প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৪ জানুয়ারি ২০২৪ ১৬:৪১ পিএম
আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২৪ ২৩:০৫ পিএম
শীতের তীব্রতা থেকে বাঁচতে আগুন জ্বালিয়ে শরীর গরম করছেন স্থানীয়রা। প্রবা ফটো
বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী সোমবার (১৫ জানুয়ারি) মাঘ মাসের ১ তারিখ। পৌষের মধ্যভাগ থেকে দেশজুড়ে হিমেল হাওয়া, কুয়াশা আর শীতের তীব্রতা বেড়েছে। প্রচণ্ড ঠান্ডায় বিপর্যস্ত জনজীবনে নতুন করে যোগ হয়েছে শীতজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব। শুক্রবার (১৪ জানুয়ারি) থেকে দেশের কোথাও কোথাও শৈত্যপ্রবাহ চলছে। কুয়াশা বেশি পড়ায় শীত কমছে না। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, বৃষ্টি না হলে কুয়াশা কমবে না। আর কুয়াশা না কমলে শীতের তীব্রতাও কমবে না।
বৃষ্টি না হলে কুয়াশা কাটার (কমার) সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশিদ। তিনি বলেন, দেশের কোথাও তাপমাত্রা কমেছে আবার কোথাও বেড়েছে। বৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত কুয়াশা আর শীত কমবে না।
প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, তাপমাত্রা কমে গেলে মানবদেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমে যায়। এতে শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, বক্ষব্যাধির মতো রোগ হয়। খোস-পাঁচড়া ও চর্মরোগ বেড়ে যায়। শিশু ও প্রবীণদের মধ্যে রোগ বেড়ে যায়। শীতের এই তীব্রতা থাকা অবস্থায় বাইরে কাজ করতে গেলে মাথা ও কান ঢেকে রাখতে হবে। যতটা সম্ভব একটানা পানিতে অবস্থান না করে কিছুক্ষণ পরপর শরীর গরম করে কাজে নামতে হবে।
দিন ও রাতের তাপমাত্রা কমে গেলে কৃষি খাতে কী ধরনের প্রভাব পড়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা পরিচালক ড. মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান বলেন, শীতের তীব্রতা বেশি থাকলে ধানের চারার বৃদ্ধি ঘটে না। চারা মরে যায়। অন্যান্য শাকসবজিরও ক্ষতি হয়। বিশেষ করে বেশি কুয়াশা পড়লে আলুগাছ পুড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়। এতে ফলন কমে যায়।
রবিবার দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে দিনাজপুর জেলায় ৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ ছাড়া পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ৮ দশমিক ৮ ডিগ্রি, ঠাকুরগাঁওয়ে ৯ ডিগ্রি, নীলফামারীর ডিমলায় ১০ দশমিক ২ ডিগ্রি, সৈয়দপুরে ১০ দশমিক ২ ডিগ্রি, রংপুরে ১০ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের (বিএমডি) রবিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, রাজশাহী, দিনাজপুর, পঞ্চগড় ও চুয়াডাঙ্গা জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া শৈত্যপ্রবাহ কোথাও কোথাও কমতে পারে। সারা দেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে। তবে দেশের অনেক জায়গায় দিনে ঠান্ডা পরিস্থিতি বিরাজ করবে। আজ মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত সারা দেশে মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে।
দিনাজপুরে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা
রবিবার দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। হাড় কাঁপানো কনকনে শীত আর হিমেল হাওয়ায় জবুথবু অবস্থা উত্তরের এ জেলার জনজীবনে। শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষের দুর্দশা চরমে। প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছে না কেউ। কৃষি উৎপাদন ব্যাঘাত ঘটছে। বোরো ধানের বীজতলাও ক্ষতির সম্মুখীন বলে জানান কৃষিবিদরা। এদিকে শীতজনিত রোগের প্রকোপও বেড়েছে। দিনাজপুর এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেনারেল হাসপাতাল, অরবিন্দু শিশু হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে শীতজনিত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।
রংপুরে হাসপাতালে বাড়ছে রোগী
ঘন কুয়াশা আর হিমেল হাওয়ায় ছন্দ হারিয়েছে রংপুরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। শীতজনিত বিভিন্ন রোগে হাসপাতালগুলোয় বাড়ছে রোগী। শীতে আগুন পোহাতে গিয়ে অগ্নিদগ্ধ হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মোট ১ হাজার ৭৫৭ রোগী ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে মেডিসিন বিভাগে চিকিৎসাধীন ৩৮৯ জন, শিশু বিভাগে ৯০ ও বার্ন ইউনিটে ৪৬ জন। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আ. ম. আখতারুজ্জামান বলেন, বার্ন ইউনিটে বর্তমানে ৩০ জন রোগী চিকিৎসাধীন। এর মধ্যে বেশিরভাগ রোগী নারী ও শিশু। আগুন পোহাতে গিয়ে দগ্ধ হওয়া এক বৃদ্ধা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। এদিকে হাড় কাঁপানো শীতে রংপুর চিড়িয়াখানার পশু-পাখিদের নিয়ে বেকায়দায় পড়েছে কর্তৃপক্ষ। তীব্র ঠান্ডায় রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এসব প্রাণীকে নিয়মিত ভিটামিন খাওয়ানো হচ্ছে। রংপুর আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ মোস্তাফিজার রহমান জানান, মঙ্গলবার কিছু সময়ের জন্য সূর্য উঠলে তাপমাত্রা কিছুটা বাড়তে পারে।
