× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

এরশাদ নেই, পল্লী নিবাসে এখন শুধুই শূন্যতা

মেরিনা লাভলী, রংপুর

প্রকাশ : ৩০ ডিসেম্বর ২০২৩ ০৯:৪১ এএম

আপডেট : ৩০ ডিসেম্বর ২০২৩ ০৯:৪২ এএম

রংপুর নগরীর দর্শনায় জাপার প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বাড়ি ‘পল্লী নিবাস’। প্রবা ফটো

রংপুর নগরীর দর্শনায় জাপার প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বাড়ি ‘পল্লী নিবাস’। প্রবা ফটো

নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে পতন ঘটে স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের। অনেকেই ধারণা করেছিলেন এর মধ্য দিয়েই বুঝি জাতীয় পার্টির (জাপা) রাজনীতিরও ইতি ঘটবে। কিন্তু সে ধারণা ভুল প্রমাণ করে জাতীয় পার্টি ১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনে ৩৫টি আসনে জয়লাভ করে। এর সিংহভাগই ছিল রংপুর বিভাগে। জেলে থাকলেও ‌‘দেশের ছাওয়াল’ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে ৫টি আসনেই জয়ী করেন রংপুরবাসী। এরপর থেকে পুরো রংপুর অঞ্চল এরশাদ তথা জাতীয় পার্টির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিতি পায়। সেই সঙ্গে জাতীয় পার্টির উত্তরবঙ্গের রাজনীতি পরিচালনার প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে রংপুর নগরীর দর্শনায় অবস্থিত ‘পল্লী নিবাস’।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ব্যক্তিগত এই বাড়ি থেকেই পরিচালিত হতো রংপুর অঞ্চলে জাতীয় পার্টির রাজনীতি। এরশাদ রংপুর এলেও এই বাড়িতেই উঠতেন। দলীয় নেতাকর্মীদের আনাগোনায় মুখর হয়ে থাকত পল্লী নিবাস। জাপা চেয়ারম্যানের উপস্থিতি কিংবা অনুপস্থিতিতে নেতাকর্মীরা যেতেন সেখানে। বিশেষ করে জাতীয় সংসদ কিংবা স্থানীয় সরকার নির্বাচন এলে রমরমা হয়ে উঠত বাড়িটি। রংপুর বিভাগসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার সম্ভাব্য প্রার্থীরা দলীয় মনোনয়ন পেতে এ বাড়িতে ভিড় করতেন। লাঙ্গল লাঙ্গল স্লোগানে মুখর থাকত পুরো এলাকা। দলের চেয়ারম্যানের দৃষ্টি আকর্ষণে বাড়ির সামনে তোরণ, ব্যানার, পোস্টার লাগাতেন নেতারা। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও এই ধারা অব্যাহত ছিল। এবার সেই চিরচেনা ছবিটি আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মাত্র কয়েক দিন পর ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নগরী সরগরম প্রার্থীদের প্রচারণায়। কিন্তু পল্লী নিবাসের যেন ঘুমই ভাঙেনি। চারদিকে সুনসান নীরবতা। এ যেন রাজাবিহীন রাজপ্রাসাদে আলোহীন ঝাড়বাতিগুলো শুধু মৃদু হাওয়ায় দুলছে। 

অথচ এই পল্লী নিবাসেই চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন এইচ এম এরশাদ। ২০১৯ সালের ১৪ জুলাই ঢাকার সিএমএইচে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা গেলে এলাকাবাসীর দাবির মুখে তাকে এখানেই কবর দেওয়া হয়। 

সেই পল্লী নিবাসে এখন শুধুই শূন্যতা। সারা দেশে জাতীয় পার্টির নেতারা ভোট নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করলেও এরশাদের পল্লী নিবাস যেন উপেক্ষিত থেকে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে কোনো নেতাকর্মীর ছায়া পড়েনি দলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যানের এ বাড়িতে। 

