শাহিনুর সুজন, চারঘাট (রাজশাহী)
প্রকাশ : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ০৯:৩১ এএম
আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ১৬:৩৫ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
শীত এলেই গ্রামগঞ্জের বাতাসে ভেসে বেড়ায় গুড়ের মিষ্টি গন্ধ। বাঙালিও গুড় খেতে ভীষণ পছন্দ করে। বিশেষ করে গুড়প্রেমীরা শীতের এ সময়ে পিঠা-পায়েসে বেশি ঝুঁকে পড়ে।
এ ছাড়া চিনি থেকে গুড় স্বাস্থ্যের জন্যেও ভালো। অনেকে শরীর-স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে নিয়মিত গুড় খান। গুড়ে থাকে আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম, জিংক, সেলেনিয়াম এবং পটাশিয়াম। যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় ও সংক্রমণ দূরে রাখে।
কিন্তু আশঙ্কার কথা হচ্ছে, দেশে খেজুরগাছের সংখ্যা কমলেও বেড়েছে খেজুরের গুড় উৎপাদন। যে গাছগুলো আছে তাতেও তেমন রস মিলছে না। ফলে বাজারে খেজুর গুড়ের ব্যাপক চাহিদা থাকলেও গুড় তৈরির কাঁচামাল খেজুর রসের সংকট রয়েছে। আর এই অধিক চাহিদাকে কেন্দ্র করে গুড়ে মিশছে ভেজাল। গুড় তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে কৃত্রিম চিনি ও রাসায়নিক রঙ। অতিমাত্রায় বাণিজ্যিক চিন্তা এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের অতি লোভ খেজুরের ভেজাল গুড় তৈরির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাড়তি চাহিদা সামাল দিতে এবং রঙ উজ্জ্বল করতে খেজুর গুড়ে চিনি, ফিটকিরি ও রাসায়নিক মেশানোর অভিযোগ রয়েছে।
রাজশাহীর চারঘাট উপজেলায় খেজুরের রস ছাড়াই ভারতীয় চিটাগুড়ের চিনি, রঙ ও চুন দিয়ে তৈরি হচ্ছে ভেজাল খেজুর গুড়। ভেজাল গুড় তৈরির অসংখ্য ছোট-বড় কারখানা গড়ে উঠেছে এ উপজেলায়।
চারঘাটের সবচেয়ে বড় খেজুর গুড়ের হাট বসে নন্দনগাছি বাজারে। প্রতিদিন এই হাটে প্রায় ৮ থেকে ১০ টন এবং সপ্তাহে দুই দিন বড় হাটে ১৮ থেকে ২০ টন গুড় কেনাবেচা হয়। প্রতিদিন ভোরে ভ্যান, নছিমনসহ বিভিন্ন যানবাহনে আশপাশের এলাকা থেকে এই হাটে গুড় আসে। কিন্তু কী দিয়ে তৈরি হচ্ছে এত খেজুরের গুড়? আর এ গুড়ে আদৌ কি খেজুরের রস থাকে? এসব প্রশ্ন এখন মানুষের মুখে মুখে।
চারঘাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বর্তমানে উপজেলায় ১ লাখ ৮৪ হাজার ২৭৫টি খেজুরগাছ রয়েছে । তবে প্রতি বছরই উপজেলায় গড়ে ৫-৭ হাজার গাছ কমছে।
কৃষি অধিদপ্তরের তথ্যমতে, একটি খেজুরগাছ থেকে ৪ কেজি হারে গুড় উৎপাদন হয়। তাতে উপজেলায় ৭৩৭ টন গুড় উৎপাদিত হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে তার চেয়েও কয়েক গুণ বেশি খেজুর গুড় উৎপাদিত হচ্ছে। যার অধিকাংশ গুড়ই গাছিরা তৈরি করেন না, বরং গাছিদের রস কিনে নিয়ে কারখানায় আলাদাভাবে ভেজাল গুড় তৈরি করে বাজারে ছাড়া হচ্ছে।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকার খেজুর গুড় তৈরির কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খেজুরগাছ যা টিকে আছে, তাতে আগের মতো রস হয় না। ৮ থেকে ১০টি গাছ মিলেও পর্যাপ্ত খেজুরের রস এক দিনে পাওয়া যাচ্ছে না। রসের পরিমাণ কম হওয়ায় খাঁটি গুড় তৈরি করাও কষ্টসাধ্য। গুড়ের পরিমাণ বাড়াতে অনেকে রসের সঙ্গে অর্ধেক পরিমাণ ভারতীয় চিটাগুড় ও চিনি, চুন ও রঙ মিশিয়ে থাকেন। তাতে খেজুরের রসের ঘ্রাণ কিছুটা হলেও পাওয়া যায়। কিন্তু কিছু কারখানার মালিক গাছিদের কাছ থেকে নামমাত্র রস কিনে চিটাগুড়, চিনি, আটা, কাপড়ের রঙ, চুন ও ফিটকিরি মিশিয়ে রাতের আঁধারে কয়েক মণ গুড় তৈরি করছে। স্থানীয় হাটবাজারে এসব গুড়ের সরবরাহ বেশি।
