কৃষ্ণ ব্যানার্জী, সাতক্ষীরা
প্রকাশ : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ০৯:২২ এএম
আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ১৬:৩৫ পিএম
সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার মুরারীকাটি গ্রামে তৈরি হচ্ছে বিশ্বমানের ইতালিয়ান টালি টাইলস বিক্রয় ও প্রদর্শনীর জন্য সাজিয়ে রাখা হয়েছে। প্রবা ফটো
সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার মুরারীকাটি গ্রামে তৈরি হচ্ছে বিশ্বমানের ইতালিয়ান টালি টাইলস। এই টাইলস বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে দেশ অর্জন করছে বৈদেশিক মুদ্রা। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বক্তব্যে সাতক্ষীরার মাটির গুণ ও মাটির টাইলস নিয়ে বক্তব্য দেশব্যাপী আলোচনার জন্ম দেয়। সেই আলোচনার জোয়ার উপকূলীয় জেলায় খুব ভালোভাবেই লেগেছে। জেলাজুড়ে তাই এখন মানুষের নজর এখন কলারোয়ার মাটির টাইলসের দিকে।
মুরারীকাটি গ্রামের মৃৎশিল্পীরা তাদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় এসব টাইলস তৈরি করেন। একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে এখনও আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি এই পালপাড়ায়। আগের মতোই মাটি সংগ্রহ করে বছরের পর বছর উঁচু স্তূপ করে রাখতে হয়। তারপর সেখান থেকে মাটি কেটে কুমাররা পায়ের মাধ্যমে কাদা তৈরি করেন মণ্ড বা খামির। মাটি তৈরির পর শিল্পী তার নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় ও খাঁচে ফেলে তৈরি করেন বিভিন্ন ধরনের টাইলস। সেগুলো রোদে শুকিয়ে তারপর রঙ ধরানো হয়। রঙ লাগানোর কাজ শেষ হলে রোদে শুকিয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে আগুনে পোড়ানোর জন্য সাজানো হয় এই টাইলস।
২০০২ সালের পর কলারোয়ার পালপাড়ায় এই টাইলস তৈরি শুরু হয়। সে সময়ে ৪১টি কারখানা থাকলেও এখন টিকে আছে মাত্র ১৩টি কারখানা। সেখান থেকে উৎপাদিত টালি বছরে ১০ থেকে ১২ কোটি মতো টালি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়। দেশে আসে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার মতো বৈদেশিক মুদ্রা।
প্রতি পিস টালির দাম ৫ থেকে ৭৫ টাকা পর্যন্ত। স্কয়ার টালি সাধারণত দেয়ালের শোভা বর্ধনে ঘরের চালের ছাউনিতে ব্যবহার করে থাকেন বিদেশিরা। ঘরের মেঝে সাজানোর জন্য রয়েছে ফুলের আকারে প্রভেন সালেহ। প্রতি পিস প্রভেন সালেহর দাম ২৫ টাকা। এভাবে একেকটি টালির নকশা, গঠন ও আকার অনুযায়ী দামের হেরফের হয়। ঘর সাজানোর জন্য আছে সার্কেল টাইলস। চারটি সার্কেল টাইলস নিয়ে একটি সেট। এক সেট সার্কেল টাইলসের দাম ৪০ টাকা।
কলারোয়া টালিঘরের স্বত্বাধিকারী আবুল হোসেন বলেন, বর্তমানে আমার তিনটি কারখানা। সেখানে নারী-পুরুষ মিলিয়ে ৪৭০ জন কাজ করে। প্রায় ২৫ থেকে ৩০ প্রকারের টালি উৎপাদন হচ্ছে। বিশ্বের ১৩ থেকে ১৪টি দেশে এই টালি আমরা রপ্তানি করি। বর্তমানে এই টালি প্রধানমন্ত্রীর নজর আকর্ষণ করছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের টাইলসের খোঁজ প্রধানমন্ত্রী রাখেন তাকে ধন্যবাদ, কিন্তু সাতক্ষীরায় বিসিক বলে যে প্রতিষ্ঠান আছে তারা আমাদের কোনো খোঁজ নেয় না। আধুনিক প্রশিক্ষণ ও স্বল্প সুদে ঋণ পেলে আমরা আমাদের কারখানার শ্রমিক বৃদ্ধি করে আরও বেশি উৎপাদন করতে পারতাম।
কারখানার মালিক বাদল চন্দ্র পাল বলেন, আমরা শ্রমিক নিয়োগ করে এই টাইলস উৎপাদন করলেও আমাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না। সরকারের সুযোগ-সুবিধা থেকে আমরা বঞ্চিত। সরকারের সুদৃষ্টি ও সহজে রপ্তানি করার আহ্বান জানান তিনি।
টাইলস শ্রমিক মানিক বৈদ্য বলেন, সারা দিনে একজন ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা উপার্জন করা যায়। এতে করে আমাদের সংসার ভালোই চলছে। কারখানার ভেতরে ও সহজ কিছু কাজ থাকায় পরিবারের নারীরাও এখানে কাজ করার সুযোগ পায়।
নাগরিক নেতা ও কৃষি বিশেষজ্ঞ কামাল রেজা বলেন মাটির উপরিভাগের উর্বর অংশ দিয়ে এই মাটির টালি বা টাইলস তৈরি হয়। এভাবে চলতে থাকলে একটা সময়ে কৃষিতে তার প্রভাব পড়বে। আধুনিক প্রশিক্ষণ ও পরিকল্পিত উপায়ে এই শিল্পকে এগিয়ে নিতে পারলে কলারোয়ার মাটির টাইলস বিশ্ববাজারে আরও বড় জায়গা করে নিতে পারবে।
এই শিল্পকে এগিয়ে নিতে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির বলেন, আমাদের সার্বিক সহযোগিতা থাকবে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের প্রতি। পরামর্শ, প্রশিক্ষণ এবং স্বল্প সুদে ঋণসহ অন্যান্য সুবিধা দেওয়ার আশ্বাসের কথাও জানান এই কর্মকর্তা।
সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজলোর মুরারীকাটি, শ্রীপতিপুর, মির্জাপুরের গ্রামগুলোতে দৃষ্টিনন্দন এই মাটির টাইলস তৈরি হচ্ছে এক যুগের বেশি সময় ধরে। প্রাচীন পদ্ধতিতে তৈরি হওয়া শিল্পটি দেশে ও দেশের বাইরে সুনাম অর্জন করেছে। সরকারের সুদৃষ্টির পাশাপাশি আধুনিক প্রশিক্ষণ, যন্ত্রপাতির ব্যবহার বৃদ্ধি করা গেলে পরিবেশের ক্ষতি না করে দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে পারবে এই শিল্প, এমনটাই প্রত্যাশা বিশেষজ্ঞদের।