জানা যায়, মৃত্যুর আগে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ঢাকা ও রংপুরের বাড়ি-গাড়ি, দোকানপাটসহ যাবতীয় সম্পদ ‘হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ট্রাস্ট’-এর নামে উইল করে দিয়ে যান। এসব সম্পদ থেকে প্রাপ্ত অর্থ ছেলে এরিক এরশাদের ভরণপোষণ শেষে যা উদ্বৃত্ত থাকবে তা সমাজকল্যাণে ব্যয় হবে। 

এরশাদের মৃত্যুর পর উপনির্বাচনে রংপুর-৩ (সদর ও সিটি করপোরেশন) আসনে ছেলে রাহগীর আলমাহি এরশাদ (সাদ এরশাদ) দলীয় মনোনয়ন পান। তিনিও পল্লী নিবাসে থেকেই নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে ছিলেন। তখন দলীয় নেতাকর্মীদের আনাগোনায় অনেকটাই মুখর ছিল পল্লী নিবাস। ২০১৯ সালের ৫ অক্টোবরের উপনির্বাচনে জয়ী হন সাদ এরশাদ। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর সাদ রংপুর সফরে এলে পল্লী নিবাসেই থাকতেন। এরিক এরশাদও মা বিদিশাকে নিয়ে কয়েক দফা পল্লী নিবাসে এসেছেন। কিন্তু সংসদ সদস্য হওয়ার বছর পার না হতেই দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে সাদ এরশাদের বিরোধ তৈরি হয়। এরশাদের মৃত্যুর পর থেকেই নেতাকর্মীদের আনাগোনা কমতে থাকা পল্লী নিবাস এই বিরোধে আরও নীরব হয়ে পড়ে। এবার রংপুর-৩ আসনে দলের বর্তমান চেয়ারম্যান এবং এরশাদের ভাই জি এম কাদের নিজেই প্রার্থী হয়েছেন। জি এম কাদের তার নির্বাচনী প্রচারণার জন্য রংপুরে এলেও থেকেছেন নগরীর সেনপাড়ার পৈতৃক বাড়ি ‘স্কাই ভিউ’-তে। স্বাভাবিকভাবেই নেতাকর্মীদের ভিড়ও সেখানেই। ফলে এরশাদের তৈরি পল্লী নিবাস থেকে গেছে একেবারেই জনমানবশূন্য। 

সরেজমিনে দেখা যায়, নগরীর ‘পল্লী নিবাস, দর্শনা’ নামফলক লেখা বাড়ির প্রধান ফটকের ওপরে জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, বর্তমান চেয়ারম্যান জি এম কাদের, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদ, ছেলে সাদ এরশাদ ও ভাগ্নিজামাই জাপা নেতা প্রয়াত জিয়াউদ্দিন বাবলুর ফেস্টুন টাঙানো। দীর্ঘদিন রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ফেস্টুনগুলো ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। ৬৫ শতক জমির ওপর এরশাদের ব্যক্তিগত বাড়ি পল্লী নিবাস তিনতলা কমপ্লেক্স।

নিচতলায় একটি বড় সভাকক্ষ ছাড়াও রয়েছে স্টাফ ও ড্রাইভারদের রুম। ভবনের দোতলায় তিনটি গেস্ট রুমের সঙ্গে নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলোচনার জন্য উন্মুক্ত বড় ফ্লোর এবং তৃতীয় তলায় হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও তার ছেলের রুম রয়েছে। বাড়ির বড় আঙিনায় বাগানে অযত্ন অবহেলায় বেড়ে উঠছে কয়েকটা পাতাবাহার গাছ। এক মাস ধরে ভবনের দেয়ালগুলোতে রং করার কাজ শুরু হয়েছে। পল্লী নিবাসে পালাক্রমে নিরাপত্তাপ্রহরীর দায়িত্ব পালন করেন আজাদ হোসেন, জিয়া ও সাহেব আলী। দীর্ঘদিন ধরে পল্লী নিবাসের নিরাপত্তাপ্রহরীর দায়িত্ব পালন করা সাহেব আলী বলেন, ‘পল্লী নিবাসোত গানবাজনা নাই, হই-হুল্লোড় নাই। কায়ো মার্কা পায় নাই, কোনো উৎসব নাই। স্যার বাঁচি থাকাতে গেলবার কত মানুষ আসছিল, দিনে-আইতে (রাতে) মানুষের ভিড়। গানবাজনা, কত ভালো নাগছিল। অ্যালা সুনসান, কাইয়ো আসে না। বাড়ি ট্রাস্টের নামে চলি গেইচে, সেইজন্তে ন্যাতাকর্মীর ঘরের কোনো খবর নাই। এমপি থাকাতে মাঝেমধ্যে স্যারের বেটা সাদ বাবাজি এটে থাকি গেছিল। এইবার মার্কা পায় নাই, ওমার কোনো উদ্দিশও নাই। মনে হয় জেলখানাত বন্দি হয়া দিন পার করতোছি।’ 

