চট্টগ্রাম-১২ আসন
সুবল বড়ুয়া, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ২১ ডিসেম্বর ২০২৩ ১১:১৪ এএম
নৌকা ও ঈগল প্রতীক। ছবি : সংগৃহীত
প্রচার শুরু হতে না হতেই আওয়ামী লীগের দলীয় ও স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং তাদের অনুসারীদের রেষারেষিতে উত্তাপ বাড়ছে চট্টগ্রামের ভোটের মাঠে। অবশ্য প্রচার শুরুর আগে থেকেই শুরু হয়েছে সংঘাতের। মহানগরীসহ চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের মধ্যে অন্তত ১২টিতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও হামলার ঘটনা ঘটেছে।
চট্টগ্রাম-১৬ আসনের (বাঁশখালী) বর্তমান এমপি মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী এবারও আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী। তার সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঈগল প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি শিল্পপতি মুজিবুর রহমান। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বাঁশখালী উপজেলা সদরের উত্তর দিক থেকে মুজিবুর রহমানের সমর্থকরা স্লোগান দিতে দিতে দক্ষিণ দিকে যাচ্ছিলেন। তখন আওয়ামী লীগ কার্যালয় থেকে এমপি মোস্তাফিজের নেতৃত্বে তার কর্মী-সমর্থকরা নৌকা প্রতীকের স্লোগান দিতে দিতে উত্তর দিকে যাচ্ছিলেন। দুটি দল মুখোমুখি হলে তারা পাল্টাপাল্টি স্লোগান দিতে থাকেন। একপর্যায়ে দু’পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এতে জসীম উদ্দিন ও রনি দাশ নামে দুজন আহত হন।
এ প্রসঙ্গে ঈগল প্রতীকের সমর্থক ও আওয়ামী লীগ নেতা শ্যামল দাশ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা যখন ঈগল প্রতীকের সমর্থনে স্লোগান দিতে দিতে দক্ষিণ দিকে যেতে থাকি। তখন এমপি সাহেব (মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী) তার কর্মী-সমর্থক নিয়ে উত্তর দিকে আসছিলেন। এ সময় আমি সামনে পড়লে এমপি সাহেব আমাকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন। এতে আমাদের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা উত্তেজিত হয়ে ওঠে। আমি তাদের বুঝিয়ে সরিয়ে নিয়ে চলে যাই।’
এ অভিযোগ প্রসঙ্গে বাঁশখালীর এমপি মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরীর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে এই ঘটনায় চট্টগ্রাম-১৬ আসনে দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটির চেয়ারম্যান এবং যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আবু সালেম মোহাম্মদ নোমান দুই পক্ষকে আচরণবিধি লঙ্ঘনজনিত কারণে ব্যাখ্যা চেয়েছেন।
শুধু চট্টগ্রাম-১৬ আসন নয়; চট্টগ্রাম-০৩ (সন্দ্বীপ) আসনেও এরূপ সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। আসনটির আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী বর্তমান এমপি মাহফুজুর রহমান মিতা ও আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে ঈগল প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. জামাল উদ্দিনের কর্মী-সমর্থকের মধ্যেও মারামারির ঘটনা ঘটেছে।
গত সোমবার প্রচারণার প্রথম রাতেই সন্দ্বীপের সারিকাইতের শিবেরহাট ইউনিয়নে ঈগল প্রতীকের মিছিলে হামলার ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শিবেরহাট এলাকায় ওইদিন বিকালে নৌকা প্রতীকের কর্মী-সমর্থকরা মিছিল শেষ করার পর সন্ধ্যায় ঈগল প্রতীকের কর্মী-সমর্থকরা মিছিল বের করে। এ সময় সারিকাইত ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ফখরুল ইসলাম পনিরের নেতৃত্বে সন্ধ্যায় আবার মিছিল বের করে নৌকার সমর্থকরা। এ সময় মিছিল দুটি মুখোমুখি হয়ে যায়। এ সময় নৌকার সমর্থকরা অতর্কিতভাবে ঈগল প্রতীকের সমর্থকদের ওপর হামলা চালায়। এ ছাড়া মঙ্গলবার সন্দ্বীপের মুছাপুরের আলীমিয়ার বাজার ও হারামিয়ার এনাম নাহার মোড়ে একইভাবে ঈগল প্রতীকের প্রচারণায় হামলার ঘটনা ঘটে।
