সাইফুল হক মোল্লা দুলু, মধ্যাঞ্চল
প্রকাশ : ২৭ ডিসেম্বর ২০২৩ ১৩:৫৫ পিএম
মাঠ জুড়ে সরিষার ফুল। ছবি : সংগৃহীত
কিশোরগঞ্জের মাঠে মাঠে এখন হলুদ রঙে রঙিন হয়ে উঠেছে। যেদিকেই চোখ যায় সেদিকেই শুধুই হলুদ সরিষার ফুল। প্রকৃতির নির্মল বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে সরিষা ফুলের ঘ্রাণ। এ ফুলের ঘ্রাণ আর মৌমাছির গুঞ্জন আকৃষ্ট করছে প্রকৃতিপ্রেমীদের। হালকা বাতাসের দুলনিতে হলুদ ঢেউ খেলে যায় সরিষা ক্ষেতে। শুধু প্রকৃতিই নয়, এই সরিষা ক্ষেত রঙিন করেছে কৃষকের মুখও। দ্বিগুণ লাভ হওয়ায় তারা ঝুঁকছেন সরিষা চাষের দিকে।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রবি মৌসুমে কার্তিক-অগ্রহায়ণের মাঝামাঝি পর্যন্ত সরিষার বীজ বপনের সময়। শীতকালে ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি মাসে সরিষা ফুলের হলুদে ছেয়ে যায় চারদিক। সাধারণত আমন ধান ঘরে তোলার পর খালি জমিতে সরিষার চাষ করা হয়। কার্তিক মাসে বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আগাছা পরিষ্কার করে হালচাষ ছাড়াই সরিষা বপন করা হয়। শীত-কুয়াশায় সরিষার ফলন ভালো হয়। আর রোপণের মাত্র ৮০-১০০ দিনের মধ্যে পাকা সরিষা ঘরে তোলা যায়। কম পুঁজিতে সরিষা চাষে দ্বিগুণ লাভ হয়। তাই দিন দিন সরিষা চাষে আগ্রহী হচ্ছেন কৃষকরা।
উন্নত জাতের সরিষা চাষ করে লাভবান হচ্ছেন চাষিরা। ফলে প্রতি বছরই বাড়ছে সরিষা চাষ। প্রচলিত দেশি সরিষার চেয়ে বারি-১২ ও বারি-৯ ফলন বেশি হওয়ায় চাষিরা আগ্রহী হচ্ছে বলে কৃষি বিভাগ জানিয়েছে। অনেকেই আমন ধান সংগ্রহের পর জমি ফেলে না রেখে সরিষা চাষ করেছেন। এরপর আবার ধান রোপণ করবেন কৃষকেরা। তাতে করে একই জমিতে বছরে তিনবার ফসল উৎপাদন হচ্ছে। এ ছাড়া সরিষা আবাদে সেচের প্রয়োজন হয় না।
এবার সরিষার বড় শত্রু জাব পোকারও আক্রমাণ দেখা যাচ্ছে না। সরিষার তেলের রয়েছে অনেক ঔষধি গুণ। সরিষার খৈল পশুখাদ্য ও জমির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধিও কাজে ব্যবহার হয়। সরিষার গাছ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এ ছাড়া সরিষার আবাদ করলে সরিষার পাতা পড়ে জমির উর্বরতা অনেকাংশে বৃদ্ধি পায়। জেলার করিমগঞ্জ উপজেলার গুজাদিয়া গ্রামে এ মৌসুমে সবচেয়ে বেশি সরিষার চাষ হয়েছে।
সদর উপজেলার কৃষক রাকিব মিয়া বলেন, ‘স্বল্প খরচে অধিক ফলন ও ভালো দাম পাওয়া যায়। তাই প্রতি বছর সরিষার চাষ বাড়ছে। তা ছাড়া বীজ বোনার সর্বোচ্চ ৭০ দিনের মধ্যে এ ফসল ঘরে তোলা যায়। পরে ধান চাষে কোনো সমস্যা হয় না। সামান্য পরিমাণ ইউরিয়া ছাড়া আর কোনো সার দেওয়ারও প্রয়োজন হয় না।’
হোসেনপুর উপজেলার ধনপুড়া গ্রামের মধু চাষি ওমর ফারুক বলেন, ‘জেলায় সরিষা চাষ বেড়ে যাওয়ায় মৌ খামার গড়ে তুলেছেন। প্রতিটি মৌ বাক্সে সপ্তাহে তিন থেকে পাঁচ কেজি মধু আহরণ করেন। মধু বিক্রি করে তিনি বেশ লাভবান হয়েছেন।’
চৌদ্দশ গ্রামের কৃষক শাহীন মিয়া জানান, এ বছর ১২ কাঠা নিচু জমিতে সরিষার চাষ করেছেন। গত বছর প্রায় ৮ কাঠা জমিতে সরিষা চাষে লাভ হওয়ায় এ বছর আরও বেশি করেছেন। আশা করছেন, প্রতি কাঠায় ৫০ থেকে ৬০ কেজি করে সরিষা পাবেন।
কৃষকরা জানান, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বিঘা প্রতি পাঁচ থেকে সাত মণ ফলন হতে পারে। আর কয়েকদিন পরেই সরিষা কাটা ও মাড়াই শুরু হবে। স্থানীয় তেলকলের মালিকরাই সরিষার প্রধান ক্রেতা। তবে মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়াদের খপ্পরে পড়ে কৃষকরা বেশিরভাগ সময় ন্যায্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর বারি-১২ ও টরি-৯ জাতের সরিষার চাষ বেশি হচ্ছে। তবে টরি-৯ জাতের তুলনায় বারি-১২ জাতের সরিষার দ্বিগুণ ফলন পাওয়া যায়। এবার জেলায় ৯ হাজার ৬৪৫ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। এখন পর্যন্ত আবাদ হয়েছে ৭ হাজার ৩৫০ হেক্টর। তবে আরও কিছু জমিতে সরিষা চাষ শুরু হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এবার লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে।
অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুস ছাত্তার বলেন, ‘বোরো ফসলের আগে অল্প সময়ে, কম খরচে অধিক লাভবান হওয়ায় সরিষা চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছে কৃষক। তা ছাড়া সরিষার পাতা জমিতে পড়ে পচে জৈবসার তৈরি করে। ফলে পরবর্তী বোরো আবাদে ইউরিয়া সারের পরিমাণ কম লাগে।’