বরগুনা সংবাদদাতা
প্রকাশ : ২০ ডিসেম্বর ২০২৩ ১১:০০ এএম
আপডেট : ২০ ডিসেম্বর ২০২৩ ১৮:২০ পিএম
সাগর থেকে ধরে আনা বিভিন্ন প্রজাতির মাছ রোদে শুকিয়ে শুঁটকি করা হচ্ছে। মঙ্গলবার বরগুনার তালতলীর আশারচরে। প্রবা ফটো
প্রচলিত নিয়মে সূর্যালোক ব্যবহার করে শুকানো হচ্ছে মাছ। উৎপাদন হচ্ছে শুঁটকি। দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণের জন্য শীত শুরু হওয়ায় বরগুনার পায়রা-বিষখালী নদীর মোহনা তালতলীর আশারচরে এ শুঁটকি উৎপাদন শুরু করেছেন জেলেরা। এ বছর প্রাকৃতিক উপায়ে বিষমুক্ত শুঁটকি উৎপাদন করার উদ্যোগ নিয়েছেন তারা। দুর্গম এ চরে উৎপাদিত শুঁটকি বাজারজাতকরণের জন্য সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, আশারচর শুঁটকি পল্লীতে ছয় শতাধিক জেলে ছোট ছোট ঘর তৈরি করে বাঁশের মাচায় ও মাদুরে করে রোদে মাছ শুকাচ্ছেন। একের পর এক মাছ ধরা ট্রলার সাগর থেকে আসছে। সেই মাছ প্রস্তুত হচ্ছে শুঁটকি উৎপাদনের জন্য। জেলে ও শুঁটকি ব্যবসায়ীরা জানান, প্রায় ২৫ প্রজাতির মাছের শুঁটকি তৈরি হয় এখানে। এর মধ্যে রূপচাঁদা, ছুরি, রামসুস, কোরাল, সুরমা, লইট্টা ও পোপা অন্যতম। এ ছাড়া চিংড়ি, ছুরি, ভোল, মেদসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছেরও শুঁটকি এখানে উৎপাদন হয়।
আর শুঁটকি উৎপাদনের জন্য শীতের শুরুতেই সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, মোংলাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে জেলেরা তালতলীর আশারচরে এসে মৌসুমি সংসার শুরু করেন। এখানে নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত চলে শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ। এই সময়টাতে শুঁটকি পল্লীর ক্রেতা, বিক্রেতা ও শ্রমিকদের শোরগোল থাকে। সব মিলিয়ে প্রায় ১০ হাজার লোক দিনরাত কাজ করে। আর তাদের সঙ্গে কমপক্ষে ৩-৪ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত। এ শুঁটকি পল্লীতে সপ্তাহে অন্তত ১০০ থেকে ১৫০ মণ শুঁটকি উৎপাদন হয়, যা দেশের বিভ্ন্নি প্রান্তে পাঠানো হয়। এদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিসহ ডিজেলের দাম বেশি থাকায় চিন্তায় পড়ছেন ব্যবসায়ীরা। এই ব্যবসায় লাভ হলেও এ বছর তেমন একটা হবে না বলে জানান তারা।
স্থানীয় শুঁটকি ব্যবসায়ী মো. জলিল বলেন, ‘আশারচরে তিন ধাপে কাজ করেন শুঁটকি পল্লীর শ্রমিকরা। প্রথমে জেলেরা নদী-সাগর থেকে মাছ শিকার করে শুঁটকি পল্লীতে নিয়ে আসেন। এরপর নারী শ্রমিকরা সেগুলো পরিষ্কার করে ধুয়ে মাচায় শুকাতে দেন। তিন-চার দিনের রোদে মাছগুলো শুকিয়ে শক্ত হয়। শুরু থেকেই প্রস্তুত থাকেন ক্রেতা, পাইকার ও ব্যবসায়ীরা। এ চরে উৎপাদিত শুঁটকি খুলনা, চট্টগ্রাম, সৈয়দপুর, জামালপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। প্রস্তুত করার সময় কোনো প্রকার কীটনাশক বা অতিরিক্ত লবণ দেওয়া হয় না, তাই এখানকার শুঁটকির চাহিদা বেশি বলেও জানান তিনি।
আরেক ব্যবসায়ী মো. জাফর বলেন, ‘বর্ষার কয়েক মাস ছাড়া বছরের বাকি সময়ে মোটামুটি হলেও সবচেয়ে বেশি শুঁটকি তৈরি হয় শীতকালে। এখানকার শুঁটকি মাছের গুঁড়ি সারা দেশে পোল্ট্রি ফার্ম ও ফিশ ফিডের জন্য সরবরাহ হয়ে থাকে। বর্তমানে প্রতি কেজি ছুরি মাছের শুঁটকি ৭০০-৮০০ টাকা, রূপচান্দা ১ হাজার থেকে দেড় হাজার, মাইট্যা ৮০০ থেকে এক হাজার, লইট্যা ৬০০ থেকে ৭০০, চিংড়ি ৭০০ থেকে ৯০০ এবং অন্যান্য ছোট মাছের শুঁটকি ৩০০ থেকে ৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতি বছর এখান থেকে অনেক টাকা রাজস্ব দেই সরকারকে। কিন্তু প্রধান সড়ক থেকে শুঁটকি পল্লী পর্যন্ত এক কিলোমিটার রাস্তাটা খুবই খারাপ। এই রাস্তা মেরামত হলে শুঁটকি সরাসরি ট্রাকে লোড দিতে পারব। এতে পরিবহন খরচ কম হবে। এ ছাড়া এখানে টয়লেট ও বিশুদ্ধ পানির কোনো ব্যবস্থা নেই। টিউবওয়েল ও টয়লেট নির্মাণ করে দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাই।’
অপর শুঁটকি ব্যবসায়ী রেজাউল করিম বলেন, ‘শুঁটকি তৈরি করার আগেই এখান থেকে সরকারিভাবে এসব শুঁটকি বিদেশে রপ্তানির উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক। কারণ দেশ থেকে সরকারিভাবে শুঁটকি রপ্তানির কোনো ব্যবস্থা নেই। ছোটবেলা থেকেই এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তাই অন্য পেশায় যেতে পারি না। এখন বাজারে সবকিছুর দাম বেশি থাকায় এ বছর ব্যবসা কেমন হবে তা নিয়ে চিন্তায় আছি।’
শুঁটকি ব্যবসায়ী জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘চরে গাড়ি বা ট্রাক আসতে পারে না তাই আমাদের অতিরিক্ত লেবার খরচ হয়। যাতায়াতের সুব্যবস্থা থাকলে খরচ কমে যেত। তাই আমাদের দাবি এখানে যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হোক।’
জানতে চাইলে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার দেব বলেন, ‘তালতলীর আশারচরের শুঁটকি পল্লীতে বিভিন্নভাবে কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। সংশ্লিষ্ট জেলে ও ব্যবসায়ীরা নির্বিঘ্নে যাতে ব্যবসা করতে পারেন সেজন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’