রুমার সাঙ্গু নদ
সুফল চাকমা, বান্দরবান
প্রকাশ : ০২ জানুয়ারি ২০২৪ ১২:৫৯ পিএম
আপডেট : ০২ জানুয়ারি ২০২৪ ১৫:০৬ পিএম
সাঙ্গু নদে চারটি খননযন্ত্র দিয়ে অবৈধভাবে বালু তোলা হচ্ছে। রবিবার বান্দরবানের রুমা উপজেলার সদর ইউনিয়নের রুমাচর এলাকায়। প্রবা ফটো
দীর্ঘদিন ধরে বান্দরবানের রুমা উপজেলার সাঙ্গু নদে চারটি খননযন্ত্র (ড্রেজার) দিয়ে অবৈধভাবে বালু তুলছে একটি চক্র। এতে তীরবর্তী ফসলি জমি নদে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এভাবে বালু তোলায় সুপেয় পানির অভাব দেখা দিয়েছে। বিঘ্নিত হচ্ছে পাহাড়ে দুর্গম এলাকার নৌযান চলাচল। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, নদ থেকে বালু তোলার জন্য সরকারিভাবে কাউকে অনুমতি দেওয়া হয়নি। মাঝে মাঝে অভিযান চালালে বালু তোলা বন্ধ হয়। পরে আবার আগের মতো চলে বালু তোলার কাজ। আর এখন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ততার সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে চক্রটি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রুমা সদর ইউনিয়নের মুন লাই পাড়া ঘাট, রুমাচর পাড়া ঘাট ও পলিকা পাড়া ঘাট তিনটি এলাকায় চারটি খননযন্ত্র দিয়ে সাঙ্গু থেকে রাত-দিন বালু তোলা হচ্ছে। ফলে একদিকে কৃষকের ফসলি জমি বিলীন হচ্ছে, নৌ-চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে নদের তীরের বাসিন্দাদের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পানি দূষিত হয়ে পড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে প্রভাব পড়বে জনস্বাস্থ্যের ওপর।
অবশ্য স্থানীয়দের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেল সরেজমিনেও। গত রবিবার দেখা যায়, রুমা খালের মুখ এবং রুমাচর পাড়ার মধ্যবর্তী সাঙ্গু নদ থেকে চারটি খননযন্ত্র দিয়ে ১০ ইঞ্চি পাইপ যুক্ত করে বালু তোলা হচ্ছে। মেশিনের বিকট শব্দে প্রাণপ্রকৃতি চরম হুমকির সম্মুখীন। সেখানে কর্মরত শ্রমিক মিজান, সোহেল, রায়হান জানান, তারা ছয়জন আট দিন ধরে আবু বক্কর মেম্বারের অধীনে বালু তোলার কাজ করছেন। তাদের সবার বাড়ি কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায়। শ্রমিক ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আবু বক্কর মেম্বার, মো. হাসান মুরাদ, মো. মতলব, মো. দস্তগির, জুয়েল দাশ, মিল্টন মারমা, প্রণব লাল চক্রবর্তী, এ কে মালেক ও মো. শাকিলের নেতৃত্বে দশজনের সিন্ডিকেট বালু তোলার কাজে জড়িত।
বোটচালক মুইম্রা অং মারমা বলেন, ‘রুমাচর-পলিকা পাড়া মুখ এলাকার সাঙ্গুর মাঝখানে বালু তোলার মেশিন বসানোর কারণে রুমাবাজার থেকে গ্যালেঙ্গ্যা বাজার, বলিপাড়া নৌবোট চলাচলে ব্যাঘাত ঘটছে। যেকোনো সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। নদের মাঝখান থেকে এভাবে বালু তোলা বন্ধে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’
রুমাচর পাড়ার বাসিন্দা উথোয়াই মং মারমা বলেন, ‘পাড়ার ১০৫ পরিবারের মারমা সম্প্রদায়ের লোকজন সাঙ্গুর পানির ওপর নির্ভরশীল। পাড়ায় কোনো টিউবওয়েল না থাকায় গোসল, কাপড় ধোয়া, রান্নাবান্নাসহ দৈনন্দিন কাজের পানির উৎস এই সাঙ্গু। গত বছর থেকে শুষ্ক মৌসুমে সাঙ্গু থেকে বালু তোলার কারণে নিচের দিকে পানি ঘোলা ও ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। কয়েকদিন ধরে একসাথে তিন-চারটি মেশিন দিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। এতে করে পানি চুইয়ে নদে মিশে পুরো সাঙ্গুর পানি ঘোলা করে দিচ্ছে। ফলে পানি অপরিষ্কার ও দূষিত হয়ে পড়ছে। এর ফলে এলাকার জনস্বাস্থ্যের চরম ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
রুমাচর উপর পাড়ার বাসিন্দা চসানু মারমা বলেন, ‘সাঙ্গুর তীরে প্রতিবছরের ন্যায় এ বছরও ৪০ শতক জমিতে মটরশুঁটি, শিমসহ বিভিন্ন সবজি চাষ করেছিলাম। কিন্তু নদ থেকে বালু উত্তোলন করায় তীর ভেঙে সবজিক্ষেত বিলীন হয়ে গেছে। বালু উত্তোলনকারী আবু বক্কর মেম্বারের কাছে বললে তিনি হুমকি দিয়ে বলেন, যেখানে পারো অভিযোগ করো, আমি বালু উত্তোলন করবই।’
বালু তোলার কথা স্বীকার করে আবু বক্কর মেম্বার বলেন, ‘বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রমের জন্য বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।’ তবে হুমকির বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ দিতে বলা হয়েছিল।’
বালুমহাল লিজ না নিয়ে উত্তোলনের ব্যাপারে জানতে চাইলে সিন্ডিকেটের আরেক সদস্য মো. হাসান মুরাদ বলেন, ‘সবাইকে (প্রশাসন) ম্যানেজ করেই এখানে বালুর ব্যবসা করছি।’
জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সৈয়দ মাহবুবুল হক বলেন, ‘বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগের ভিত্তিতে গত সপ্তাহে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে ৫০ হাজার টাকা করে মোট ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। পাশাপাশি সেখানে বালু উত্তোলন না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনী ব্যস্ততার কারণে বারবার অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব নয়।’
বান্দরবান পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ফখর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘সাঙ্গু থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছি। দ্রুত অভিযান পরিচালনা করে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’