স্থানীয়রা জানান, বর্তমান বাজারে প্রতি কেজি চিনির দাম ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা। অপরদিকে প্রতি কেজি গুড় বিক্রি হচ্ছে ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা কেজি দরে। প্রতি ৬০ কেজি গুড় তৈরিতে খেজুর রসে মেশানো হচ্ছে ৪০ থেকে ৪৫ কেজি চিনি। দাম ও মান অনুযায়ী চিনি মেশানোর পরিমাণ কমা-বাড়া হয়। যে পরিমাণ চিনি মেশানো হয় তাতে খেজুর গুড়ের অস্তিত্ব থাকছে না। বরং ভারতীয় চিটাগুড় চিনি ও আটা খেজুরের গুড়ে মিশিয়ে বেশি লাভে বিক্রি করছেন তারা।
চারঘাট উপজেলার ভাটপাড়া এলাকার খেজুর গুড় প্রস্তুতকারক কাউসার আলী বলেন, চিনিমিশ্রিত গুড় শক্ত এবং কেমিক্যালের কারণে উজ্জ্বল হওয়ায় বাজারে আসল গুড়ের চেয়ে এর চাহিদাও বেশি। চিনি তো খারাপ জিনিস না। শত শত মানুষ এভাবেই গুড় তৈরি করছে। কেউ বেশি চিনি দিচ্ছে আবার কেউ কম, এটাই পার্থক্য। বাংলাদেশের সব জিনিসেই ভেজাল আমাদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। চিনি না দিলে গুড় তৈরি করে লোকসান হবে।
নন্দনগাছি বাজারের পাইকারি গুড় ব্যবসায়ী আসিফ হোসেন বলেন, আমরা নিজেরা গুড় তৈরি করি না। গুড় পাইকারি কিনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্রি করি। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত ভেজাল গুড় তৈরির কারণে লাখ লাখ টাকার গুড়ের ব্যবসা এখন ক্ষতির মুখে। প্রতি বছরই গুড়ের বাজার বড় হচ্ছে কিন্তু সুনাম হারাতে বসেছে রাজশাহীর গুড়।
খেজুর গুড় উৎপাদনকারীরা চিনি মিশ্রণ দিয়ে গুড়ের উৎপাদন বাড়ানোর কথা বললেও উল্টো যুক্তি দিচ্ছেন কৃষি কর্মকর্তারা। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোজদার হোসেন বলেন, ইটভাটাসহ নানা কারণে কিছু উপজেলায় প্রতি বছর গাছের সংখ্যা কমছে। তবে গুড়ের উৎপাদন বাড়ছে রস নষ্ট না হওয়ার কারণে। আগে মানুষ কাঁচা রস খেত এ ছাড়াও নানাভাবে নষ্ট হতো। কিন্তু এখন মানুষ সচেতন হওয়ায় সব রসই গুড়ের তৈরির কাজ ব্যবহার হচ্ছে। এজন্য গাছের পরিমাণ কমলেও গুড়ের উৎপাদন বাড়ছে।
চারঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আশিকুর রহমান বলেন, চিনি ও কেমিক্যালমিশ্রিত গুড় খেলে আলসার, ডায়রিয়া, কলেরাসহ পেটের নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে ওই গুড় দিয়ে শিশুদের কোনো খাদ্য তৈরি করে খাওয়ালে শিশুরা কিডনি, হার্ট ও লিভার ক্যানসারের মতো ভয়াবহ জটিল রোগেও আক্রান্ত হতে পারে।
এ বিষয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের রাজশাহীর সহকারী পরিচালক মো. মাসুম আলী বলেন, ভেজাল গুড় তৈরি বন্ধে আমরা চারঘাট-বাঘা এলাকায় অনেকগুলো পরিচালনা করেছি। এখন অধিকাংশ কারখানায় দিনের পরিবর্তে রাতের আঁধারে ভেজাল গুড় তৈরি হচ্ছে। এজন্য আমাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে সমস্যা হচ্ছে। তারপরও সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে আমরা তাৎক্ষণিক সেখানে অভিযান পরিচালনা করছি।