ঈগল প্রতীকের প্রার্থী ও স্বাচিপ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ডা. জামাল উদ্দিন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ইতোমধ্যে তিনটি স্থানে আমার কর্মী-সমর্থকের ওপর হামলা করা হয়েছে। নৌকাপ্রার্থীর কর্মী-সমর্থকরা অতর্কিতভাবে আমার সমর্থকদের মারধর করছে। নানাভাবে হুমকি দিচ্ছে। আমরা ইতোমধ্যে প্রশাসনকে জানিয়েছি। ভোটের সুষ্ঠু পরিবেশ চাই। অন্যথায় ভোটাররা কেন্দ্রবিমুখ হবে। এ বিষয়ে আমি নির্বাচন কমিশনে হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’
একইভাবে চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনেও নৌকা এবং ঈগল প্রতীকের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে হুমকি-ধমকি ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। আসনটির নৌকা প্রতীকের প্রার্থী চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরী এবং ঈগল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বর্তমান হুইপ সামশুল হক চৌধুরীর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে এ হামলার ঘটনা ঘটেছে।
গতকাল বিকালে পটিয়া উপজেলার কাশিয়াইশ ইউনিয়নে ঈগল প্রতীকের প্রার্থীর গাড়িতে হামলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন হুইপ সামশুল হক চৌধুরীর ছেলে নাজমুল করিম চৌধুরী সারুন। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘গণসংযোগের একপর্যায়ে আমার বাবা এক আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে দুপুরে ভাত খেতে অবস্থান করেন। তখন বাইরে রাখা গাড়িতে হামলা চালায় এবং গাড়ির চাকা ফুটো করে দেয় নৌকার সমর্থকরা। এ ছাড়া গত পরশুদিনও জিরি ইউনিয়নের ঈগল প্রতীকের সমর্থকদের ওপর হামলা চালায় এবং হুমকি দিচ্ছে। বিষয়টি আমরা প্রশাসন জানিয়েছি।’
তবে এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে জানিয়েছেন নৌকার প্রার্থী মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এসব সাজানো। ঈগল প্রতীকের প্রার্থী ও তার কর্মী-সমর্থকের ওপর আমাদের কোনো নেতাকর্মী বা কোনো সমর্থক হামলা করেনি। কোথায় হুমকিও দেয়নি। তারা উল্টো আমাদের কর্মী-সমর্থকদের হুমকি দিচ্ছে। বিভিন্ন এলাকার মেম্বারদের টাকা-পয়সা দিচ্ছে। পাশাপাশি নানাভাবে হুমকি-ধমকিও দিচ্ছে।’
এ ছাড়া চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসনে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী মাহবুব উর রহমান রুহেল ও ঈগল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. গিয়াস উদ্দিন, চট্টগ্রাম-৩ (ফটিকছড়ি) আসনে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী খাদিজাতুল আনোয়ার সনি ও তরমুজ প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী হোসাইন মো. আবু তৈয়ব, চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী এমএ লতিফের সঙ্গে কেটলী প্রতীকের প্রার্থী জিয়াউল হক সুমন, চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া) আসনে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী আবু রেজা মোহাম্মদ নেজামুদ্দিন নদভী ও ঈগল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী এমএ মোতালেবের মধ্যে প্রচারণার শুরুর পর থেকে বিভিন্ন স্থানে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া এবং মারামারির ঘটনা ঘটেছে।
এসব হামলা ও প্রতিকার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক আবুল বাশার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিভিন্ন আসনের প্রতিপক্ষ প্রার্থীদের একাধিক অভিযোগ আসছে। এসব বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের গঠিত অনুসন্ধান কমিটি কাজ করছে। ইতোমধ্যে অনেক প্রার্থীকে শোকজ করা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রার্থীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি সব প্রার্থীকে নির্বাচনী আচরণ বিধিমালা মেনে চলার অনুরোধ জানান রিটার্নিং কর্মকর্তা।’