এইচ এম হুমায়ুন কবির, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)
প্রকাশ : ২৭ ডিসেম্বর ২০২৩ ১৩:৩৩ পিএম
‘সাগর-নদীতে এখন প্রায়ই অস্বাভাবিক জোয়ার থাকে। স্রোতের তোড়ও বেশি। প্রায় প্রতিটি অমাবস্যা-পূর্ণিমায় থাকে বিপদ সংকেত। হঠাৎ বড় বড় ঢেউয়ের ঝাপটা। সাগরের মাঝে ট্রলার চালানোর উপায় থাকে না। গেল দুই মাসে অন্তত ১০ বার আবহাওয়া খারাপ হয়েছে।’ এভাবেই বঙ্গোপসাগরের বর্ণনা দিলেন ট্রলার মাঝি হারুন হাওলাদার। গত ২০ বছরেও এমন অবস্থা তিনি আর দেখেননি জানিয়ে বলেন, নম্বরবিহীন একটি ফিশিং বোটে কাজ করেন তিনি। একই কথা জেলে হাফিজুর রহমানের।
তিনি জানান, এমনিতেই গভীর সমুদ্রে ছাড়া ইলিশ মেলে না। তার ওপর চরম ঝুঁকি নিয়ে সাগরে যাওয়ার দুই দিন পরই আবহাওয়া খারাপ হয়ে যায় প্রায়ই। কখনও কিছু ইলিশ পান, কখনও খালি হাতে ফিরতে হয়। এক-দুবার জাল পাতার সুযোগ মেলে। অথচ একবার সাগরে যেতে দুই থেকে তিন-চার লাখ টাকা খরচ হয়। পুরো সময় থাকতে পারলে লোকসান হয় না।
এফবি লিমা ট্রলারে বাবুর্চির কাজ করেন ছোহরাব হোসেন। তিনি জানান, দেশ স্বাধীন হওয়ার এক বছর পর থেকে সমুদ্রগামী মাছ ধরা ট্রলারে বাবুর্চির কাজ করেন তিনি। তখন বরফ ছিল না। ৫০-৬০ মণ ইলিশ পেতেন একেকবারে। গভীর সাগরে যেতে হতো না। এখন গহিন সাগরে যেতে হয়। ঝড়-ঝাপটাসহ ডাকাতের কবলে পড়েছেন। সাগরে ভেসেছেন। ‘এহন সাগর যেন কেমন অইয়া গেছে’Ñ বলেন তিনি।
গত দুই মাসে চারটি বোট ডুবেছে সাগরে। গত বছর প্রতি ট্রলারে গড়ে লাখ টাকার ব্যবসা হয়েছে। এ বছর শতকরা ৯০ জন লাভের মুখ দেখতে পারেননি। জেলেরা বলছেন, বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে বিভিন্ন ধাপে ১৪৭ দিন নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ায় লাখো জেলে ও ব্যবসায়ীর মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে। জেলেরা যে সরকারি সহায়তা পান তা অপ্রতুল। ফলে তাদের জীবন কাটে চরম দুর্দশায়।
নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে মা ইলিশ ধরায় ২২ দিন, মার্চ-এপ্রিল ৬০ দিনের অভয়াশ্রমের শেষ না হতেই আবার ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে তারা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। জেলেরা বলছেন, এমনিতে করোনাকালে তাদের রোজগারের টান পড়ায় ঋণ আর ধারদেনায় জর্জরিত। এই ১৪৭ দিন ছাড়াও ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত জাটকা ধরায় ৮ মাসের নিষেধাজ্ঞা হয়েছে। শুধু জীবিকার তাগিদেই নয়, প্রতি মুহূর্তে ঝুঁকি নিয়ে মাছ শিকার করে অর্থনীতির চাকা সচল করছেন পেশাদার জেলেরা। উত্তাল সাগর ও বন্যার সময় জীবনযুদ্ধে হার-না মানা এসব সাহসী আত্মনির্ভরশীল মানুষ নির্ধারিত সময়ে কাঙ্ক্ষিত মৎস্য আহরণের লক্ষ্যে ছুটে যায় গভীর সমুদ্রসহ বিভিন্ন নদ-নদীতে। এ সময় উত্তাল সাগরে ট্রলার ডুবে গেলে কারও কারও খোঁজ স্বজনরা পেলেও অনেকেরই সলিল সমাধি হয়।
শাহজাহান মাঝি জানান, যদিও তারা বেতনভুক, তারপরও মনে শান্তি নেই। মালিকের লাভ না থাকলে কারও মন-মেজাজ ভালো থাকে না। উপজেলা মাঝি সমিতির সভাপতি নূরু মিয়া জানান, একদিকে নিষেধাজ্ঞা, আরেকদিকে বারবার আবহাওয়া খারাপ থাকায় বছরে বড়জোর পাঁচ মাসে সর্বোচ্চ ১৫ বার সাগরে যেতে পারছেন তারা। ১৫ ট্রিপে বাজার-সওদা নিয়ে কমপক্ষে ৩৫ লাখ টাকা খরচ আছে। এ ছাড়া জেলেদের পারিশ্রমিক তো আছেই। এরপর লাভের মুখ দেখতে হয়। তিনি বলেন, ‘এখন সাগরে ঘনঘন ঘূর্ণিঝড় হচ্ছে। পানির উচ্চতা বাড়ছে। তাপমাত্রা বাড়ছে। কিনারে মাছ আসছে না। সাগরের গভীরে যাওয়া লাগে। সিডরের পর থেকেই এমন দশা। এ বছর অবস্থা আরও খারাপ।’
মহিপুর মৎস্য বন্দরের মেসার্স ফয়সাল ফিশের মালিক গাজী ফজলুর রহমান বলেন, এ বছর আবহাওয়ার জন্য ২০-২২ জন জেলেসহ সাগরে গিয়ে এক রাত থাকার পর কিনারে ফিরে আসতে হয়েছে। এতে দুই-তিন লাখ টাকা খরচ হয়েছে। আবার কখনও মাছ পেলেও ৭ থেকে ১০ লাখ টাকায় বিক্রি করতে পেরেছেন। এভাবে শতকরা ৯০ ভাগ ট্রলারের মালিক গড়ে ৩০-৪০ লাখ টাকার লোকসানে আছেন।
কলাপাড়া ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির সহকারী পরিচালক আছাদউজ্জামান জানান, আইলার পর থেকে উপকূলীয় এলাকায় বর্ষা মৌসুমে অমাবস্যা-পূর্ণিমার জোতে সাগর-নদীতে অস্বাভাবিক জোয়ার বইছে। এতে নিচু এলাকা বেশি প্লাবিত হচ্ছে। ফলে মানুষের জীবনযাত্রায় বিরূপ প্রভাব পড়ছে।