মহানগর ছাত্রসমাজের সাবেক সভাপতি ইয়াসিন আরাফাত আসিফ বলেন, ‘পল্লী নিবাস আমাদের একটি আবেগের জায়গা। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ স্যারের স্কাই ভিউ পৈতৃক বাসা থাকলেও স্যার পল্লী নিবাসে থাকতে পছন্দ করতেন। আমরাও সব সময় সেখানে যেতাম। স্যার আমাদের নানা নির্দেশনা দিতেন। গত নির্বাচনেও আমরা পল্লী নিবাসে গিয়ে স্যারের নির্দেশনা শুনেছি এবং স্যারকে জয়ী করতে কাজ করেছিলাম। বর্তমানে পল্লী নিবাসের বাড়িটির সাথে আমাদের কোনো যোগাযোগ নেই। আমরা স্যারের মাজার জিয়ারত করে চলে আসি।’

জাতীয় পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান এস এম ইয়াসির বলেন, ‘জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ স্যার যত দিন বেঁচে ছিলেন তত দিন আমরা পল্লী নিবাসে যেতাম। স্যার ঢাকা থেকে রংপুরে এলে তাকে বরণ করে নিতাম। তখন পল্লী নিবাস নেতাকর্মীদের পদচারণায় মুখর ছিল। বর্তমানে যেহেতু বাড়িটি ট্রাস্টের আওতাধীন চলে গেছে, তাই আমরা শুধু স্যারের মাজার জিয়ারত করতে যাই। স্যারের বাড়ির সাথে এখন নেতাকর্মীদের কোনো সম্পর্ক নেই।’ 

জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান, রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর তার ‘পল্লী নিবাস’ বাসভবনটিকে এরশাদ জাদুঘর করার প্রস্তাব করেছিল নেতারা। দেশের কৃতী এ মানুষটি যেন সবার হৃদয়ে যুগ-যুগান্তর বেঁচে থাকেন সেজন্য এরশাদের জীবদ্দশায় নানা কর্মকাণ্ড-সম্পর্কিত বই, এরশাদের ব্যবহৃত নানা আসবাব, তার জীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এ বাড়িতে সংরক্ষণ করে রাখার প্রস্তাব ছিল। কিন্তু বাড়িটি ট্রাস্টের অধীনে চলে যাওয়ায় আমাদের এখানে করার কিছু নেই। আমরা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মাজার এলাকায় একটি কমপ্লেক্স করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

পল্লী নিবাস কমপ্লেক্সটি আগে ছোট ছোট কয়েকটি ভবনে ছিল। ২০১৮ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ পুরোনো ভবনগুলো ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেন। কিন্তু তার স্বপ্নের পল্লী নিবাস কমপ্লেক্স আর দেখে যাওয়া হয়নি। কাজ শেষ হওয়ার আগেই ২০১৯ সালের ১৪ জুলাই মৃত্যু হলে এখানেই শায়িত করা হয় তাকে। কিন্তু এরশাদের প্রাণহীন দেহটার মতোই প্রাণহীন তার পল্লী নিবাস। চারদিকে শুধুই শূন্যতা।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা