নওগাঁ প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০২৪ ২২:৪০ পিএম
ধান-চালের অবৈধ মজুদ বিরোধী অভিযান চালাচ্ছেন প্রশাসন। প্রবা ফটো
খাদ্য ভান্ডার হিসেবে পরিচিত উত্তরের জেলা নওগাঁয় অবৈধ মজুদ বিরোধী অভিযানে কমতে শুরু করছে ধান-চালের মূল্য। গত তিনদিন ধরে জেলায় অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর পর ধান-চালের মূল্য নিম্নমুখী হতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর হঠাৎ করে জেলার হাট-বাজার মোকামগুলোতে ধান চালের দাম বৃদ্ধি হতে শুরু করে। এ নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে ধান চালের মূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখতে নির্দেশনা পাবার পর স্থানীয় প্রশাসনও পদক্ষেপ নেওয়ার শুরু করে।
গত মঙ্গলবার থেকে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় অবৈধভাবে ধান-চাল মজুতদারদের সন্ধানে মাঠে নামে প্রশাসন। মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার (১৮ জানুয়ারি) সন্ধ্যা পর্যন্ত রাইস মিলের গুদাম, ধান-চালের ব্যবসায়ীদের মোকামসহ অন্তত ১৫টি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালায় ভ্রাম্যমাণ আদালত। এসময় ঐসব প্রতিষ্ঠানে অবৈধভাবে ধানচাল মজুদ রাখার দায়ে ১৫ জন ব্যবসায়ীকে ৬ লাখ ৮৫ হাজার টাকা জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে অবৈধ মজুমদারদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করার কারণে নওগাঁর বাজারে প্রতি মণ ধানের দাম কমেছে ৬০ থেকে ২০০ টাকা। আর পাইকারি বাজারে চালের দাম কেজিতে কমেছে ২ থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত কমেছে। তবে খুচরা বাজারে এখনও আগের দামেই চাল বিক্রি হচ্ছে।
কৃষিপণ্য বিপণন আইন-২০১৮ (সংশোধিত) অনুযায়ী, অটোমেটিক, হাসকিং ও মেজর চালকলের মালিকেরা তাঁদের পাক্ষিক (১৫ দিন) ছাঁটাই ক্ষমতার ৩ গুন ধান ও ২ গুন চাল ৩০ দিনের জন্য মজুত করতে পারবেন। পাইকারি ও খুচরা ধান-চাল বিক্রেতারা লাইসেন্স ক্যাপাসিটি অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৩০০ টন থেকে সর্বনিম্ন ১৫ টন পর্যন্ত ধান ও চাল ৩০ দিনের মজুত রাখতে পারবেন।
নওগাঁর অন্যতম বড় ধানের মোকাম রানীনগর উপজেলার আবাদপুকুর হাট। ওই হাটে সপ্তাহে ৩ দিন ধান কেনাবেচা হয়ে থাকে। আজ শুক্রবার বাজারের আড়তদার ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাটে প্রতি মণ মোটা জাতের স্বর্ণা-৫ ও স্বর্ণা-৫১ (হাইব্রিড স্বর্ণা) ধান মান ভেদে ১২০০ থেকে ১২১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তিন দিন আগেও এসব ধান বিক্রি হয়েছে ১২৬০ থেকে ১২৭০ টাকা মণ দরে। বোরো মৌসুমের সরু জাতের জিরা ও কাটারি ধান বিক্রি হচ্ছে ১৩২০ থেকে ১৩৩০ টাকায়। তিন দিন আগে প্রতি মণ জিরা ও কাটারি ধানের দাম ছিল ১৪৫০ থেকে ১৪৬০ টাকা।
ওই হাটের আড়তদার লোকমান আলী বলেন, ‘বর্তমানে হাট-বাজারে ধানের দাম নিম্নমুখী। মোটা জাতের প্রতি মণ ধানের দাম গত তিন-চার দিনের ব্যবধানে ৬০ থেকে ৭০ টাকা কমে গেছে। দাম কমার প্রধান কারণ হল, মিলাররা ধান কিনছে না। আগে যেখানে প্রতি দিন একটা আড়ত থেকে পাঁচ থেকে ছয় ট্রাক ধান কিনত, এখন মিলাররা দিনে এক ট্রাক ধানও কিনছে না। মিলারদের চাহিদা না থাকায় আমরাও ধান কিনছি না। কারণ, বেশি ধান কিনে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি মজুত হয়ে গেলে জরিমানা দিতে হতে পারে। এই ভয়ে ধান কেনা কমিয়ে দিয়েছি।’
