ইউসুফ আলী, মানিকগঞ্জ
প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০২৪ ১১:১৯ এএম
আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০২৪ ১৫:৩০ পিএম
দেশের উত্তরাঞ্চলসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আসা শ্রমিকরা কাজের অপেক্ষায়। সম্প্রতি মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড এলাকার নবীন হলের সামনে। প্রবা ফটো
কাজের সন্ধানে দেশের উত্তরাঞ্চলসহ বিভিন্ন জেলা থেকে শ্রমিকরা মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে শ্রমিকের হাট বা মানুষের হাটে আসেন। প্রায় প্রতিদিনই বাসস্ট্যান্ডে নবীন হলের সামনে অন্তত শতাধিক শ্রমিক অপেক্ষায় থাকেন। গত কয়েক দিনে প্রচণ্ড শীতে কোনো কাজ না পাওয়ায় এসব শ্রমিক কর্মহীন হয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের অবস্থা এখন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’-এর মতো হয়েছে।
একদিকে তাদের কাজ না থাকায় তিনবেলা খাওয়ারও টাকা নেই। আবার থাকার জায়গা নেই, নেই শৌচাগারেরও ব্যবস্থা। এমনকি নিরাপদ খাওয়ার পানিরও সংকট। না আছে পর্যাপ্ত গরম কাপড়। কেউ কেউ সারা দিন কিছুই না খেয়ে কাটিয়ে দিচ্ছেন। স্থানীয় বাসটার্মিনালে, ওভার ব্রিজের ওপর (স্টিলের ব্রিজ), নূরুল হোসেন ল কলেজের বারান্দাসহ বিভিন্ন স্থানে খোলা জায়গায় রাত কাটাচ্ছেন। বর্তমানে বাসস্ট্যান্ড এলাকার এই হাটে তিন শতাধিক শ্রমিক কর্মহীন হয়ে অবস্থান করছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহী, রংপুর, গাইবান্ধা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, বগুড়া, নাটোর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পাবনা, সিরাজগঞ্জসহ অনেক জেলার মানুষজন কৃষিশ্রমিক, রাজমিস্ত্রির জোগালদার, রাস্তা নির্মাণসহ নানান কাজ করার জন্য এই হাটে আসেন। হাট থেকে দরদাম করে মালিক, ঠিকাদার বা গৃহস্থরা তাদের নিয়ে যান। বছরের অন্য সময় একদিন অপেক্ষা করলেই তারা চাহিদামতো শ্রমিকের দরদাম মিটিয়ে কাজে লাগায়। কিন্তু গত এক সপ্তাহে এখানকার পরিস্থিতি ভিন্ন। এ ধরনের অভিজ্ঞতাও আগত শ্রমিকদের নতুন বলে জানান।
শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের অনেকেই এসেছেন ২০-২৫ দিন পূর্বে। তখন তেমন একটা শীতও ছিল না। তাই সামান্য শীতবস্ত্র নিয়ে এসেছেন। আবার যারা ৭-৮ দিন পূর্বে এসেছেন তাদের নিকটও তেমন শীত বস্ত্র নেই। মূলত যারা এদের কাজে নিয়োগ করেন তারাই থাকা, খাওয়া ও অনেক সময় প্রয়োজনমতো শীতবস্ত্রও দিয়ে থাকেন। মূলত মানিকগঞ্জ জেলায় ধান লাগানো শুরু হয়নি, সরিষাও পাকা শুরু হয়নি, শীতের কারণে অন্যান্য কাজও বন্ধ থাকায় তারা কাজ পাচ্ছেন না। অনেকেরই ফিরে যাওয়ার মতো অবস্থা নেই। কারণ টাকা-পয়সারও সংকট রয়েছে। যা এনেছেন তাও বসে বসে খরচ করে ফেলেছেন। এখন প্রচণ্ড শীতে, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানহীন অবস্থায় অমানবিক জীবন কাটাচ্ছেন। অনেকেই শীতে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন।
অনেকের সঙ্গে আসছেন নাটোরের সিংড়া উপজেলার গুটিয়া মহিষমারি গ্রামের ষাটোর্ধ্ব জসিম মিয়াও। তিনি বলেন, ‘ছেলেরা ভাত (দেখাশোনা করে না) দেয় না। এলাকায় কোনো কাজ নেই। পেটের তাড়নায় কাজের জন্য ১৫ দিন আগে এসেছি। প্রথম পাঁচ দিন কাজ করেছি। তারপর ঠাণ্ডা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গৃহস্থ বলেছে এখন আর কাজ করাবে না। গত ১০ দিনে একবেলা করে খাচ্ছি। এখন আমার কাছে আর কোনো টাকা নেই।’
একই উপজেলার মানিকদীঘি গ্রামের মো. আকাশ বলেন, ‘১৮ দিন আগে এসে মাত্র দুদিন কাজ করেছি। ১৬ দিন যাবৎ বসে আছি। পেটে খাবার নেই। একবেলা খাবার খেয়ে কোনোরকম দিন পার করছি। কারও কাছে হাতও পাততে পারছি না। আর টাকার অভাবে গ্রামেও ফিরে যেতে পারছি না।’
একই কথা জানালেন পাবনার আ.মালেকও। তিনি জানান, আট দিন আগে এসে তিন দিন কাজ করেছেন। যা উপার্জন করেছেন তা তিন দিনে খেয়েই শেষ। এখন কোনোরকম একবেলা খেয়েই দিন কাটছে তার।
নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার রিয়াঘাটের মো. হোসাইন বলেন, ‘পেটের ক্ষুধায় কাছে থাকা শেষ সম্বল মোবাইলটাও মাত্র ২০০ টাকায় বিক্রি করে দিয়েছি। এ দিয়ে হয়তো দুদিন কোনোরকম চলবে।’ তারপর কী করবেন ভেবে কেঁদে দেন। শুধু নিজে কষ্ট করছেন, তাই নয়; বাড়িতে টাকা পাঠাতে না পারায় পরিবারের সবাইকে কষ্ট করতে হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম মহীউদ্দীনের উদ্যোগে গত কয়েক দিন ধরে ভাসমান এসব শ্রমিকের মধ্যে একবেলা রান্না করা খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘যতদিন তারা (শ্রমিক) কর্মহীন থাকবে, ততদিনই খাবার বিতরণ করা হবে। তাদের আবাসনের জন্যও চেষ্টা করছি।’
গোলাম মহীউদ্দীনকে মানবিক এ বিষয়টি সম্পর্কে অবগত করেন জেলার গণমাধ্যমকর্মীরা। বিষয়টি জানানোর জন্য তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিলাম না, জানতে পেরে কিছু একটা করার চেষ্টা করেছি।’ স্থানীয় ফিফ রেস্টুরেন্ট থেকে বিনা পারিশ্রমিকে এসব খাবার রান্না করে দেওয়া হচ্ছে, আর ঢাকার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ফজলুল করীম সহযোগিতা করছেন জানিয়ে তাদেরও ধন্যবাদ জানান জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান।
জেলা প্রশাসক রেহেনা আকতারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ছিন্নমূল মানুষের মধ্যে শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়েছে। তখন কেউ অনাহারে থাকার কথা বলেনি। খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’