নৌকায় ভোট দিলে পিষে ফেলার হুমকি
নোয়াখালী প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৩ জানুয়ারি ২০২৪ ২০:০৩ পিএম
আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০২৪ ২০:১৬ পিএম
নৌকায় ভোট দিলে ভোটারদের ছেঁচি (পিষে) ফেলার ঘোষণা দেওয়া বেগমগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ডা. এবিএম জাফর উল্যাহকে অব্যাহতি দেওয়ার পর তিনি উল্টো উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও নোয়াখালী-৩ (বেগমগঞ্জ) আসনের নৌকার প্রার্থী মামুনুর রশীদ কিরনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছেন।
বুধবার (৩ জানুয়ারি) বিকালে বেগমগঞ্জের নিজ বাসায় সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ ঘোষণা দেন। এসময় সংগঠনটির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেনকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করেন তিনি।
এর আগে মঙ্গলবার রাতে ডা. এবিএম জাফর উল্যাহসহ মোট ১৬ নেতাকে দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি দেন মামুনুর রশীদ কিরন।
লিখিত বক্তব্যে ডা. এবিএম জাফর উল্যাহ বলেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমিসহ অনেকে নোয়াখালী-৩ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নের জন্য আবেদন করি। সভানেত্রীর মনোনয়ন বোর্ড মামুনুর রশিদ কিরন সাহেবকে মনোনয়ন প্রদান করেন। পরবর্তীতে নেত্রী মনোনয়ন জাতীয় নির্বাচনকে অর্থবহ, প্রতিযোগিতামূলক ও আনন্দমুখর করার জন্য যে কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতে পারবেন বলে জানান। নেত্রী বলেন, এতে দলের আপত্তি থাকবে না। আগের নির্বাচনের মতো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত না হওয়ার জন্য হুশিয়ার করা হয়। সে অনুযায়ী নেত্রীর পরামর্শ মোতাবেক আমরা তিনজন স্বতন্ত্র প্রার্থী মিনহাজ আহমেদ জাবেদ সাহেবকে সমর্থন করেছি। এতে দলের গঠনতন্ত্র বিরোধী কোনো কর্ম আমরা করিনি এবং সভানেত্রীর নির্দেশ বাস্তবায়ন করছি।
নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর আমরা কখনো দল ও দলীয় প্রতীকের বিরুদ্ধে কোনো বিষোধগার করিনি। উপরন্তু আমরা দল ও প্রতীকের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছি। সাধারণ ভোটারদের অভিব্যক্তি অনুযায়ী আমরা নৌকার প্রার্থীর যোগ্যতা ও বিগত দশ বছরের উনার উন্নয়ন কর্মকান্ডের বিষয়ে আলোচনা করেছি। কিন্তু সর্বত্র প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছি। বরং মামুনুর রশীদ কিরন বিভিন্ন সময় নানা অপকর্ম করেছেন। ২০০৮ সালে নৌকার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তিনি নৌকাকে ডুবিয়েছেন এবং কৌশলে বিএনপির প্রার্থী বরকত উল্যাহ বুলুকে জয়ী হতে পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছেন। এর বাইরেও বিভিন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে দলকে ডুবিয়েছেন।
তিনি বলেন, মামুনুর রশীদ কিরন ২০০৮ সালে নৌকার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হয়ে নৌকাকে ডুবিয়েছে এবং কৌশলে বিএনপির প্রার্থী বরকত উল্যাহ বুলুকে জয়ী হতে পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছেন। ২০২১ সালে দলীয় প্রধান কর্তৃক মনোনীত চৌমুহনী পৌরসভার মেয়র আক্তার হোসেন ফয়সালের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী করে উনার ভাই অযোগ্য প্রার্থী সাইফুল্ল্যাহকে মেয়র বানান। বর্তমানে মেয়র সাইফুল্ল্যাহ পৌরসভায়, ঘুষ, দুর্নীতি এবং নিয়োগ বাণিজ্যের আখড়ায় পরিণত করেছেন। সর্বশেষ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রায় ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থীর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী দাঁড় করিয়ে নৌকার ভরাডুবি করেন। উপজেলার সকল টেন্ডার উনি উনার পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে কমিশনের ভিত্তিতে বণ্টন করেন। যাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে উনার বিরুদ্ধে বিরূপ জনমত তৈরি হয়।
