আবু রায়হান তানিন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০২৪ ০৮:৩২ এএম
আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২৪ ১০:৪৫ এএম
গ্যাসের চাপ না থাকায় জ্বলছে না চুলা। বাধ্য হয়ে তার ওপর লাকড়ির চুলা বসিয়ে রান্না করছেন এক গৃহিণী। বৃহস্পতিবার আগ্রাবাদের রঙ্গীপাড়ায়। প্রবা ফটো
চট্টগ্রামে গ্যাস সংকটে তীব্র ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরবাসী। প্রায় দুই মাস ধরে চলছে এই একটানা সংকট। বেশিরভাগ এলাকাতেই ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গ্যাস থাকছে না। ফলে নাগরিকরা সময়মতো রান্না করতে পারছেন না। এতে একদিকে শিশুসহ পরিবারের সদস্যদের খাদ্যগ্রহণ চক্র ভেঙে পড়েছে এবং শরীরের ওপরও এর প্রভাব পড়ছে। অনেকে বেশি দামে রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার কিনে খাচ্ছেন। এতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। গ্যাস সংকটের কারণে নিম্ন আয়ের মানুষজন রান্না করতে না পারায় না-খেয়ে দিন-রাত কাটাচ্ছেন।
চরম দুর্ভোগের বর্ণনা দিয়ে চট্টগ্রামের হালিশহর এলাকার জান্নাতুল নাঈমা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সারা দিন গ্যাস থাকে না। রাত ১২টার পরে গ্যাস আসে। তখন রান্না করতে হয়। রাতের খাবার খেতে খেতে বেশিরভাগ দিন রাত দুইটা পেরিয়ে যায়। এরপর ভোরেই আবার গ্যাস চলে যায়।’ দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে এই গ্যাস সংকট চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এর ফলে স্বাভাবিক জীবনযাপন প্রায় দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। এক বেলায় রান্না করা খাবার দিয়ে দিনের বিভিন্ন সময় খেতে হচ্ছে। তাও আবার গরম করে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
টিনের বক্সে লাকড়ির চুলা
শুধু হালিশহর নয় চট্টগ্রামের হেমসেন লেন, চকবাজার, পাহাড়তলী, শুলকবহর, আগ্রাবাদসহ বিভিন্ন এলাকায় দুই মাস ধরে এমন সংকটে পড়েছেন মহানগরবাসী। এতে বিশেষ করে ভোগান্তিতে পড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষজন। অনেকে দোকান থেকে কিনে আনা খাবার অথবা সিলিন্ডারের গ্যাস ব্যবহারের মাধ্যমে এই সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও নিম্ন আয়ের মানুষদের সেই সুযোগ নেই। অনেকেই আবার টিনের বক্সে লাকড়ির চুলা বানিয়ে রান্নাবান্না করে চালিয়ে নিচ্ছেন।
হালিশহর এলাকার শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘দ্রব্যমূল্যের কারণে এমনিতেই স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন। এর মধ্যে গ্যাস সংকটে পড়ে বাইরে থেকে খাবার কিনে খাওয়ার তেমন কোনো বিকল্প ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। তাই বেশিরভাগ সময়ই আধপেটা থাকতে হচ্ছে। খেয়ে না-খেয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে।’
ফিলিং স্টেশনগুলোতে গাড়ির দীর্ঘ সারি
গ্যাসের চাপ কম থাকায় সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও দেখা যাচ্ছে গাড়ির দীর্ঘ সারি। কয়েক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে গ্যাস নিতে হচ্ছে চালকদের। আরাকান রোড এলাকার সাউদার্ন গ্যাস ফিলিং স্টেশনে গ্যাস সরবরাহ কম বলে জানিয়ে সাউদার্ন গ্রুপের জেনারেল ম্যানেজার খল্লিলুর রহমান বলেন, ‘চাহিদা মোতাবেক গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে রাত ৯টার পর থেকে প্রায় সময় বন্ধ থাকে গ্যাস বিক্রি।’
দফায় দফায় মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদান
পরিস্থিতি এতই অসহনীয় হয়ে উঠেছে যে, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবিতে এর মধ্যে দফায় দফায় মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচি পালন করেছে মহানগরবাসী। গত ৯ জানুয়ারি চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কমিশন চট্টগ্রাম কমিটির উদ্যোগে গ্যাস সংকট নিরসনের দাবিতে মানববন্ধন হয়। এর পরদিন একই দাবিতে চট্টগ্রাম কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটডের (কেসিডিসিএল) সামনে মানববন্ধনের আয়োজন করে চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম। এ সময় গ্যাস সংকট নিরসনের দাবিতে স্মারকলিপিও দেয় এ ফোরাম।
সংকটের পেছনে টার্মিনাল রক্ষণাবেক্ষণের কাজ
কেজিডিসিএল সূত্র জানাচ্ছে, দৈনিক ৩১২ মিলিয়ন থেকে ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস চাহিদা থাকলেও সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র ২৫২ থেকে ২৭০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। চট্টগ্রামের দুটি সার কারখানায় দেওয়া হচ্ছে ৯০ থেকে ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট, বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৪০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং সিএনজি ফিলিং স্টেশনে ১৯ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। বাকি গ্যাস দেওয়া হচ্ছে আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্রাহককে।
শুরু থেকেই কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি জানিয়ে আসছে যে, মহেশখালী এলএমজি টার্মিনালের রক্ষণাবেক্ষণ কাজের কারণে এমন সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। শপথ গ্রহণের পর জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ আশ্বাস দিয়েছিলেন, ১০ জানুয়ারির মধ্যে বন্দরনগরীর গ্যাস সংকট পরিস্থিতির উন্নতি হবে। যদিও সে-রকম আর হয়নি।
কেজিডিসিএলের মহাব্যবস্থাপক (বণ্টন) প্রকৌশলী গৌতম চন্দ্র কুন্ডু প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘গত ১ নভেম্বর থেকে মহেশখালীর দুটি এলএনজি টার্মিনালের একটি থেকে রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চলছে। এই কারণে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় সংকট দেখা দিয়েছে।’ কবে নাগাদ মেরামত কাজ শেষ হবে? Ñ এমন প্রশ্নের জবাবে কেজিডিসিএলের মহাব্যবস্থাপক (ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসেস ডিভিশন) প্রকৌশলী মো. শফিউল আজম খান বলেন, ‘কাজ শেষ পর্যায়ে। বৃহস্পতিবার (আজ) সন্ধ্যা থেকে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা আছে।’