপূর্ণভাবে শেষ করে হস্তান্তর করা যাবে বলে জানিয়েছে টানেল কর্তৃপক্ষ। সিএমপির পরিকল্পনা ছিল, নতুন ভবনে নতুন থানার যাত্রা হবে। কিন্তু থানার প্রস্তাব আটকে থাকায় আপাতত সিএমপির সেই আশা পূর্ণ হচ্ছে না। তাই এখন নতুন থানা অনুমোদন না হওয়া পর্যন্ত ওই দুই ভবনে ফাঁড়ির কার্যক্রম চালানোর পরিকল্পনা করছে সিএমপি।
সিএমপি থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ‘বঙ্গবন্ধু টানেল পূর্ব’ ও ‘বঙ্গবন্ধু টানেল পশ্চিম’ নামে দুটিসহ মোট চারটি থানা স্থাপনের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল পুলিশ সদর দপ্তরে। যাচাই-বাছাইয়ের পর সেই প্রস্তাবটি ২০২২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিবের কাছে পাঠায় পুলিশ সদর দপ্তর। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নতুন চারটি থানা স্থাপনের সুপারিশসহ প্রস্তাবটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানোর দুই বছর পরেও সিএমপির থানা গঠনের প্রস্তাব অনুমোদন পায়নি। বর্তমানে কর্ণফুলী ও পতেঙ্গা থানা টানেলে পুলিশি নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করলেও দূরত্ব এবং শিল্পজোন হওয়ার কারণে সেবা কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে। এরই মধ্যে যদি অনাকাক্ষিতভাবে বড় ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ঘটে, তাহলেই বিপদ। কারণ, থানার দূরবর্তী অবস্থান পুলিশের দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছার ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পুলিশের গাড়ি পারাপারে টোল আদায়।
কি পয়েন্ট ইনস্টলেশন (কেপিআই) ভুক্ত প্রকল্পের ভেতরে ফৌজদারি অপরাধের ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা পুলিশের। কিন্তু গাড়ির টোল জটিলতায় পুলিশ টানেলে প্রবেশে সমস্যা হচ্ছে। আপাতত সড়ক দুর্ঘটনা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার বিষয়টি সামনে এলেও এর চেয়ে ভয়ংকর অবস্থা তৈরি হতে পারে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বড় ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ঘটলে। তখন ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার চেয়েও দ্রুত সাড়া দেওয়ার প্রয়োজন পড়বে পুলিশের।
প্রায় ১০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পের পুলিশি নিরাপত্তায় বিন্দুমাত্র ফাঁকফোকর রাখা সমীচীন নয় বলে বিশিষ্ট নাগরিকরা মন্তব্য করেছেন। তাদেরই একজন উচ্চ আদালতের অবসরপ্রাপ্ত বিচারক এস এম মুজিবুর রহমান। প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পের ভেতরে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটতে পারে। পাশাপাশি দুর্ঘটনা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার বিষয় তো আছেই। এই কারণে কর্তৃপক্ষের উচিত টানেলের ভেতরে যাতায়াত সহজ করতে পুলিশের গাড়ি টোলমুক্ত রাখা।’ তিনি বলেন, ‘জাতীয় পর্যায়ের অতি গুরুত্বপূর্ণ টানেলের নিরাপত্তায় বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া উচিত হবে না।’
উদ্বোধনের পর থেকে ঘটে যাওয়া সাতটি দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, টানেলের ভেতরের তিনটি দুর্ঘটনাস্থানে ডেকোরেশন বোর্ডসহ নিরাপত্তা সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় পুলিশের ডাক পড়েছে। এর মধ্যে মাত্র একটি ঘটনায় টানেল কর্তৃপক্ষ মামলা করেছে। টানেলের কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, টানেল এলাকায় রেকার আছে। সিসিটিভি ক্যামেরায় দুর্ঘটনার তথ্য জানার পর দ্রুত সাড়া দেওয়া হচ্ছে। গাড়ি উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনে পুলিশ ডাকা হচ্ছে। পুলিশের সুবিধার্থে দুই প্রান্তের পতেঙ্গা ও কর্ণফুলী থানা ছাড়াও আনোয়ারা থানার একটি গাড়ি টোল ফ্রি করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তিন থানার তিনটি গাড়ি টোলমুক্ত করা হলেও বাস্তবিক অর্থে সংকট নিরসন হয়নি। কারণ, তিন থানার ওসিদের ব্যবহৃত গাড়ি তিনটি টোলমুক্ত করা হয়েছে। বাস্তবে, দুর্ঘটনার মতো ঘটনায় প্রাথমিকভাবে সাড়া দেন ডিউটিরত পুলিশের টহল গাড়ি। সেই গাড়ি টোলমুক্ত নয়। এই কারণে টোল পরিশোধ করে পুলিশের গাড়ি টানেলের ভেতরে প্রবেশ করতে হচ্ছে। কিন্তু টোল পরিশোধের মতো আলাদা বাজেট পুলিশের নেই। এতে বাজেট সংক্রান্ত সমস্যাও হচ্ছে।
