কলাপাড়া (পটুয়াখালী) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৬ ডিসেম্বর ২০২৩ ১৩:২৭ পিএম
পটুয়াখলীর কলাপাড়ার রাখাইনন পল্লীতে কাপড় বুনছেন এক নারী। প্রবা ফটো
রাখাইনদের তাঁতে প্রথম দিকে পরিবারের চাহিদা মেটাতে কাপড় বোনা হতো। তাদের মধ্যে এমন প্রচলন ছিল, মেয়েরা হস্তচালিত তাঁত শিল্পের কাজ না জানলে তাদের বিয়ে হতো না। পরে তারা বাণিজ্যিকভাবে কাপড় বোনা শুরু করে। দেশব্যাপী কদর বাড়ে ঠিকই তবে দুর্বল বিপণন পদ্ধতির কারণে বেশি দূর যেতে পারেনি।
পটুয়াখালী অঞ্চলের রাখাইনদের উৎপাদিত চাদর, শার্ট পিস, ব্যাগ, শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা প্রভৃতি বস্ত্রের কদর দক্ষিণাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে। ঢাকা ও মিয়ানমার থেকে আমদানি করা রঙ-বেরঙের সুতা দিয়ে হস্তচালিত তাঁতে এসব বস্ত্র তৈরি করা হয়। কারুকাজখচিত এসব বস্ত্রের চাহিদা শীত মৌসুম ও ঈদে বেশি বেড়ে যায়। তবে কাঁচামালের দুষ্প্রাপ্যতা, উপকরণের দাম বৃদ্ধি, বাজার সংকট, আধুনিক যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের অভাব ও পুঁজি সংকটে ধুঁকছে রাখাইনদের এ তাঁত শিল্প।
কলাপাড়ার কুয়াকাটা পাড়ার খেনচান নামে এক রাখাইন নারী জানান, একসময়ে তাঁতের ওপরই নির্ভরশীল ছিল রাখাইন পরিবারগুলো। আগে সুতার দাম কম ছিল, এখন দাম বেড়ে গেছে, তাও আবার সব সময় পাওয়া যায় না। ঢাকা ও মিয়ানমার থেকে সুতা আনতে হয়। এখনও বাপ-দাদার পেশা ধরে রেখেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘একটি শার্ট পিস তৈরি করতে তিন দিন সময় লাগে। বিক্রি করা যায় ৫০০-৬০০ টাকা। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, কাঁচামাল ও উপকরণের দাম বৃদ্ধি, বাজার সংকট, আধুনিক যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের অভাব ও পুঁজিসংকটের মধ্যে আছি।’ তবে এজন্য সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাসহ পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতা পেলে সম্ভাবনা সুফল।
একাধিক রাখাইন নারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দক্ষিণাঞ্চলের বিশেষ করে কলাপাড়া উপজেলার বিভিন্ন মেগা উন্নয়ন হয়েছে, কিছু কিছু কাজ চলমান রয়েছে। এর মধ্যে পায়রা সমুদ্রবন্দর, কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, নৌঘাঁটি, দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবল ল্যান্ডিং স্টেশন, কুয়াকাটা পর্যটন কেন্দ্রের নানা উন্নয়ন উল্লেখযোগ্য।
এসব উন্নয়নের সুফলভোগী হচ্ছেন স্থানীয় রাখাইন সম্প্রদায়ও। তাদের উৎপাদিত পণ্যের বিপণন, বিভিন্ন সেক্টরে কর্মসংস্থান, জমির মূল্য বেড়ে যাওয়াতে রাখাইন জনগোষ্ঠীর জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে।
বর্তমানে উপকূলের পটুয়াখালী-বরগুনা জেলার ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জনসমাগম বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন করে বেড়েছে বিকিকিনিও। তা ছাড়া যোগাযোগ মাধ্যমের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে তাদের পণ্যের প্রসার ঘটবে বলে প্রত্যাশা রাখাইনদের।
বরিশাল আঞ্চলিক বিভাগের বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি মংচোথিন তালুকদার বলেন, ‘এ অঞ্চলে বসবাসরত রাখাইন সম্প্রদায়ের লোকসংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। কর্মসংস্থানের অভাবই এর প্রধান কারণ। বর্তমান সরকারের আন্তরিকতায় এ অঞ্চলের উন্নয়ন হচ্ছে। আমাদের ঐতিহ্য ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারব। আগে রাখাইন নারীরা মান্ধাতার আমলের তাঁতের কাপড় তৈরি করত। এখন অনেকে যন্ত্রচালিত তাতে কাপড় বুনছে। এতে বেকার রাখাইন নারীরা আগ্রহ প্রকাশ করছে। তবে সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে রাখাইনদের তাঁত শিল্পকে আরও যুগোপযোগী করার অনুরোধ জানাচ্ছি।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কলাপাড়া রাখাইন সম্প্রদায়ের ২৬টি পল্লী রয়েছে। এসব পল্লীতে ৩১৮ পরিবারে ১ হাজার ১৭৪ সদস্য রয়েছে। এখন কলাপাড়া, কুয়াকাটা ও গলাচিপায় রয়েছে দুই শতাধিক তাঁত। এসব তাঁতে ৬০০’র বেশি পেশাদার নারী কাপড় বুনন করেন। এর বাইরে বরগুনার বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে শতাধিক হস্তচালিত তাঁত। কোনো কোনো এলাকায় একই পরিবারে দুই থেকে তিনটিও তাঁত রয়েছে।
রাখাইনদের আলাদা বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতি, ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য, কৃষ্টি, প্রথা ও উৎসব বাঙালিদের মুগ্ধ করে। একসময়ে জায়গাজমি, ধনদৌলতে খুবই স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধ ছিল রাখাইনরা। তারা গড়ে তুলেছিলেন বড় বড় বৌদ্ধ বিহার (প্যাগোডা), শ্মশান (চে-শেই) ও শান বাঁধানো পুকুর। পালিত হতো ধর্মীয় অনুষ্ঠানসহ বৈশাখী পূর্ণিমা, চৈত্রসংক্রান্তি বা সাংগ্রান, নববর্ষ উদযাপনে জলকেলি উৎসবসহ নানা অনুষ্ঠান।বিয়ের অনুষ্ঠান, শ্রাদ্ধ, বৌদ্ধ বিহারাধ্যক্ষের মৃত্যু-পরবর্তী শ্রাদ্ধ আড়ম্বর পরিবেশে উদযাপিত হতো।
নানাবিধ সমস্যায় রাখাইনরা আর্থ-সামাজিক প্রতিযোগিতায় হোঁচট খেতে থাকে। ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে রাখাইন জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও। চল্লিশ দশকের শেষ ভাগে এ অঞ্চলে ২৪২টি রাখাইন পাড়া বা পল্লী ছিল। প্রবীণ রাখাইনরা জানান, সে সময়ে বরগুনা ও পটুয়াখালী জেলায় ৬০ হাজারের বেশি রাখাইন বসবাস করত। বর্তমানে তা ১০ হাজারের নিচে নেমে এসেছে। বহু রাখাইন পাড়া বিলুপ্ত হয়ে গেছে।