বরগুনা-১
বরগুনা সংবাদদাতা
প্রকাশ : ০৮ জানুয়ারি ২০২৪ ২৩:৫০ পিএম
ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু। ফাইল ছবি
সদর, আমতলী ও তালতলী- এই তিন উপজেলা নিয়ে বরগুনা-১ আসন। আসনটি বরাবরই আওয়ামী লীগের দখলে ছিল। ১৯৯১ থেকে এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু। মাঝে ২০০১ সালে সংসদ সদস্য হন স্বতন্ত্র প্রার্থী দেলোয়ার হোসেন। এবারও ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু এ আসনে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করেন। তবে তৃতীয় অবস্থানে গিয়ে তিনি শোচনীয় পরাজয় বরণ করেন।
পরাজয়ের কারণ হিসেবে স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ভোটাররা মনে করেন, ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু টানা তিন মেয়াদসহ পাঁচবার সংসদ সদস্য হলেও এলাকার উন্নয়নে তেমন ভূমিকা রাখেননি। এমনকি উন্নয়নের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অনেকটাই নির্লিপ্ত। জেলায় সরকারের কোনো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি। এ ছাড়াও পায়রা বন্দর, সেনাক্যাম্প, মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পটুয়াখালীতে হওয়ায় বরগুনার মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ছিল। তাদের বদ্ধমূল ধারণা ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর কারণেই এসব বড় উন্নয়ন প্রকল্প থেকে বঞ্চিত হয়েছে তারা। ‘বরগুনা গুরুত্বপূর্ণ জেলা নয়’ এমন মন্তব্য করে তোপের মুখেও পড়েছেন সংসদ সদস্য শম্ভু।
সদর উপজেলার আনোয়ার বাজার এলাকার বাসিন্দা আনোয়ার আকন বলেন, ‘এই দ্যাহেন মোগো এই পোলডা (গ্রামীণ সেতু) সিডরে ভাঙছে, এহন পোলের উপর দিয়া হাক্কা দিয়া পারাই। এই এক কিলোমিটার (বরইতলা-আনোয়ার বাজার) রাস্তা পাকা করতে কত আত পাও (হাত-পা) ধরছি। উনি কিছুই করেন নাই। আমরা এবার আমাদের ভোটের ক্ষমতা দেখাইছি।’
বরগুনা শহরের বাসিন্দা হানিফ মীর পেশায় রিকশাচালক। তিনি বলেন, ‘গত ১৫ বছরে আমাগো এইহানে তেমন কোনো উন্নয়ন হয়নি। রাস্তাঘাট ভাঙাচোরা। ঠিকভাবে রিকশা চালায়ে খেতে পারি না। উনি (শম্ভু) আমাদের কথা মনেই রাখেননি। আমরা এবার নতুন যোগ্য প্রার্থী বিজয়ী করেছি।’
উন্নয়নবঞ্চিত হওয়ায় ভোটারদের মধ্যে যেমন তীব্র ক্ষোভ ছিল, তেমনি ছিল দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যেও। তালতলীর আওয়ামী লীগ নেতা জিয়া উদ্দীন হিমু মোল্লা বলেন, ‘দলের ভেতরে কোন্দল জিইয়ে রাখা এবং বিগত কয়েক বছরে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি তালতলীতে। তাই জনগণ এবার মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। দলীয় লোকজনের সঙ্গে যোগসূত্র ছিল না, উপজেলা তো দূরে কথা জেলাও সে আসতেন না। তাই জনগণ নৌকায় ভোট দেয়নি। অধিকাংশ নেতাকর্মী স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছি।’
জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোতালেব মৃধা বলেন, ‘জনগণ হচ্ছে ভোটের মালিক, তাদের ভোটেই এমপি নির্বাচিত হয়। বিগত দিনে জনগণের ভোটের মাধ্যমে বরগুনা আসন থেকে নৌকা বিজয়ী হয়েছে। এবার জনগণ কী কারণে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে- সেটা আসলে আমরা বলতে পারব না। তবে আমি দলের হয়ে নির্বাচন করেছি। পরাজয় হওয়াটা লজ্জার। যার দায় আমাদের ওপরও পড়ে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও তিনি (শম্ভু) দলীয় প্রার্থীর বিপরীতে কাজ করেছেন। তার কিছু লোকজনের আচরণে ভোটাররা রীতিমতো ক্ষিপ্ত ছিল।’
জেলা নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেন কামাল বলেন, ‘শম্ভু বেশিরভাগ সময় ঢাকাতে থাকতেন, বরগুনাতে তেমন আসতেন না। নেতাকর্মীদের সঙ্গে তেমন যোগসূত্র ছিল না। জেলায় বিগত দিনে বড় কোনো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেননি। সারা দেশের তুলনায় বরগুনা উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তার প্রভাব পড়েছে নির্বাচনে।’
বরগুনা-১ আসনে এবার ১০ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। তাদের মধ্যে ঈগল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গোলাম সরোয়ার টুকু ৬১ হাজার ৭৪২ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী অপর স্বতন্ত্র প্রার্থী গোলাম ছরোয়ার ফোরকান কাঁচি প্রতীকে পেয়েছেন ৫৭ হাজার ৮৭৪ ভোট। আর ৫৪ হাজার ১৬৮ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর অবস্থান ছিল তৃতীয়।