ঝালকাঠি সংবাদদাতা
প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০২২ ১৯:০৩ পিএম
সংগৃহীত
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের ঝালকাঠি জেলার নদী-নালা ও খাল-বিল জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বলে এখানকার প্রধান যোগাযোগ মাধ্যমই হলো জলপথ। হাট, বাজার, স্কুল সবকিছুই নদী-কেন্দ্রিক। তাই এখানে চলাচলের বাহন হিসেবে নৌকা অনেক সাশ্রয়ী ও জনপ্রিয়।
ঝালকাঠি জেলার বিভিন্ন জায়গায় বর্ষা মৌসুমে বসে নৌকায় ভাসমান বাজার। বর্ষা মৌসুমের প্রায় প্রতিদিন শত শত নৌকার সমাগম ঘটে এসব বাজারে। কোথাও সবজি, মৌসুমি ফল, আবার কোথাও বসে নৌকার বাজার। ঝালকাঠিতে কাছাকাছি তিনটি ভাসমান বাজার হল, ভিমরুলি, আটঘর এবং কুড়িয়ানা বাজার। প্রথম দুটিতে বসে মৌসুমি ফল আর সবজির বাজার এবং অপরটি নৌকার বাজার।
কাশ্মীরের ডাল লেক কিংবা থাইল্যান্ডে ভাসমান বাজার যারা দেখেছেন, তারা হয়তো অনেকটাই মিল খুঁজে পাবেন ঝালকাঠির এইসব ভাসমান বাজারের সঙ্গে। দুই-একদিনের সময় নিয়ে এসব বাজার বেড়িয়ে আসার এখনই ভালো সময়। বর্ষাকালে ভাসমান এই সব বাজারগুলো জমজমাট হয়ে উঠে। ঝালকাঠিতে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় ও বড় ভাসমান বাজারটি হল ভিমরুলির পেয়ারা বাজার। সারা বছর এই বাজার বসলেও বর্ষাকাল ও পেয়ারার মৌসুমে অনেক বেশি জমজমাট হয়ে উঠে।
ঝালকাঠিতে এবারও পেয়ারার বাম্পার ফলন হয়েছে। ভরা মৌসুমে পেয়ারা পারা ও বিক্রিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন এখানকার চাষিরা। সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং পদ্মাসেতু হওয়া দ্রুততম সময়ে মধ্যে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্রির জন্য নেওয়া যাচ্ছে পেয়ারা । ফলে ভাল দাম পেয়ে খুশী এখানকার চাষিরা।
ঝালকাঠি কৃষি বিভাগের তথ্য মতে জেলায় এবছর ৬২৯ হেক্টর জমিতে পেয়ারার চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ হাজার মেট্রিকটন।
ঝালকাঠি সদর উপজেলার কীর্ত্তিপাশা, নবগ্রাম ও গাভা রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নে ৯৫ ভাগ পেয়ারার চাষ হয়। এর মধ্যে কীর্ত্তিপাশার ভীমরুলী, খেজুরা, ডুমরিয়া, মীরাকাঠি, খোদ্দবড়হার, নবগ্রামের শতদশকাঠি, জগশীদপুর ও শাখাগাছি গ্রামের প্রায় শতভাগ পরিবার পেয়ারা চাষের সাথে সম্পৃক্ত। দুই শত বছরের বেশি সময় ধরে তারা পেয়ারা চাষ করে আসছেন ।
বাগান থেকে পেয়ারা পেরে এনে নৌকায় করে পাইকারদের কাছে বিক্রি করা হয়। পাইকাররা ট্রাক যোগে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে নিয়ে বিক্রি করেন।
ভীমরুলী খালে পেয়ারার সবচেয়ে বড় ভাসমান হাট বসেছে। শ্রাবণ মাসের প্রথম থেকে ভাদ্রমাস পর্যন্ত পেয়ারার মৌসুম। এসময় প্রতিদিনই এখানে পেয়ারা বিক্রি হয়। তবে অন্য দিনের তুলনায় শুক্রবার কেনা বেচা বেশি হয়।
বর্তমানে মন প্রতি পেয়ারা পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা। স্থানীয়রা বলছেন, এ মৌসুমে কয়েক কোটি টাকার পেয়ারা বিক্রি হবে এখান থেকে।