জেলা সবচেয়ে বেশি সরু জাতের সুগন্ধী ধান চাষ হয় মহাদেবপুর উপজেলা। মহাদেবপুর উপজেলার মাতাজীহাটে। ওই হাটের আড়তদার ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তিন দিনের ব্যবধানে চিনিগুড়া জাতের সুগন্ধী ধানের দাম প্রতি মণে কমেছে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত। প্রতিমণ চিনিগুড়া ধানের আজকের বাজারদর ২৩০০ থেকে ২৩৫০ টাকা। তিন দিন আগে দাম ছিল ২৫০০ টাকা।
ওই বাজারের আড়তদার নজরুল ইসলাম বলেন, ‘মিলাররা প্রশাসনের অভিযানের ভয়ে মিলে ধান নিচ্ছে না। এই পরিস্তিতিতে আমরাও ধান কেনা কমিয়ে দিয়েছি।’
হাটে ধান বিক্রি করতে আসা নওগাঁ সদর উপজেলার হাপানিয়া গ্রামের কৃষক রহিম উদ্দিন মুন্সী বলেন, গত সোমবার এই হাটে প্রতি মণ চিনিগুড়া ধান বিক্রি করে গেছি ২৫০০ টাকায়। আজকে সেই ধান বিক্রি করতে হল ২৩০০ টাকায়। ৪ দিনের মধ্যে ২০০ টাকা নাই হয়ে গেছে। এভাবে ধানের দাম উঠা-নামা করলে ক্যামনে চলবে।’
এদিকে নওগাঁর সবচেয়ে বড় চালের মোকাম নওগাঁর আলুপট্টি মোকাম ও মহাদেবপুর উপজেলা সদরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) মোটা ও সরু জাতের চালের দাম ৫০ থেকে ৬০ পর্যন্ত কমেছে। আর আতপ চালের দাম বস্তায় কমেছে ১০০ টাকা পর্যন্ত।
নওগাঁর আলুপট্টি চাল মোকামের ব্যবসায়ী আবুল কালাম বলেন, ‘মজুতবিরোধী অভিযান শুরুর পর থেকে মোকামে চাল কেনা-বেচা প্রায় নেই বলে চলে। আগে যেখানে একেকটা আড়ত থেকে প্রতিদিন ৫ থেকে ৬ ট্রাক চাল বিক্রি হত। এখন সেখানে এক ট্রাকও বিক্রি হচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে অনেক ব্যবসায়ী কম দামে চাল বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। কারণ গুদামে চালের মজুত পেলে যে কোনো মূহূর্তে জরিমানা গুনতে হতে পারে।’
নওগাঁ জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, ‘স্থানীয় মিল মালিক ছাড়াও কর্পোরেট ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোও গত কয়েক বছর ধরে প্রত্যন্ত এলকার হাট-বাজার থেকে ধান কিনছে। এছাড়া কিছু মানুষ আছে যারা ধান কিনে মজুত করে রাখে। তারাও স্থানীয় বাজার থেকে ধান কিনছে। বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় যত দিন যাচ্ছে ধান-চালের দাম ততই উর্ধ্বমুখী হচ্ছে। এর সুফল আছে, তেমনি কুফলও আছে। ধান-চালের দাম বেশি হওয়ায় কৃষকেরা লাভবান হচ্ছেন। অন্যদিকে যাদেরকে চাল কিনে খেতে হচ্ছে তাদেরকে ভোগান্তি হচ্ছে। এই অবস্থায় আমার পরামর্শ সরকারের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। কৃষক ও ভোক্তা উভয়ই যেন স্বস্তিতে থাকতে পারে সেদিকে নজর রাখতে হবে সরকারকে।’
এ ব্যাপারে নওগাঁ জেলা প্রশাসক মো. গোলাম মওলা বলেন, ধান-চালের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে মঙ্গলবার থেকে জেলার বিভিন্ন ধান-চালের প্রতিষ্ঠানে মজুতবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অভিযান থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ৬ লাখ ৮৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অবৈধভাবে মজুত করা ধান-চাল সঠিকভাবে খোলাবাজারে বিক্রি নিশ্চিত করতে সহকারী কমিশনার (ভূমি), কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা, উপজেলা খাদ্যনিয়ন্ত্রক এবং একজন উপপরিদর্শকের (এসআই) সমন্বয়ে টিম গঠন করে দেওয়া হয়েছে। তারা বিষয়টি তদারক করবেন। এছাড়া ধান চালের মূল্য সহনীয় পর্যায়ে না আসা পর্যন্ত এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।