× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সুবর্ণচরে ফের ‘সংঘবদ্ধ ধর্ষণ’

‘চরবেষ্টিত উপজেলায় ক্ষমতাসীনদের কাছে অসহায় মানুষ’

নোয়াখালী প্রতিবেদক

প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ০০:৫১ এএম

আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ১০:৫০ এএম

নোয়াখালীর সুবর্ণচরে সিঁধ কেটে ঘরে ঢুকে মা-মেয়েকে ‘ধর্ষণ করেছে’ আসামিরা। প্রবা ফটো

নোয়াখালীর সুবর্ণচরে সিঁধ কেটে ঘরে ঢুকে মা-মেয়েকে ‘ধর্ষণ করেছে’ আসামিরা। প্রবা ফটো

নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলায় গৃহবধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের দায়ে ১০ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার দিনে আরেকটি সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। এবার সিঁধ কেটে ঘরে ঢুকে যৌন নিপীড়ন করা হয়েছে মা-মেয়েকে। আগের মতো এবারের ঘটনাতেও এসেছে ক্ষমতাসীন দলের নেতার নাম। এরই মধ্যে অভিযুক্ত চরওয়াপদা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। স্থানীয়রা বলছেন, চরবেষ্টিত এই উপজেলার মানুষ ক্ষমতাসীনদের কাছে অসহায়। যারা সমাজের পথপ্রদর্শক তারাই যদি এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনায় জড়িত হয়ে পড়েন, তাহলে সাধারণ মানুষ যাবে কার কাছে? পুলিশ সুপার বলছে, অপরাধী যে দলেরই হোক- তা যেমন অতীতে আমলে নেওয়া হয়নি এবারও হবে না। জড়িত সবাইকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে।

দিনমজুরের স্ত্রী-মেয়েকে ‘সংঘবদ্ধ ধর্ষণ’

সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ এনে মঙ্গলবার (৬ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে উপজেলার চরজব্বার থানায় মামলা করেছেন এক দিনমজুরের স্ত্রী। এজাহারে বলা হয়েছে, কয়েক মাস আগে বাদীর স্বামী নতুন বাড়ি করেন। ওই বাড়িতে স্ত্রী ও তিন সন্তানসহ বসবাস করতেন দিনমজুর। দুই দিন আগে কাজের সন্ধানে বাড়ির বাইরে যান বাদীর স্বামী। এই সুযোগে গত সোমবার দিবাগত রাত ২টার দিকে ঘরের সিঁধ কেটে ভেতরে প্রবেশ করে একজন। পরে সে ঘরের দরজা খুলে দিলে আরও দুজন ভেতরে ঢোকে। তাদের মধ্যে দুজন ওই গৃহবধূকে এবং তার মেয়েকে ধর্ষণ করে। গৃহবধূর হাত-পা ও মুখ বেঁধে ঘরে থেকে একজোড়া স্বর্ণের কানের দুল, নাক ফুল ও নগদ ১৭ হাজার ২২৫ টাকা লুট করে নিয়ে যায়। পরে শিশুদের চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন এসে গৃহবধূর বাঁধন খুলে দেয় এবং বিষয়টি চরজব্বার থানাকে জানালে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে।

চরজব্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, মঙ্গলবার ভোর পর্যন্ত পুলিশ ওই স্থানে ছিল। সকালে অভিযোগকারীদের থানায় নেওয়া হয়। পরে তাদের চিকিৎসা ও শারীরিক পরীক্ষার জন্য নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়। দুপুরে দুজনের নাম উল্লেখসহ তিনজনের নামে নারী ও নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন গৃহবধূ। এর পর পরই শহরের মাইজদী এলাকা থেকে ওয়াপদা ইউনিয়ন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও একই ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য আবুল খায়ের মুন্সিকে গ্রেপ্তার করা হয়।

নোয়াখালীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বিজয়া সেন জানান, ওই নারী আবুল খায়ের মুন্সিকে প্রধান আসামি করে মামলা করেছেন। গ্রেপ্তারের পর আসামিকে সদর থেকে চরজব্বার থানায় আনা হয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অপর দুই আসামিকে গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।

বাদী জানান, রাতে হঠাৎ করে ঘরে আলো জ্বলে উঠলে তার ঘুম ভেঙে যায়। এ সময় মুন্সি মেম্বার ও তার এক সহযোগী ওড়না দিয়ে তার মুখ, হাত-পা বেঁধে তাকে ধর্ষণ করে। অপর একজন পাশের ঘরে গিয়ে তার বড় মেয়েকে ধর্ষণ করে। বেরিয়ে যাওয়ার সময় তারা স্বর্ণ ও নগদ টাকা নিয়ে যায়।’

ওই নারীর স্বামী বলেন, ‘আমি দিনমজুর। কাজের জন্য একেক দিন একেক এলাকায় থাকি। গতকাল আমি বাড়িতে ছিলাম না। গভীর রাতে তিনজনের দল সিঁধ কেটে ঘরে ঢুকে আমার স্ত্রী ও বড় মেয়েকে ধর্ষণ করে। আমি তাদের শাস্তি চাই।’

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের পর যেদিন এই দিনমজুরের জীবনে এমন ভয়াবহ ঘটনা নেমে এলো সেদিনের শুরুতে গৃহবধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের এক মামলার রায় পান সুবর্ণচরবাসী। একাদশ সংসদ নির্বাচনের ভোটের রাতের ঘটনাটিতে জড়িত থাকার দায়ে সুবর্ণচর উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন প্রচার সম্পাদক রুহুল আমিনসহ ১০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এ ছাড়া ৬ আসামিকে যাবজ্জীবন এবং প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

