হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০২৪ ১২:৫০ পিএম
আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০২৪ ১৫:২৫ পিএম
গ্যাস সংকটের কারণে চট্টগ্রামে বন্ধ রাখা হয় সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলো। গত শনিবার সকালে নগরীর কদমতলী এলাকা থেকে তোলা। ছবি : নিপুল কুমার দে
সংকটের কারণে গত বৃহস্পতিবার থেকে তিন দিন কবির স্টিল রি-রোলিং মিলস (কেএসআরএম) কারখানায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ ছিল। ওই কারখানায় দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ৩ হাজার মেট্রিক টন। সেই হিসেবে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় প্রতিষ্ঠানটির দৈনিক প্রায় ৩০ কোটি টাকার পণ্য উৎপাদন কম হয়েছে (প্রতি কেজি ১০০ টাকা ধরে)। তিন দিনে পণ্য উৎপাদন কমেছে প্রায় ৯০ কোটি টাকার।
শুধু কেএসআরএম নন, একই অবস্থা ছিল চট্টগ্রামের ২৯টি রি-রোলিং মিলে। গ্যাস সংকটে বৃহস্পতিবার থেকে রবিবার পর্যন্ত সবগুলো ইস্পাত কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়। কিন্তু দেশের অন্যান্য অঞ্চলের কারখানাগুলোতে জাতীয় গ্রিড থেকে সরাসরি গ্যাস দেওয়ায় সেখানকার কারখানাগুলোকে এ ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়নি। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের কারণে ওইসব কারখানায় উৎপাদন স্বাভাবিক থাকছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম পাওয়ায় প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে চট্টগ্রামের শিল্প-কারখানাগুলো।
কারখানা মালিকরা বলছেন, এখন প্রায় সময় কারখানায় গ্যাস সংকট তৈরি হয়। যে কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গত দেড় থেকে দুই মাস চাহিদার তুলনায় অর্ধেক সরবরাহ পাচ্ছে কারখানাগুলো।
জানতে চাইলে কেএসআরএমের পরিচালক (মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস) জসিম উদ্দিন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমাদের পাওয়ার প্ল্যান্ট এলএনজি-চালিত। তাই গ্যাসের সংকট হলে পাওয়ার প্ল্যান্ট বন্ধ থাকে। আর বন্ধ থাকলে উৎপাদনও বন্ধ থাকে।’
তিনি বলেন, ‘বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ ছিল। রবিবার সকাল থেকে সরবরাহ শুরু হয়েছে, তবে চাপ অনেক কম। আজও চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ পাইনি। এখন চাহিদার ৫০ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ পাচ্ছি।’
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর চট্টগ্রাম কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সিরামিকস ছাড়া চট্টগ্রামে নিবন্ধনকৃত কারখানা আছে ৪ হাজার ৯৪৯টি। এর মধ্যে ১ হাজার ২৪টি পোশাক কারখানা, বাকি ৩ হাজার ৯২৫টি নন-আরএমজি কারখানা। আর ছোট-বড় মিলিয়ে চট্টগ্রামে ইস্পাত কারখানা রয়েছে ২৯টি। অন্যদিকে সিমেন্ট কারখানা আছে ৮টি। গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় এসব কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। ফলে প্রতিদিন কয়েক কোটি টাকার লোকসান গুনছেন কারখানা মালিকরা। এতে পিছিয়ে পড়ছে চট্টগ্রামের শিল্প খাত। দেশের অন্য অঞ্চলে নিজস্ব গ্যাসকূপ থেকে সরবরাহ দেওয়ায় সেখানে গ্যাসের সংকট খুব বেশি নেই। এলএনজি টার্মিনাল থেকে চট্টগ্রাম অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ করা হয়। তাই এলএনজি টার্মিনালে সমস্যা হলেই চট্টগ্রামে গ্যাসের সংকট দেখা দেয়। আর তাতে কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়।
