প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০১ জানুয়ারি ২০২৪ ১৪:৩৯ পিএম
আপডেট : ০২ জানুয়ারি ২০২৪ ০০:২৬ এএম
মোশারফ হোসেন ভুঁইয়া ওরফে মোশা। প্রবা ফটো
রূপগঞ্জের কায়েতপাড়া ইউনিয়নের নাওড়ায় নৌকার নির্বাচনী ক্যাম্পে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে তদন্ত টিম। রবিবার (৩১ ডিসেম্বর) সরেজমিন তদন্তে আসেন নারায়ণগঞ্জ জেলা দায়রা জজ আদালতের সিনিয়র সহকারী জজ মো. আনিসুজ্জামান। তারা প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেন।
জানা গেছে, রূপগঞ্জের শীর্ষ সন্ত্রাসী মোশারফ হোসেন ওরফে মোশা ও তার ক্যাডার বাহিনী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শাহজাহান ভূঁইয়ার পক্ষ নিয়ে গত শুক্রবার রাতে নাওড়া এলাকায় নৌকার নির্বাচনী ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুরের পর আগুন ধরিয়ে দেয়। এ ঘটনায় পরের দিন কায়েতপাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আউয়াল বাদী হয়ে রূপগঞ্জ থানায় একটি মামলা করেন। এতে শীর্ষ সন্ত্রাসী মোশাসহ ১২ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ১০-১৫ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়।
জেলা দায়রা জজ আদালতের বেঞ্চ সহকারী ইবনে সাউদ গতকাল বলেন, নাওড়ায় নৌকার ক্যাম্প পোড়ানো হয়েছে- এমন অভিযোগ পেয়ে আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসেছি। পরে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
ঘটনাস্থলে পর্যবেক্ষণে এসে আপনারা কী দেখলেন- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমরা ক্যাম্প পোড়া অবস্থায় দেখেছি। প্রত্যক্ষদর্শী ও এলাকার মুরব্বিরা সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাদের বক্তব্যগুলো নোট করা হয়েছে। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা তিনজনের নাম পেয়েছি। তিনজনই মোশারফ হোসেন ওরফে মোশার লোক।
এদিকে সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা। কায়েতপাড়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার জসিম উদ্দিন বলেন, এলাকার লোকজন আগে ভালোই ছিল। কিন্তু বর্তমানে মোশা বাহিনীর আতঙ্ক ভর করেছে। মাফিয়া ভূমিদস্যুর আশ্রিত মোশা বাহিনী স্বতন্ত্র প্রার্থী শাহজাহান ভূঁইয়ার সঙ্গে থেকে শুক্রবার বিকালে নাওড়ায় শোডাউন করে। তখন আমরা কাউন্সিল অফিসে নৌকার গণসংযোগের বিষয়ে মিটিং করছিলাম। হঠাৎ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ফোন এলো- মোশার বাহিনীর ক্যাডাররা পূর্বপাড়া বাজারের রানা মার্কেটের সামনে নৌকার ক্যাম্পে আগুন দিয়েছে। সেখানে গিয়ে দেখলাম স্থানীয়রা আগুন নিভিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বসুন্ধরার আশ্রয় ও শাহজাহানের ছত্রছায়ায় থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী মোশা এলাকার মানুষকে হুমকিধমকি দিয়ে চলছে। ক্যাম্পে আগুন দেওয়ার পরপরই মোশা বাহিনী শোডাউন করে। তারা ৭ জানুয়ারি নির্বাচনে কেটলির (শাহজাহান ভূঁইয়ার প্রতীক) জয় হলে এলাকার মানুষকে দেখে নেবে বলেও হুমকি দেয়। নৌকায় ভোট না দিয়ে কেটলিতে ভোট দেওয়ার জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভয়ভীতিও দেখাচ্ছে মোশার বাহিনীর লোকজন। এতে এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। আমরা তদন্ত কমিটির কাছে এসব অভিযোগ করেছি, যাতে সুষ্ঠু ভোটের পরিবেশ সৃষ্টি করতে দ্রুত দোষীদের গ্রেপ্তার করা হয়।
শুক্রবারের সন্ত্রাসী ঘটনার পর এলাকার ভোটাররা নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের নিরাপত্তা জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন। মাফিয়া ভূমিদস্যুর আশ্রিত মোশা বাহিনীর দাপটে তারা আতঙ্ক বোধ করছেন। শীর্ষ সন্ত্রাসী মোশার নামে আগে থেকেই ধর্ষণ, হত্যা, চাঁদাবাজিসহ ৪২টি মামলা ছিল। সর্বশেষ নির্বাচনী ক্যাম্পে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের ঘটনায় তার নামে আরও একটি মামলা হয়েছে। এলাকাবাসী এই মামলায় অবিলম্বে মোশা ও তার ক্যাডারদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে।
এলাকার মহিলা মেম্বার সুলতানা রাজিয়া বলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসী মোশা ও তার বাহিনীর ক্যাডারদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই আমরা। নাওড়া গ্রামের মানুষ মোশার আতঙ্কে রয়েছে। পরশু দিন মোশা তার বাহিনী নিয়ে গ্রামে ঢুকেছে শোনামাত্র সবাই ভয়ে যার যার ঘরে ঢুকে যায়। ওরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে নৌকায় ভোট না দিয়ে কেটলি মার্কায় ভোট দিতে বলছে। এ সময় এই বলে হুমকি দেওয়া হয়েছে যে, কেটলিতে ভোট দিলে গ্রামে থাকতে পারবে আর নৌকায় ভোট দিলে গ্রাম থেকে চলে যেতে হবে।
ভোটের সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষায় মোশা বাহিনীর সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করার জন্য প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন এই নারী জনপ্রতিনিধি।
রংধনু গ্রুপের পরিচালক ও জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য মিজানুর রহমান মিজান বলেন, কেটলির সমর্থক ৪২ মামলার আসামি মোশারফ হোসেন মোশা পুরো কায়েতপাড়ায় যারা নৌকার সমর্থক আছে তাদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। কাউকে ফোনের মাধ্যমে, কাউকে তার ক্যাডার বাহিনীর মাধ্যমে। এ ছাড়া বাড়ি বাড়ি গিয়ে বলছে, যদি তোমরা ৭ তারিখ ভোটকেন্দ্রে যাও তাহলে তোমাদের হাত-পা ভেঙে দেওয়া হবে। হত্যা করা হবে। কায়েতপাড়াবাসী, বিশেষ করে নাওড়ার হিন্দু সম্প্রদায় আতঙ্কের মধ্যে আছে। তারা জীবনের ঝুঁকিতে আছে। তারা ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবে কি না এ নিয়ে সংশয়ে রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসী মোশা এলাকায় এসে হুমকি দিয়ে বলেছে, ৭ জানুয়ারি কেটলি মার্কা বিজয়ী হলে নৌকার কোনো সমর্থক এলাকায় ঢুকতে পারবে না। তাদের রোহিঙ্গাদের মতো থাকতে হবে। গ্রামে আর আসতে হবে না।
হিন্দু সম্প্রদায়ের এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, নৌকায় ভোট না দিতে সন্ত্রাসীরা আমাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকি দিচ্ছে। তারা যাতে আমাদের কোনো ক্ষতি করতে না পারে সেজন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচার চাই।