পেয়ারা চাষি অমিত রায় বলেন, এবছর পেয়ারার ফলন ভালো হয়েছে। ছিটপরাসহ অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হয়নি পেয়ারা। তাই দাম মোটামুটি ভালো পাওয়া যাচ্ছে। বিগত বছরের চেয়ে এবছর চাষিরা বেশি লাভবান হবেন।
পেয়ারা চাষি সুজন হালদার বলেন, ‘দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের প্রাণের দাবি পদ্মাসেতু চালু হওয়ায় এখানকার উৎপাদিত পেয়ারা দ্রুত সময়ের মধ্যে ঢাকাসহ অন্যান্য স্থানে নিয়ে যাওয়া যাচ্ছে। ক্ষেত থেকে পারে টাটকা পেয়ারা তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া যাচ্ছে। তাই এবছর দাম ভালো পাওয়া যাচ্ছে। পদ্মা সেতু উদ্বোধন হওয়ায় এ অঞ্চলের চাষিদের ভাগ্য খুলেছে তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে প্রাণঢালা অভিনন্দন জানাই।
ভীমরুলী গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি কীর্ত্তিপাশা ইউনিয়নের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ভবেন হালদার বলেন, ‘পেয়ারা এই অঞ্চলের মানুষের একটি আবেগ। প্রায় দুই শত বছরেরও বেশি সময় ধরে এই অঞ্চলের মানুষ পেয়ারা চাষ করে আসছেন। এখানের প্রায় শতভাগ পরিবার পেয়ারা চাষের সাথে সম্পৃক্ত।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঝালকাঠি এর উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, ভিটামিন সি সমৃদ্ধ এখানকার পেয়ারা খেতে সুস্বাদু ও পুস্টি মানে ভরপুর। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে এবছর কৃষকদের বিভিন্ন রকমের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
ভিমরুলি পেয়ারা বাজার খালের একটি মোহনায় বসে। তিন দিক থেকে তিনটি খাল এসে মিশেছে এইখানে। চাষীরা প্রতিদিন পেয়ারা বোঝাই শত শত নৌকা নিয়ে ভিমরুলির পেয়ারা বাজারে হাজির হয়। সেই সাথে বড় বড় ইঞ্জিন নৌকা নিয়ে বাজারে আসেন পেয়ারার পাইকারি ক্রেতারা। ছোট ছোট নৌকা থেকে পাইকাররা নৌকা ও মন হিসেবে পেয়ারা কিনে ঢাকা বা দেশের অন্যান্য শহরে বিক্রির জন্য পাঠিয়ে দেন।
এই বাজারের আকর্ষণীয় দিক হলো, বাজারের উত্তর প্রান্তে খালের উপরের থাকা ছোট একটি সেতু। এই সেতুর উপর থেকে বাজারটি খুব ভালো করে দেখা যায়। ভিমরুলির বাজারের সবচেয়ে ব্যস্ত সময় হলো দুপর ১২টা থেকে বিকেল ৩টা। এ সময়ে নৌকার সংখ্যা কয়েকশ ছাড়িয়ে যায়।
গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় এই পেয়ারা বাজার বিষয়ে লেখালেখি ও প্রচারণার কারণে অনেক বিদেশি পর্যটক বেড়াতে আসেন এই বাজারে। সেই সঙ্গে দেশি পর্যটকতো আছেই।
জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাস হলো পেয়ারার মৌসুম। পেয়ারার মৌসুম শেষ হলে আসে আমড়ার মৌসুম। এ অঞ্চলে আমড়ার চাষও হয় অনেক বেশি। আর সবশেষে আসে সুপারির মৌসুম। তাই ভাসমান এই পেয়ারা বাজারে বেড়াতে হলে এই সময়েয় মধ্যেই করা ভালো।
ঢাকার গাবতলি থেকে বিভিন্ন কোম্পানির এসি ও ননএসি বাস যায় ঝালকাঠির উদ্দেশ্যে। ঢাকার সায়দাবাদ থেকেও ঝালকাঠিতে যাওয়ার বাস পাওয়া যায়। ঝালকাঠি সদর থেকে মোটরবাইকে ভিমরুলির বাজারে যেতে সময় লাগে প্রায় আধাঘণ্টা। আর ইঞ্জিন নৌকায় গেলে সময় লাগে এক ঘণ্টা। ঝালকাঠি লঞ্চঘাট কিংবা কাঠ-পট্টি থেকে ইঞ্জিন নৌকা ভাড়া পাওয়া যায়। এছাড়াও নদীপথে সদরঘাট থেকে ঝালকাঠি যাওয়া যায়।