রেজাউল করিম, গাজীপুর
প্রকাশ : ১৫ জানুয়ারি ২০২৪ ২১:৩৫ পিএম
আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০২৪ ২১:৪৫ পিএম
গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের বিনিরাইল গ্রামের ঐতিহ্যবাহী জামাই মেলা। মেলাটি প্রতিবছর পৌষসংক্রান্তিতে অর্থাৎ পৌষ মাসের শেষ দিনে অনুষ্ঠিত হয়। এটি একসময় পৌষালি মেলা ছিল, যা হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা আয়োজন করত। পরে এই মাছের মেলাটি জামাই মেলায় রূপান্তরিত হয়। এখন সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে এটি।
স্থানীয়দের দাবি মেলার বয়স প্রায় ২৫০ বছর। পৌষসংক্রান্তি উপলক্ষে ১৯১০ সাল থেকে মেলাটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আবার অনেকের মতে, ১৮ শতকে মেলাটির প্রচলন হয়। মূলত মৎস্য মেলা হিসেবে শুরু হলেও পরে এটি জামাই মেলা নামে পরিচিতি পায়।
প্রতিবছর মেলা উপলক্ষে এই অঞ্চলের বাসিন্দারা মেয়ের জামাইকে বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে। তারা এই মেলা থেকে বড় মাছ কেনে। মেলায় নানা প্রজাতির প্রচুর বড় বড় মাছ ওঠে। মাছ ছাড়াও বিভিন্ন মিষ্টান্নজাতীয় খাবার, আসবাবপত্র, খেলনা ইত্যাদির দোকান থাকে। কেনাকাটার পাশাপাশি গ্রামীণ ঐতিহ্য অনুসারে বিনোদনের জন্য পুতুল নাচ, নাগরদোলা, লাঠি খেলা ইত্যাদির আয়োজন করা হয়। তবে ঐতিহ্যের কারণে বিনিরাইলের মাছের মেলায় কেনার চেয়ে দেখতে আসা মানুষের ভিড় বেশি থাকে। প্রায় আড়াইশ বছরের পুরোনো এই মেলা প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়। স্থানীয় জামাই ও শ্বশুরদের মধ্যে চলে বড় মাছ কেনার প্রতিযোগিতা।
সোমবার (১৫ জানুয়ারি) সরেজমিনে দেখা যায়, বিনিরাইল গ্রামের প্রায় ২০-২৫ বিঘা ফসলের জমিতে মেলাটি বসেছে। নানা জাতের মাছের পসরা সাজিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। বড় বড় সামুদ্রিক পাখি মাছ, শাপলা পাতা মাছ, কুড়াল মাছ। এ ছাড়াও রয়েছে রুই, কাতলা, বোয়াল, আইড়, বাঘাইড়, চিতল, কালিবাউশ, রিটাসহ নানা ধরনের দেশি মাছ। বিক্রেতারা নানা অঙ্গভঙ্গি করে সুর ধরে ডেকে ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। কেউ কেউ বড় আকৃতির মাছ ওপরে তুলে ধরে ক্রেতা ডাকছেন। শুধু মাছ নয়, এ মেলাকে কেন্দ্র করে বস্ত্র, চারু-কারু, প্রসাধনী, ফার্নিচার, খেলনা, মিষ্টি ও কুটিরশিল্পেরও নানা পণ্যের দোকান রয়েছে।
মেলায় একটি পাখি মাছের দাম উঠেছে লাখ টাকা। ৭৩ কেজি ওজনের পাখি মাছটি মেলার আলাদা আর্কষণ। এ ছাড়াও এক মণ ওজনের কাতল, বোয়াল, বড় বড় চিতল, বড় চিংড়ি, শাপলা মাছ ক্রেতারা দরদাম করে কিনে নিচ্ছে। কেউ কেউ ছবি তুলছে মাছের। জামাইরা মাছ কেনার পর ক্রেতা-বিক্রেতা একসঙ্গে হাঁক দিয়ে উঠছেন।
মাছ বিক্রেতা শ্যামল বলেন, ‘২০ পদের বড় বড় মাছ নিয়ে এসেছি। এগুলো সব নদীর মাছ। ২৫ বছর ধরে এই মেলায় মাছ নিয়ে আসি। এটি আমাদেরও নেশায় পরিণত হয়েছে। ভৈরব, সিরাজগঞ্জ, নরসিংদী, ময়মনসিংহ, ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার মাছ ব্যবসায়ী আসেন মেলায়। দাম কমবেশি যাইহোক সব মাছই বিক্রি হয়ে যায়।’
জয়দেবপুর এলাকার জামাই আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘৩১ কেজি ওজনের একটি কাতল মাছ কিনেছি। দাম পড়েছে ৩৫ হাজার টাকা। মাছটি তরতাজা ও দেখতেও অনেক সুন্দর। প্রথম দেখাতেই পছন্দ হয়েছে। পরে দরদাম করে কিনলাম। প্রতিবছরই আসি মেলায় একটি বড় মাছ কিনতে।’
মেলার আয়োজক কমিটি ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিবছরই এক দিনের জামাই মেলা অনুষ্ঠিত হয়। মেলায় কয়েক কোটি টাকার মাছ বিক্রি হয়। এজন্য ২০-২৫ বিঘা জমি পতিত রাখা হয়।
কমিটির সভাপতি কিশোর আকন্দ বলেন, ‘আড়াইশ বছরের পুরোনো মেলাটি এই অঞ্চলের সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। মেলায় বিভিন্ন প্রকার বড় সাইজের মাছ কিনতে হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটে। মাছ ছাড়াও ফার্নিচার, মিষ্টান্নসহ বিভিন্ন দোকান থাকে। তবে মাছের জন্যই বেশি পরিচিত। আয়োজন থাকে বিভিন্ন লোকজ অনুষ্ঠানেরও।’