গ্যাস সরবরাহে চট্টগ্রামের সঙ্গে বিমাতাসূলভ আচরণ করা হচ্ছে অভিযোগ এনে বিজিএমইএ সহসভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘একটা সময় চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা ছিল প্রধান দুর্যোগ। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে গ্যাস সংকটটাই প্রধান দুর্যোগ। এর জন্য শুধু শিল্প-কারখানা নয়, চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষেরও জীবনমানের ক্ষতি হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে চট্টগ্রামকে জাতীয় গ্রিড থেকে বের করে দেওয়া কোনোভাবে সমীচীন হয়নি। এটি চট্টগ্রামবাসীর প্রতি বিমাতাসূলভ আচরণ বলে মনে করি। চট্টগ্রামের কারখানাগুলো যাতে চালু রাখা যায়, সেজন্য জাতীয় গ্রিড থেকে রেশনিংয়ের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ করা হয়।’
কেজিডিসিএল সূত্রে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটির ১ হাজার ২০০-এর বেশি শিল্পগ্রাহক রয়েছে। এর মধ্যে বিএসআরএম, জিপিএইচ ইস্পাতসহ বড় বড় কারখানা আছে ১৫ থেকে ২০ট। এর বাইরে সিইউএফএল, কাফকো, ডিএপি সার কারখানা ও রাউজান ও শিকলবাহায় দুটি করে চারটি পাওয়ার প্ল্যান্ট আছে। সরকারি এই সাতটি প্রতিষ্ঠানসহ সবগুলো শিল্প-কারখনা ও আবাসিক গ্রাহককের গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট। সরকারি সাতটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া বেসরকারি শিল্প-কারখানা ও আবাসিক গ্রাহকদের চাহিদা প্রতিদিন প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। মহেশখালীতে স্থাপন করা দুটি এলএনজি টার্মিনাল থেকেই গ্রাহকদের এই গ্যাস সরবরাহ করা হয়।
কিন্তু সম্প্রতি একটি এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় শিল্প-কারখানা ও আবাসিকÑ দুই পর্যায়েই কমেছে গ্যাস সরবরাহ। এখন একটি এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্রাহকদের গ্যাস সরবরাহ করে আসছিল প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার সেই টার্মিনালটিতে ত্রুটি ধরা পড়ায় এলএনজি টার্মিনাল থেকে একেবারে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এতে ব্যাপক সংকট তৈরি হয়েছে চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে। আবাসিক এবং সিএনজি স্টেশনেও বন্ধ হয়ে যায় গ্যাস সরবরাহ। তাতে চরম বিপাকে পড়েন কারখানা মালিকরা। গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় অনেক কারখানা বন্ধ রাখতে হয়। রবিবার থেকে সরবরাহ শুরু হলেও এখন চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন কারখানা মালিকরা।
পোশাক কারখানা মালিকরা বলছেন, তিন দিন সরবরাহ বন্ধ থাকলেও কারখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে মাত্র এক দিন। শুক্রবার পোশাক কারখানা বন্ধ থাকায় ওইদিন কোনো ঝামেলায় পড়তে হয়নি। শুধু শনিবারই কারখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। রবিবার থেকে সরবরাহ শুরু হওয়ায় এখন উৎপাদন স্বাভাবিক রয়েছে। ৫০ শতাংশের মতো সরবরাহ পাচ্ছে কারখানাগুলো।
গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটানোর বিষয়ে জানতে চাইলে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. আবু সাকলায়েন বলেন, গ্যাস সরবরাহ তো এখন স্বাভাবিক রয়েছে। রবিবার থেকে আমরা সরবরাহ দিচ্ছি। চাপ ধীরে ধীরে বাড়ছে।
চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন করতে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বিষয়। এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে পারব না। কবে নাগাদ আরেকটি এলএনজি টার্মিনাল চালু হতে পারে জানতে চাইলে এ বিষয়ে তিনি কিছু বলতে রাজি হননি।