প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ২১:৩৬ পিএম
আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ০০:৫০ এএম
মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে আরাকান আর্মির যুদ্ধের প্রভাবে বান্দরবানের ঘুমধুমসহ কক্সবাজারের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। মিয়ানমার থেকে আসা গুলি ও মর্টার শেল এসে পড়ছে বাংলাদেশে। গুলিতে অন্তত দুই বাংলাদেশি আহত হয়েছেন। উড়ে আসা গোলার আঘাতে পুড়ে গেছে অন্তত তিনটি বাড়ি।
মিয়ানমারের রাখাইনে গুলিবিদ্ধ হয়ে সে দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিপি) সদস্য ও সাধারণ অনেক নাগরিক আশ্রয় নিচ্ছেন বাংলাদেশে। ইতোমধ্যে আহত বেশ কয়েকজনকে কক্সবাজার ও বান্দরবানের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অনেকে আশ্রয় নিয়েছেন বিজিবির বিভিন্ন ক্যাম্পে। রাখাইন রাজ্যের (আরাকান) সার্বভৌমত্বের জন্য এই যুদ্ধ করছে আরাকান আর্মি। আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগ দিয়েছেন রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) যোদ্ধারা।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে পুলিশ-বিজিবি। অনেক এলাকা থেকে সাধারণ নাগরিকদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সীমান্তবর্তী বিভিন্ন স্কুল ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, রাখাইনে সংঘর্ষ চলাকালে হেলিকপ্টার থেকে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায় ব্যাপক হামলা করছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। বান্দরানের ঘুমধুম সীমান্ত এলাকায় রবিবার বিকালে কয়েক দফায় হেলিকল্টার চক্কর দিতে দেখা গেছে বলে সেখানকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন। হেলিকপ্টার থেকে ছোড়া গুলিতে নজরুল ইসলাম টিটু নামে বাংলাদেশি এক যুবক গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। ঘুমধুম ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আনোয়ার হোসেন এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, তমব্রুর পশ্চিম কুল এলাকায় টিটু নিজ বাড়ির সামনে গুলিবিদ্ধ হন। তাকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এর আগে সকাল ১০টার দিকে তমব্রু সীমান্তে গুলিবিদ্ধ হন প্রবীর চন্দ্র ধর নামে এক ব্যক্তি। তিনি ঘুমধুম ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের হিন্দু পাড়ার বাসিন্দা।
আনোয়ার আরও জানান, শনিবার রাত থেকে তুমুল সংঘর্ষের মধ্যে বাংলাদেশের ভিতরে বেশ কিছু গুলি ও মর্টার শেল এসে পড়েছে। এতে কমপক্ষে তিনটি বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাতে বাইশফাঁড়ি এলাকার প্রবাসী নুরুল কবীরের বাড়িতে বারুদের গোলা পড়ায় বাড়িটি ভস্মীভূত হয়েছে। আগের দিন শনিবার বিকালে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে একটি গুলি এসে অটোরিকশায় লেগে এর কাচ ভেঙে যায়।
বিজিপির ৫০ সদস্য বাংলাদেশে
সংঘাতে পরাজিত ও আহত হয়ে বিজিপির কমপক্ষে ৫০ সদস্য পালিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছেন। তাদের অনেকেই গুলিবিদ্ধ। রবিবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা ৬টার দিকে আহত বিজিপি সদস্যদের কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এমএসএফ হাসপাতালে নিয়ে যান বিজিবি সদস্যরা। বিজিপির আহত ১০ সদস্যকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
বিজিবি-৩৪ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান কর্নেল আব্দুল্লাহ আল আশরোকি বলেন, ‘তুমুল যুদ্ধের মধ্যে কয়েকজন বিজিপি সদস্য প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশ সীমান্তে অনুপ্রবেশ করেছেন। তাদের বিজিবির ঘুমধুম সীমান্ত বিওপিতে রাখা হয়েছে। বিজিপি সদস্যদের অস্ত্র ও গুলি বিজিবির কাছে জমা রাখা আছে। তাদের বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ বিজিপির কতজন সদস্য অনুপ্রবেশ করেছেন তা নিশ্চিত করতে পারেননি তিনি।
থমথমে ঘুমধুম সীমান্ত