এই সমস্যা নিরসনের লক্ষ্যে সিএমপি কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় গত জানুয়ারি মাসে সেতু কর্তৃপক্ষের পরিচালকের (প্রশাসন) কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছে। ওই চিঠির তথ্য অনুযায়ী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলটি চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের পতেঙ্গা এবং কর্ণফুলী থানাকে সংযুক্ত করেছে। বাংলাদেশের ঐতিহ্য এবং দেশের প্রথম এ টানেলের সার্বিক নিরাপত্তার গুরুত্ব বিবেচনা করে টানেলের উভয়প্রান্তে ‘বঙ্গবন্ধু টানেল পূর্ব থানা’ এবং ‘বঙ্গবন্ধু টানেল পশ্চিম থানা’ গঠনের প্রস্তাব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদনের পর পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য বর্তমানে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রক্রিয়াধীন আছে। বর্তমানে টানেলের নিরাপত্তায় টোল প্রদান সাপেক্ষে অফিসার-ফোর্স মোতায়েনসহ নিরাপত্তা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। দেশের বড় দুটি সেতু তথা বঙ্গবন্ধু সেতু ও পদ্মা সেতু দুটি করে জেলাকে সংযোগ করেছে। সেখানে দুই জেলার সংশ্লিষ্ট থানার গাড়ি টোল ফ্রি ব্যবস্থা চালু আছে। অথচ বঙ্গবন্ধু টানেলের অবস্থান সিএমপির একক ইউনিটের অধিভুক্ত। এই টানেল ব্যবহারে পুলিশের গাড়ি টোল ফ্রি না হওয়ায় টানেলের সার্বিক নিরাপত্তা ও যানবাহন নিয়ন্ত্রণ বিঘ্নিত হচ্ছে। তাই টানেলের সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে সিএমপির ২৩টি গাড়ি পারাপারে টোলমুক্ত সুবিধা প্রয়োজন। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, সিএমপির অধিভুক্ত হওয়ায় শাহ আমানত তৃতীয় সেতু পারাপারে পুলিশের গাড়ি টোলমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে।
এই চিঠির বিষয়ে সিএমপির উপ-কমিশনার (এস্টেট) এস এম মোস্তাইন হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘টানেলের সার্বিক নিরাপত্তায় নিয়মিত অপারেশনাল কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সিএমপির ২৩টি গাড়ি পারাপারে টোলমুক্ত সুবিধা দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে কমিশনার সেতু বিভাগের পরিচালকের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। আশা করি, কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তার স্বার্থ বিবেচনায় ইতিবাচক সিদ্ধান্ত জানাবে।’
অবশ্য, গত জানুয়ারি মাসে এই চিঠি পাঠানো হলেও গতকাল ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সিএমপির অনুরোধে সাড়া দেয়নি সেতু কর্তৃপক্ষ। ফলে ১০ ফেব্রুয়ারি দুর্ঘটনার সময় পুলিশকে টোল পরিশোধ সাপেক্ষে টানেলের ভেতরে দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছতে হয়েছে।
সিএমপির অনুরোধে সাড়া না দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে টানেল প্রকল্পের উপপরিচালক প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘টানেল উদ্বোধনের পর তিনটি থানার তিনটি গাড়ি টোলমুক্ত পারাপারের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। পরে জেনেছি, সিএমপি একটি তালিকা পাঠিয়েছে। সেই তালিকা এখনও হাতে পাইনি। তালিকা প্রাপ্তি সাপেক্ষে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
পুলিশের জন্য নির্মিতব্য দুটি ভবনের কাজের অগ্রগতি বিষয়ে তিনি বলেন, ভবন দুটির নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এখন রঙ এবং কিছু টাইলসের কাজ বাকি আছে। আশা করি মার্চ মাসের মধ্যেই ভবন দুটি হস্তান্তরযোগ্য হবে।
টানেলের ভেতরে গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছেÑ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা শুরু থেকেই মাইকিং করছি, লিফলেট বিতরণ হচ্ছে। টানেলের ভেতের এফএম রেডিওর মাধ্যমে নিরাপত্তামূলক নির্দেশিকা প্রচারিত হচ্ছে। সাইনবোর্ডে সর্বোচ্চ গতিবেগ ৬০ কিলোমিটার লেখা আছে। এরপরও কিছু চালক দ্রুতবেগে গাড়ি চালাচ্ছেন। আপাতত সিসিটিভি ক্যামেরা দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে ভবিষ্যতে স্পিড ক্যামেরা স্থাপন করে গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
নতুন থানা গঠনের প্রস্তাব দুই বছরে ধরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে ফাইলবন্দি থাকার বিষয়ে জানতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেনকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।