জাতীয় সংসদ নির্বাচন
জহুরুল ইসলাম, কুষ্টিয়া
প্রকাশ : ০৩ জানুয়ারি ২০২৪ ১২:৩৩ পিএম
আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০২৪ ১৫:৫৫ পিএম
গড়াই পারের জেলা কুষ্টিয়া। জেলার চারটি সংসদীয় আসনের মধ্যে এবার তিনটিতে টালমাটাল অবস্থায় পড়েছেন নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা। কুষ্টিয়া-১, ২ ও ৪ আসনে নৌকার প্রার্থীদের তুলনায় এগিয়ে আছেন স্বতন্ত্ররা। কুষ্টিয়া-৩ আসনে নৌকা ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। এ আসনে আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থী ও দলের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ এবার সহজে পার পাচ্ছেন না। নির্বাচনী মাঠে তার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী কুষ্টিয়ার জনপ্রিয় মেয়রপুত্র পারভেজ আনোয়ার তনু।
কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) : দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগের টিকিট পেয়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্য ও দৌলতপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আ কা ম সরওয়ার জাহান বাদশা। একাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সহজেই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও এবার তাকে চেপে ধরেছেন নিজ দলের তিন স্বতন্ত্র প্রার্থী। এরা হলেনÑ সাবেক এমপি ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি রেজাউল হক চৌধুরী, সাবেক এমপি আফাজ উদ্দিন আহমেদের ছেলে নাজমুল হুদা পটল ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ফিরোজ আল মামুন। এতে চরম বেকায়দায় পড়েছেন আওয়ামী লীগের সরওয়ার জাহান বাদশা। নির্বাচন সামনে রেখে বাদশার গত ৫ বছরের নানা কর্মকাণ্ডের চুলচেরা হিসাব কষছেন দলের তৃণমূল নেতাকর্মীরা।
কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা) : জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে কুষ্টিয়া-২ আসন থেকে টানা তিনবার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। আসন্ন নির্বাচনেও তিনি একই আসন থেকে নৌকা পেয়েছেন। বিগত তিনটি নির্বাচনে ইনু আওয়ামী লীগ নেতাদের সমর্থন পেলেও এবার দৃশ্যপট আলাদা। এবার সেখানে উপজেলা চেয়ারম্যানের পদ ছেড়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন মিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের দাপুটে সাধারণ সম্পাদক কামারুল আরেফিন। তার পক্ষে একাট্টা দলের অধিকাংশ নেতা। তাদের দাবি, হাসানুল হক ইনু এতদিন আওয়ামী লীগের ঘাড়ে ভর করে এমপি হয়েছেন। এবার ইনুকে নয়, নিজ দলের প্রার্থীকে ভোট দিতে চান তারা।
কুষ্টিয়া-৩ (সদর) : আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থী মাহবুব উল আলম হানিফের আসনে এবার বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হওয়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। গত দুটি সংসদ নির্বাচনে হানিফের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকলেও এবার প্রার্থী হয়েছেন কুষ্টিয়া পৌরসভার জনপ্রিয় মেয়র আনোয়ার আলীর ছেলে পারভেজ আনোয়ার তনু। তনু ক্রীড়া সংগঠক ও ব্যবসায়ী। তরুণদের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা আছে। নেতাকর্মীরা মনে করছেন, তনু প্রার্থী হওয়ায় এখানে হিসাব বদলে যেতে পারে। কারণ ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী দিলেও সেই প্রার্থী মাঠেই নামতে পারেননি। হামলা-মামলায় আক্রান্ত হয়ে ঘরে বসে থাকতে হয়েছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনএফের দুর্বল প্রার্থী ছিল নৌকার প্রতিপক্ষ। সেই তুলনায় তনু শক্ত প্রার্থী বলে মনে করছেন অনেকে। তনুর বাবা আনোয়ার আলী কুষ্টিয়া পৌরসভার পাঁচবারের নির্বাচিত মেয়র। তিনি এ আসনে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে সামান্য ভোটে পরাজিত হন। পৌর এলাকায় তার নিজস্ব ভোটব্যাংক আছে। তার ছেলে হিসেবে তনু একটু বাড়তি সুবিধা পাবেন বলে মনে করছেন অনেকে। এ ছাড়া বিএনপি ও সমমনাদের সমর্থন পাচ্ছেন তনু। স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
অন্যদিকে টানা দুবারের সংসদ সদস্য মাহবুব উল আলম হানিফ এলাকায় তথা কুষ্টিয়া পৌর এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন কাজ করেছেন, যা অন্য কারও সময় হয়নি। তবে নেতাকর্মীদের অভিযোগ, হানিফের আমলে সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ ছিল তার চাচাতো ভাই সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতার। তিনি দলের ত্যাগীদের কোণঠাসা করে বিএনপি-জামায়াত ও হাইব্রিড নেতাদের কাছে টেনেছেন।
কুষ্টিয়া-৪ (খোকসা-কুমারখালী) : আওয়ামী লীগ প্রার্থী বর্তমান এমপি সেলিম আলতাফ জর্জের অবস্থা বেশ টালমাটাল। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পোড়খাওয়া নেতাদের চমকে দিয়ে আওয়ামী লীগের টিকিট বাগিয়ে এমপি হন সেলিম আলতাফ জর্জ। স্থানীয় আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে নতুন মুখ হলেও তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর গোলাম কিবরিয়ার নাতি। সেই সুবাদেই তিনি একাদশ সংসদ নির্বাচনে দলীও মনোনয়ন পেয়েছিলেন বলে স্থানীয় নেতাদের ধারণা। তবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর কিছু বিতর্কিত কর্মকাণ্ড এবং একলা চলো নীতির ফলে স্থানীয় আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতাকর্মী তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন বলে তৃণমূল নেতাকর্মীদের দাবি। তাই গেল নির্বাচনে তিনি পার পেলেও এবার তিনি পড়েছেন তীব্র চ্যালেঞ্জের মুখে। এবার ওই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা সাবেক এমপি আব্দুর রউফ। এখানে আব্দুর রউফের নিজস্ব ভোটব্যাংক রয়েছে। এরই মধ্যে আব্দুর রউফের সমর্থনে দুই উপজেলা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতারা একজোট হয়েছেন। এই কাতারে রয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি জেলা পরিষদের সাবেক প্রশাসক জাহিদ হোসেন জাফর। তবে আসনটিতে ছড়িয়ে পড়েছে নির্বাচনী সহিংসতা। প্রায় প্রতিদিনই নির্বাচনী কার্যালয়ে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সমর্থকদের মারধরের পাল্টাপাল্টি ঘটনা ঘটছে আব্দুর রউফ ও সেলিম আলতাফ জর্জের সমর্থকদের মধ্যে।