উদ্যোগ
ইসমাইল মাহমুদ, মৌলভীবাজার
প্রকাশ : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ০৯:৪০ এএম
আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ১৮:১৩ পিএম
মৌলভীবাজার শহরের বেরি লেকের পাশে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভের পাশে বাসাবাড়ির ময়লা-আবর্জনা ফেলা হতো। জাহাঙ্গীর আর সাইফুল সেখানে গড়ে তুলছেন বাগান। প্রবা ফটো
জাহাঙ্গীর হোসেন ভান্ডারী আর সাইফুল ভান্ডারী। দুই বন্ধু। যাকে বলে হরিহর আত্মা। ৫০ বছর বয়সি জাহাঙ্গীরের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলায় আর প্রায় সমবয়সি সাইফুলের বাড়ি কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে। দুজনই কর্মসূত্রে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন মৌলভীবাজার শহরের দরগা মহল্লা (সুলতানপুর) এলাকায়। দিনের বেলা রিকশা চালানো এবং সন্ধ্যায় ভ্রাম্যমাণ গাড়িতে বাদাম বিক্রি করা সাইফুলের পেশা। অন্যদিকে জাহাঙ্গীর রিকশা চালানোর পাশাপাশি ঝালমুড়ি ও চটপটি বিক্রি করে পরিবার-পরিজন নিয়ে কোনোরকমে দিনাতিপাত করছেন।
সাইফুল বলেন, মৌলভীবাজার আসার পর জাহাঙ্গীরের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। স্বল্প আয়ের এই দুই বন্ধুর পরিবারে আর্থিক দৈন্য থাকলেও মনে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সমাজ সংস্কারের ব্রত। দীর্ঘদিন ধরে দুই বন্ধু তাই মৌলভীবাজার শহরের বেরি লেকের পাশে মুক্তিযুদ্ধে মৌলভীবাজারের প্রথম শহীদ স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ করে আসছেন। স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের আগে ও পরে মৌলভীবাজারের প্রথম সাত শহীদের এই গণকবরটি ছিল পুরোপুরি অরক্ষিত। বাসাবাড়ির ময়লা-আবর্জনা ফেলা হতো স্মৃতিস্তম্ভের পাশে। এ ছাড়া পেছনের অংশে শৌচকর্ম করত লোকজন। দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল শাহ মোস্তফা সড়কে যাতায়াতকারী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। এই দেখে মন বিষণ্ন হয়ে ওঠে দিনমজুর জাহাঙ্গীর আর সাইফুলের। কী করা যায় ভাবতে থাকেন তারা। একপর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেন ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করে সেখানে বাগান গড়ে তুলবেন। ২০১৬ সালের নভেম্বরে দুই বন্ধু শহীদের স্মৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে ওই স্থান থেকে ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার শুরু করেন নিজেদের অর্থায়নে। তারা সেখানে গড়ে তোলেন ফুলের বাগান। বাগানে সাঁটানো হয়েছে একটি সাইনবোর্ড। তাতে লেখা রয়েছে- ‘শহীদদের সম্মানে, গণকবরের সম্মানে জাহাঙ্গীর হোসেন পাগল ভান্ডারী ও সাইফুল ভান্ডারী দুইজনের পক্ষ থেকে ঈমানের দায়িত্বে শহীদদের উপহার ফুলের বাগান। প্রবেশ নিষেধ। শাহ মোস্তফা রোড, মৌলভীবাজার সদর।’ আট বছর ধরে বাগানটি পরিচর্যা, প্রতিদিন সকাল-বিকাল গাছে পানি দেওয়ার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
স্থানীয় ব্যবসায়ী সৈয়দ লিয়াকত আলী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, রিকশাচালক জাহাঙ্গীর আর বাদামবিক্রেতা সাইফুল ময়লা সরিয়ে সেখানে গড়ে তুলেছেন আকর্ষণীয় এক ফুলের বাগান। বর্তমানে একসময়ের ময়লার ভাগাড় এখন জেলা সদরের অনিন্দ্যসুন্দর পুষ্পকানন।
সাইফুল ভান্ডারী বলেন, ‘প্রথম দিকে ১০টি গাঁদা ফুলের চারা রোপণ করলেও পরে ধীরে ধীরে বাগানটি বর্ধিত করা শুরু করি। রোপণ করি বিভিন্ন জাতের গোলাপ, জবা, গন্ধরাজসহ কয়েক জাতের ফুলের গাছ। বর্তমানে বাগানে ১৫ জাতের গোলাপ, ৪ জাতের জবা, গন্ধরাজ, কামিনী, ডালিয়া ফুলের অর্ধশতাধিক গাছ রয়েছে। কোনো কোনো চারা ১৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত খরচ করে কিনতে হয়েছে। তা ছাড়া বাগানে আছে আমড়া, বরই, শজনে, কাঁঠাল, বিলম্বি, নিম প্রভৃতি গাছ। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের স্বল্প আয়ের একটা অংশ বাঁচিয়ে ফুলের চারা, ওষুধ ক্রয়সহ অন্যান্য খরচ বহন করে চলেছি। সরকারি বা বেসরকারি সহযোগিতা এখনও আমাদের কপালে জোটেনি। যদি সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের সামান্যতম মজুরি দিয়ে সহযোগিতা করা হতো তবে পরিবার-পরিজন নিয়ে কিছুটা স্বস্তিতে জীবন যাপন করতে পারতাম। আর সহযোগিতা না পেলেও আমরা যত দিন বেঁচে থাকব তত দিন এ বাগানে চারা রোপণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করে যাব। এতেই আমাদের শান্তি।’
জাহাঙ্গীর বলেন, ‘সরকারি এ স্থান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে গিয়ে অনেক সময় আমাদের কটু কথা শুনতে হয়েছে। কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন, ভাত খাইতে পারে না, তারা আবার করবে ফুলের বাগান। মানুষের এসব কটুকথা গায়ে না মেখে প্রায় আট বছর ধরে এ স্থানটি আমরা রক্ষণাবেক্ষণ করছি।’
মৌলভীবাজার পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আনিছুজ্জামান বায়েছ বলেন, ‘দরিদ্র দিনমজুর সাইফুল ও জাহাঙ্গীর সাত শহীদের গণকবরে নিজেদের উদ্যোগে ও অর্থায়নে ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করে বাগান গড়ে তুলেছেন। এটি একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। সকাল-বিকাল এ বাগানের গাছগুলোতে পানি দেওয়া থেকে শুরু করে পরিচর্যা পর্যন্ত তারা করে যাচ্ছেন দীর্ঘদিন। তাদের ধন্যবাদ জানাই। বাগানে পানি দেওয়ার জন্য আমি পানির লাইন করে দিয়েছি। ভবিষ্যতে তাদের জন্য করণীয় কিছু থাকলে আমি ব্যক্তিগতভাবে করব।’