নোয়াখালী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক (জেলা জজ) ফাতেমা ফেরদৌস আলোচিত এ মামলার রায় পর্যালোচনায় বলেছেন, আসামিরা শুধু ভিকটিমের ক্ষতি করেনি বরং রাষ্ট্রেরও ক্ষতি করেছে। এ ধরনের অপরাধ করে আসামিরা যদি খালাস পায় তাতে বিচারক ও বিচারব্যবস্থা নিয়ে জনগণের মধ্যে আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয়। তাই আসামিরা বিচারকের কোনো ক্ষমা কিংবা করুণা পেতে পারেন না বরং তারা তাদের প্রকৃত অপরাধের সাজা পেলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে। ভবিষ্যতে কোনো ব্যক্তি এ ধরনের অপরাধ করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকবে।

যা বলছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা 

নোয়াখালী নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সদস্য সচিব জামাল হোসেন বিষাদ বলেন, ‘দলবদ্ধ ধর্ষণের দায়ে ১০ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার রায়টি ঐতিহাসিক হয়েছে। সেদিন আবার মা ও মেয়েকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনাটি আমাদের জন্য ন্যক্কারজনক। আমরা লজ্জিত এসব ঘটনায়। আগের মামলায় ইউপি সদস্য রুহুল আমিন জড়িত ছিল। এবার ইউপি সদস্য খায়ের মুন্সি। যারা সমাজের পথপ্রদর্শক তারাই যদি এমন ঘটনার সঙ্গে জড়িত হয় তাহলে মানুষ কোথায় যাবে। 

নারী অধিকার জোটের সভাপতি লায়লা পারভীন বলেন, ‘সুবর্ণচর উপজেলা চরাঞ্চল হওয়ায় এখানে মানুষজন ক্ষমতাসীনদের কাছে অসহায়। স্থানীয়রা অতীতেও যেমন নির্যাতনের শিকার হয়েছে বর্তমানেও হচ্ছে। তবে সবকিছু আমাদের কাছে আসে না। ভিটেমাটি আর নিজেদের জীবন রক্ষায় তাদের অনেকে এসব অপরাধ গোপন রাখছেন।

সুশাসনের জন্যে নাগরিক সুজনের জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট মোল্লা হাবিবুর রাছুল মামুন বলেন, ‘ভূমিহীনরা একটু ঠাঁইয়ের জন্য ভূমিদস্যুদের কাছ থেকে জমি কিনে থাকে। কিন্তু এক পর্যায়ে তাদের স্ত্রী সন্তানকে সম্ভ্রম হারাতে হয়। এ ধরনের ঘটনায় যারাই জড়িত থাকুক না কেন তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত।’

যা বলছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ

সুবর্ণচর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হানিফ চৌধুরী বলেন, ২০১৮ সালের ঘটনায় রুহুল আমিনকে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। সংগঠনবিরোধী কাজে জড়িত হওয়ায় সুবর্ণচর উপজেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আবুল খায়ের মুন্সি মেম্বারের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আমরাও চাই দোষী ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ শাস্তি। তারা আমাদের দলের পরিচয় দিয়ে অপকর্মে জড়িত হবে, তা হতে পারে না। 

আওয়ামী লীগ নেতা আবুল খায়ের মুন্সির ভাগিনা মো. দুলাল উদ্দিন কিরণ বলেন, ‘আমার মামার বয়স প্রায় ৭০ বছরের ওপরে। তিনি অনেক অসুস্থ মানুষ। তার অপারেশন হয়েছে। তার মাধ্যমে এই ঘটনা ঘটানো সম্ভব নয়। সত্য গোপন থাকে না তা একদিন প্রকাশ হবেই।’

পুলিশের কঠোর অবস্থান

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে একেক স্থানে একেক ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়। চরাঞ্চলে মানুষজনের আনাগোনা কম থাকে। সেখানে বসতি যেমন কম তেমনি কোনো ঘটনা ঘটলে সেটা প্রকাশ হতেও সময় লাগে। তার মধ্যে আইনের সহযোগিতা পাওয়ার আগেই অনেকে সালিশের মাধ্যমে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন। এতে করে নিজেদের মধ্যে আইনের প্রতি অনাস্থা চলে আসে। লোকলজ্জার ভয়ে অনেক ঘটনা আবার অপ্রকাশিত থেকে যায়। এসব ক্ষেত্রে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করানো দরকার এবং নিজেদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার থাকা দরকার বলে আমি মনে করি।

জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, ‘যেকোনো ঘটনা আমরা পেলে আইনগত ব্যবস্থাগ্রহণ করে থাকি। এসব ক্ষেত্রে আসামি ক্ষমতাসীন দলের অনুসারী নাকি জনপ্রতিনিধি সেসব আমাদের দেখার বিষয় না। আইন আইনের গতিতে চলে। ২০১৮ সালের সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিন মামলার আসামি ছিলেন না। আমরা তদন্তে নাম পেয়ে তার বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়েছি। আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। অপরাধী সব সময় অপরাধী। বিশেষ সুবিধা পাওয়ার সুযোগ নেই। অপরাধীদের একচুলও ছাড় দেওয়া হবে না। আশা করি এধরনের মামলায় বাদী ন্যায়বিচার পাবেন। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা