পুতুল এমপি বানাতে মরিয়া মাফিয়া গডফাদার
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৭ জানুয়ারি ২০২৪ ০১:৪১ এএম
আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০২৪ ১২:১৭ পিএম
রূপগঞ্জের কায়েতপাড়া ইউনিয়নের নাওড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থী শাহজাহান ভূঁইয়ার পক্ষে ভোট কিনতে প্রকাশ্যে টাকা বিতরণ করা হয়। ছবি : সংগৃহীত
নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শাহজাহান ভূঁইয়াকে পুতুল এমপি বানাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে মাফিয়া গডফাদার। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগের দিন, শনিবার (৬ ডিসেম্বর) রূপগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় তাদের অনুসারীরা ভোট কিনতে প্রকাশ্যে টাকা বিতরণ করেছেন। প্রতিদিনের বাংলাদেশের অনুসন্ধানে এই অবৈধ লেনদেনের প্রমাণ মিলেছে। ভোট কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত দুইজনের স্বীকারোক্তির ভিডিও রয়েছে প্রতিবেদকের কাছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, টাকা বিতরণের সময় শাহজাহান ভূঁইয়ার দুই অনুসারীকে হাতেনাতে আটক করে পুলিশে দেওয়া হয়েছে। শনিবার (৬ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় উপজেলার তারাব পৌরসভার খাদুন এলাকা থেকে ১২ হাজার টাকাসহ মনির মোল্লা নামে একজন ও গোতিয়াব এলাকা থেকে ১০ হাজার টাকাসহ নায়েম মিয়া নামে আরেকজনকে আটক করে স্থানীয় বাসিন্দারা।
নায়েম মিয়া প্রতিদিনের বাংলাদেশের কাছে বলেন, ‘আমাকে শাহজাহান ভূঁইয়ার লোক মামুন মিয়া টাকা দেয়। ভোট প্রতি দুই হাজার করে টাকা দিতে বলে। কিন্তু টাকা দিতে গিয়ে আামি ধরা খেয়েছি।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ভোট কিনতে তার পরিচিত চার জনের কাছে টাকা দেওয়া হয়েছে। শুধু তাদের এলাকা নয়, পাশের দক্ষিণবাগেও কেটলি মার্কায় ভোট কিনতে টাকা বিতরণ করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, শাহজাহানের লোক মামুন মিয়া তাকে এ কাজ করাতে বাধ্য করেছেন। কাজটা না করলে তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।
এদিন বিকালে স্বতন্ত্র প্রার্থী শাহজাহান ভূঁইয়ার অনুসারীদের কায়েতপাড়া ইউনিয়নের নাওড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে টাকা বিতরণের ভিডিও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, শাহজাহান ভূঁইয়ার অনুসারীরা নাওড়া এলাকার সুরিয়া বেগম নামের এক নারীকে তিনটি ভোটের জন্য ৩ হাজার টাকা দিয়েছেন। টাকা দেওয়ার পর ওই নারীকে বলা হয়, ‘টাকাটা দিলাম ভোটটা স্বতন্ত্র প্রার্থী শাহজাহান ভূঁইয়াকে কেটলি প্রতীকে দেবেন।’ পরে ওই নারী টাকা নেওয়ার বিষয়টি সাংবাদিকদের কাছেও স্বীকার করেন।
প্রতিদিনের বাংলাদেশের কাছে সুরিয়া বেগম বলেন, ‘তিন হাজার না, আমাকে দুই হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। আমি খেতে বসছিলাম, জোর করে ওই টাকা দিয়ে কেটলি মার্কায় ভোট দিতে বলেছে।’
এর আগে বিধি লঙ্ঘন করে রূপগঞ্জের আধুরিয়া ও কৈশাব এলাকায় গণসংযোগ করেন শাহজাহান ভূঁইয়া ও তার কর্মীরা। এ সময় ছবি তুলতে গেলে শাহজাহানের অনুসারীরা স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে অসদাচরণ করে। কয়েকজনের মোবাইল ফোনও ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আধুরিয়া ও কৈশাব এলাকায় শুক্রবার বেলা ১১টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত গণসংযোগ করেন শাহজাহান ভূঁইয়া। এ সময় নিজের গাড়ি থেকে নেমে রিকশায় চড়ে ১০ থেকে ১২ জন নেতাকর্মী নিয়ে ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চান তিনি। ভোটারদের মধ্যে শাহজাহান ভূঁইয়া এ সময় নগদ টাকা বিতরণ করেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, শনিবার সকালে কয়েকটি মাইক্রোবাসে করে বস্তাভর্তি টাকা নামিয়ে দেওয়া হয় শাহজাহান ভূঁইয়ার ৬ তলা বাড়িসহ বিভিন্ন পয়েন্টে। ওই টাকা উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডে তার অনুসারীদের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়। কয়েকটি স্থানে টাকা বিতরণের ভিডিও প্রকাশ হলে এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়।
এদিকে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী গোলাম দস্তগীর গাজী বীরপ্রতীকের পক্ষ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর টাকা ছড়ানোর বিষয়টি জেলার রিটার্নিং অফিসার ও উপজেলা সহকারী রিটার্নিং অফিসারকে অবহিত করা হয়েছে। রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দীপঙ্কর চন্দ্র সাহা বলেন, প্রার্থীর পক্ষে টাকা বিতরণের সময় আটকের ঘটনা আমাকে জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিচ্ছি।
জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাহমুদুল হক বলেন, নির্বাচনী আচরণবিধি যারাই লঙ্ঘন করেছে, তাদের বিরুদ্ধেই আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর কেউ প্রচার চালিয়ে থাকলে সেটি আইন ভঙ্গ করা হবে। টাকা বিতরণের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তথ্যপ্রমাণসহ কেউ অভিযোগ করলে অবশ্যই যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।