তিনি আরও বলেন, চৌমুহনী হকার্স মার্কেটের সভাপতির বিরুদ্ধে মন্দির ভাঙার মিথ্যা মামলা দায়ের করে তাকে গ্রেপ্তার করিয়ে মামুনুর রশীদ নিজে সভাপতি হয়ে মার্কেটের কোটি কোটি টাকা লুটপাট করেন। সর্বশেষ বিখ্যাত চৌমুহনী বড় মসজিদের সভাপতি হয়ে এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতা সামছুল হক সামসুকে মসজিদের সাধারণ সম্পাদক করে উনিসহ মসজিদের তহবিল থেকে ৩ কোটি বিশ লাখ টাকা তছরুপ করলে মুসল্লিদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। যা বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রচারিত হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন আলেম ওলামাগণ সেই ঘটনার বিরুদ্ধে ওয়াজে বিষেদাগার করেন। এতে করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের তথা স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের মারাত্মক বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়েন। একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান হিসেবে বিষয়টি মেনে নিতে পারি না।
আওয়ামী লীগকে কলঙ্ক মুক্ত করতে চাই উল্লেখ করে এবিএম জাফর উল্যাহ বলেন, আমরা আওয়ামী লীগকে কলঙ্ক মুক্ত করার জন্য মসজিদের টাকা তছরূপের দায়ে গতকাল উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির সভায় সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রশিদ কিরন এবং সহ-সভাপতি সামসুল হক সামসুকে উপজেলা আওয়ামী লীগে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করলাম এবং স্থায়ী বহিষ্কারসহ সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জেলা আওয়ামী লীগ ও দলীয় সভানেত্রী বরাবর অনুলিপি প্রেরণ করলাম।
ভাইরাল হওয়া বক্তব্যের বিষয়ে এবিএম জাফর উল্যাহ বলেন, আমি সাত তারিখ পর্যন্ত স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে আছি। তারপর ভোট শেষে আমি আবার আমার জায়গায় থাকবো। সবাইকে নিয়েই আমাদের আওয়ামী লীগ থাকবে। কাদিরপুর ইউনিয়নে যে বক্তব্য দিয়েছি তা নৌকার বিপক্ষে বলিনি। আমার বক্তব্যকে ভুলভাবে প্রচার করা হয়েছে।
সম্মেলনে চৌমুহনী পৌরসভার সাবেক মেয়র ও পৌরসভা আওয়ামী লীগের সভাপতি আক্তার হোসেন ফয়সাল, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন, কাদিরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সালাহ উদ্দিন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে গতকাল মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে বেগমগঞ্জ বিসিক শিল্প এলাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও নোয়াখালী-৩ (বেগমগঞ্জ) আসনের নৌকার প্রার্থী মামুনুর রশীদ কিরণ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ডা. এবিএম জাফর উল্যাহসহ ১৫ জন নেতাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
অব্যাহতি পাওয়া অন্য নেতারা হলেন- বেগমগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মাহফুজুল হক বেলাল, সামসুল হক সামসু, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন, তথ্য গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন আজীম, ত্রাণ ও সমাজ কল্যাণ সম্পাদক মোরশেদ আলম, প্রচার ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক মো. মোশাররফ হোসেন, যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক ইমাম হোসেন রাজু, সাংগঠনিক সম্পাদক শরাফ উদ্দিন বাবু, সহ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক অ্যাড. এ বি এম ইউসুফ আশিক, সদস্য ও চৌমুহনী পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি আক্তার হোসেন ফয়সল, সদস্য আবুল বাশার স্বপন, শাহজাহান সাজু, হায়দার জাফর হাবিব, মেহেদি হাসান টিপু ও দাউদ উল্যা হিল মজিদ।
গত ১ জানুয়ারি বিকালে কাদিরপুর ইউনিয়নে স্বতন্ত্র প্রার্থী ট্রাক প্রতীকের মিনহাজ আহমেদ জাবেদের এক উঠান বৈঠকে নৌকায় ভোট দিলে ভোটারদের ছেঁচি (পিষে) ফেলার ঘোষণা দেন নোয়াখালী-৩ (বেগমগঞ্জ) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রধান নির্বাচনী সমন্বয়ক ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ডা. এবিএম জাফর উল্যাহ। এই বক্তব্যের ৪৩ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।