বান্দরবানের জেলা প্রশাসক শাহ মোজাহিদ উদ্দিন বলেন, মিয়ানমারের সঙ্গে সংযুক্ত মহাসড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সীমান্তের লোকজনকে সতর্ক ও নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার জন্য বলা হয়েছে। সীমান্তে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবি, পুলিশসহ নিরাপত্তা বাহিনী সবাই সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সীমান্ত এলাকার পাঁচটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি মাদ্রাসা আবারও বন্ধ ঘোষণা করেছে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ ও মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগ। একই কারণে গত ২৯ জানুয়ারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একদিনের জন্য বন্ধ ছিল।
আরাকান আর্মির লক্ষ্য রাখাইনের সার্বভৌমত্ব
আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার চেয়ে আরাকান আর্মি গঠিত হয় ২০০৯ সালের ১০ এপ্রিল। ২৬ জন সদস্য নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই দলে ছিলেন রাখাইন তরুণ ও ছাত্ররা। ২০২১ সালের আগস্টে আরাখা মিডিয়াকে এক সাক্ষাৎকারে আরাকান আর্মির কমান্ডার-ইন-চিফ বলেন, ‘আমাদের সশস্ত্র বিপ্লবের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হলো আরাকানের সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধার করা। এতে কোনো দরকষাকষি হয়নি এবং ভবিষ্যতেও হবে না। মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে আরাকান আর্মির সংঘর্ষ শুরু হয় দেড় বছর আগে। ২০২২ সালে জুলাই থেকে টানা ছয় মাস যুদ্ধ চলে। এরপর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে আবারও সংঘর্ষ শুরু হয়েছে।
রাখাইন রাজ্যে উত্তেজনা দেখা দিলে সেখানকার রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করে। বর্তমান পরিস্থিতিতেও মিয়ানমারের বহু নাগরিক বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা করেছে। মিয়ানমারে ১৯৭৭-৭৮ সালের ড্রাগন কিং (নাগা মিন) অভিযানের পর হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। পরে কিছু রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন হলেও নব্বইয়ের দশকের প্রথমদিকে রোহিঙ্গারা আবার বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে। সবচেয়ে বেশি রোহিঙ্গা আসে ২০১৭ সালের আগস্টে। বর্তমান বাংলাদেশে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে বলে বাংলাদেশ সরকার বলে আসছে। মিয়ানমারের সমঝোতার ভিত্তিতে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা ব্যর্থ হয়। রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের জন্য তালিকা তৈরির পরও আশাব্যঞ্জক কিছু হয়নি।
কেউ গায়ে এসে পড়লে ছাড় নয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, মিয়ানমার সংকট অনেক দিনের। আরাকান আর্মির সঙ্গে মিয়ানমার সরকারের যুদ্ধ চলছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলে আসছেন, বাংলাদেশ কখনো যুদ্ধে জড়াতে চায় না। বাংলাদেশ শান্তিতে বিশ্বাস করে। তবে কেউ গায়ে এসে পড়লে ছাড় দেওয়া হবে না। সে জন্য বাংলাদেশ সব সময় প্রস্তুত রয়েছে। রবিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। তীব্র গোলাগুলিতে দিশেহারা হয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়া মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের ফেরত পাঠাতে দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিলম্ব করা যাবে না: আব্দুর রশীদ
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল আব্দুর রশীদ (অব.) প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেছেন, ‘মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত নাগরিকের সংখ্যাটা বাড়ছে। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের বিষয়ে কোনো যোগাযোগ করেছে বলে আমার জানা নেই। তার মানে তাদের যে উদ্যোগ-আন্তরিকতা বা তাদের মানুষকে বাঁচানোর যে আন্তরিকতা সেটার অভাব দেখা যায়। এই ঘটনা কিন্তু ভারতের সঙ্গেও ঘটছে। ভারত সরকার ওগুলোকে উড়োজাহাজে করে নিয়ে তাদের ফিরিয়ে দিয়ে এসেছে। আমি মনে করি, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে বিলম্ব করার কারণ নেই।