ঠাকুরগাঁওয়ে বেড়েছে শীতের তীব্রতা
উত্তরের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে শীতের প্রকোপ বেড়েছে। রবিবার জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শীতের তীব্রতায় বিপাকে খেটে খাওয়া নিম্ন আয়ের মানুষ। অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে শিশুসহ বিভিন্ন বয়সি মানুষ। ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক সিরাজুল ইসলাম বলেন, জেলায় প্রতিবছর শীতজনিত রোগে দেড় শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। শীত মৌসুমে শিশু ওয়ার্ডে রোগীর পরিমাণ দ্বিগুণ হয়ে যায়। ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক মাহাবুবুর রহমান বলেন, জেলার শীতার্ত মানুষের শীত নিবারণের জন্য কম্বল বিতরণ শেষের দিকে। প্রায় ১ লাখ কম্বল বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।
কুড়িগ্রামে হাসপাতালে বাড়ছে ডায়রিয়া রোগী
কুড়িগ্রামে দুই সপ্তাহ ধরে তাপমাত্রা ৯ থেকে ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ওঠানামা করছে। উত্তরীয় হিমেল হাওয়ায় কাহিল হয়েছে পড়েছে নদ-নদী তীরবর্তী চর ও দ্বীপচরের হাজার হাজার মানুষ। হাসপাতালগুলোয় প্রতিদিন বাড়ছে শীতজনিত রোগীর সংখ্যা। গত ২৪ ঘণ্টায় কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে ৩১ জন শিশু। ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ১২ শয্যার বিপরীতে আছে ৫৭ শিশু। শীতের দাপটে কাবু এ জেলার দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষজন। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া লোকজন বাইরে বের হচ্ছে না। কুড়িগ্রামের রাজারহাট কৃষি আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার বলেন, বৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত তাপমাত্রা বৃদ্ধির সম্ভাবনা কম।
ভোলায় কষ্টে আছে নিম্ন আয়ের মানুষ
উপকূলীয় দ্বীপজেলা ভোলার ওপর দিয়ে কয়েকদিন ধরেই বয়ে যাচ্ছে হাড় কাঁপানো শীত। তীব্র শীতে স্থবির জনজীবন। চরাঞ্চল ও বেড়িবাঁধ এলাকার ছিন্নমূল পরিবারের মানুষ শীতে দিশেহারা। ভোলার মদনপুর ও মাঝের চরের গুচ্ছগ্রাম এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ছেঁড়া কাপড় জোড়াতালি দিয়ে তৈরি করছে কাঁথা। কেউ খড়-কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছে। ভোলার দৌলতখান উপজেলার ছিন্নমূল মানুষদের অবস্থাও একই। ভোলা জেলা প্রশাসক আরিফুজ্জামান বলেন, জেলার ৭টি উপজেলায় ইতিমধ্যে শীতার্তদের সরকারি সাহায্য হিসেবে ৪৩ হাজার ৫০০ কম্বল বিতরণ করা হয়েছে।
নড়াইলে তীব্র শীত, থমকে গেছে জনজীবন
নড়াইলে কনকনে বাতাস ও শীতের তীব্রতায় বিপর্যস্ত জনজীবন। আয়-রোজগার কমে যাওয়ায় খেটে খাওয়া মানুষগুলো মানবেতর জীবনযাপন করছে। গত শুক্রবার থেকে শীতের তীব্রতা বেড়েছে এ জেলায়। রাতে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মতো কুয়াশা ঝরছে। ঘন কুয়াশা আর ঠান্ডায় নষ্ট হচ্ছে ধানের বীজতলা। মানুষের পাশাপাশি গবাদিপশুরাও ঠান্ডায় কষ্ট পাচ্ছে। নড়াইলের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশফাকুল হক চৌধুরী বলেন, তীব্র শীতে অসহায়, দরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষের শীত নিবারণের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে কম্বল বিতরণ করা হয়েছে।
মোরেলগঞ্জে ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ার প্রকোপ
তিন দিনের শৈত্যপ্রবাহে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া, নিউমোনিয়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে শিশু বৃদ্ধ ৩৫ জন চিকিৎসাধীন রয়েছে। অতিরিক্ত কুয়াশায় রবিশস্য, আলু ও শাকসবজি ছত্রাক রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিসার আকাশ বৈরাগী জানিয়েছেন, শৈত্যপ্রবাহে অতিরিক্ত কুয়াশার ফলে আলু ও সবজি ফসলে ছত্রাক রোগের আক্রান্ত দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে কৃষকদেরকে মাঠে ছত্রাকনাশক ওষুধ প্রয়োগের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট জেলা ও উপজেলা প্রতিবেদক]