× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বিহঙ্গ

কারেন্ট জালে থেমে যাওয়া পাখির জীবন

আ ন ম আমিনুর রহমান

প্রকাশ : ২০ ডিসেম্বর ২০২৩ ১০:৪২ এএম

আপডেট : ২০ ডিসেম্বর ২০২৩ ১০:৪৭ এএম

মেঘনা নদীর চরে কারেন্ট জালে আটকা পড়ে মারা যাওয়া গো-শালিকের দেহাবশেষ। ছবি : লেখক

মেঘনা নদীর চরে কারেন্ট জালে আটকা পড়ে মারা যাওয়া গো-শালিকের দেহাবশেষ। ছবি : লেখক

দোসরা নভেম্বর ২০১২-এর শীতের সকালে পাখির খোঁজে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ ও কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার মাঝ দিয়ে বহমান মেঘনা নদীতে ঘুরে বেড়াচ্ছি। নদীর দুপাড়ের বিভিন্ন চরে নেমে নানা প্রজাতির পাখির ছবি তুলছি। এভাবে একসময় বেশ দূরে চলে এসেছি। একটি চরের কাছে নদীতে পোঁতা বাঁশের ওপর বেশকিছু পাখি দেখে সেদিকে নৌকা ঘোরালাম। ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রেখে শ’খানেক বক ও পানকৌড়ির দেখা পেলাম। ওদের ছবি তুলে চরে নামলাম। পুরো চরে সারি সারি জাল। যদিও কোনো মানুষের দেখা পেলাম না, কিন্তু বুঝতে বাকি রইল না যে, এটা জেলেদের মাছ ধরা ও জাল শুকানোর জায়গা। জালের কাছে আসতেই তাতে আটকে পড়া বিভিন্ন প্রজাতির ছোট মাছ, কাঁকড়া ইত্যাদি দেখলাম। বেশিরভাগই শুকিয়ে শুঁটকি হয়ে গেছে। আশ্চর্যের বিষয় সবগুলো জালই নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল।

কারেন্ট জালের সারি ধরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই আবিষ্কার করলাম জালের সূক্ষ্ম সুতোর ফাঁদে আটকে পড়ে মরে যাওয়া একটি গো-শালিকের মাথার খুলি, হাড়গোড় ও পালক। মৃত ও শুকিয়ে যাওয়া পাখির দেহাবশেষ দেখে মনটাই খারাপ হয়ে গেল। হয়তো খাবারের জন্য এখানে এসে পাখিটি কারেন্ট জালে আটকে মরে গেছে। অসহায় পাখিটিকে বাঁচানোর কেউ ছিল না। আর নদীর মাঝে কেইবা আসবে ওকে বাঁচাতে। ওর এই ক্ষুদ্র জীবনের কী মূল্য আছে নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ব্যবহারকারীদের কাছে। জেলেদের ওপর প্রচণ্ড রাগ হচ্ছিল।

দুর্ভাগ্যের ব্যাপার হলো, সেদিনের জালে আটকা পড়া মৃত পাখিটিই কিন্তু শেষ নয়। এরপরও দেশের বিভিন্ন স্থানে পাখির ছবি তুলতে গিয়ে কারেন্ট জালে পাখির মৃত্যু দেখেছি অনেক। অন্যান্য পক্ষীবিদ ও পক্ষী আলোকচিত্রীদের অভিজ্ঞতাও আমার মতোই।

একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, কারেন্ট জালের ব্যবহার শুধু মাছ ধরাতেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং তা পাখি, বাদুড় ইত্যাদির কবল থেকে ফল-ফসল-সবজি রক্ষায়ও ব্যবহার হচ্ছে। লিচুর মৌসুমে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লিচুগাছগুলোকে ঘিরে রাখা কারেন্ট জালে বহু মৃত পাখি ও বাদুড় দেখেছি। পুরো দেশের চিত্র একই রকম। কারেন্ট জাল শুধু নামেই নিষিদ্ধ। এর উৎপাদন ও ব্যবহার বন্ধ হয়নি মোটেও, বরং বেড়েছে।

সর্বশেষ গত ১১ নভেম্বর ভোরে বিরল ও দুর্লভ পাখির সন্ধানে পদ্মা সেতুর আশপাশের চরে গিয়ে কারেন্ট জালের ব্যাপক ব্যবহার দেখলাম। পাখির খোঁজে লৌহজংয়ের বেড়ামনগাঁও চর হয়ে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার কাঠালিয়া-চন্দ্রা চরে গেলাম। চরে নেমে কিছুটা সামনে এগোতেই কাশবনের ফাঁকে ফাঁকে বেশকিছু ধানক্ষেত দেখলাম। তবে আশ্চর্যের বিষয় সব ধানক্ষেতই নিষিদ্ধ ঘোষিত সূক্ষ্ম সুতোর কারেন্ট জালে ঘেরা। পাখির হাত থেকে ফসল রক্ষার চেষ্টা?

আমাদের দলের ১৩ জন অভিযাত্রীর মধ্যে সাতজন আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছবি তুলছে। আমিসহ বাকি ৬ জন ধানক্ষেতের আশপাশে ছিলাম। আমি, পক্ষী আলোকচিত্রী ফরিদী নোমান ও পাখিপ্রেমী সরোয়ার বিন আনিস কারেন্ট জালে পাখি আটকানো ও এর বিপদ নিয়ে আলাপ করছিলাম। এমন সময় হঠাৎই ধানটুনি (Zitting Cisticola) নামের ছোট্ট পাখিটি এসে ধানের পাকা শিষে ঠোঁট চালাল। দ্রুত ওর ছবি তুললাম। দুর্ভাগ্য পাখিটির, পরের শিষটিতে ঠোঁট চালাতে গিয়েই জালের মিহি সুতোর ফাঁদে আটকে গেল। জাল থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য সে যতই চেষ্টা করতে লাগল, ততই বেশি করে জড়িয়ে গেল। আমরা তিনজন পরস্পরের দিকে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে মুহূর্তেই করণীয় ঠিক করে ফেললাম।

জালসহ পাখিটিকে আলতো করে ধরে ছাড়াতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু পাখিটি জালে এতটাই জড়িয়ে গেছে যে, ছুরি দিয়ে কাটা ছাড়া ওকে মুক্ত করা যাচ্ছিল না। ফরিদী নুমানের কাছে একটি ছুরি ছিল। আমি জালের প্রতিটি সুতো আলগা করে ধরতে লাগলাম, আর সে ছুরি দিয়ে কাটতে লাগল। এভাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই পাখিটিকে মুক্ত করলাম। এরপর আলতো করে ওকে ছেড়ে দিলাম। কিন্তু দুর্ভাগা পাখিটি উড়তে গিয়ে দ্বিতীয়বার জালে জড়িয়ে পড়ল।

১ মিনিট দম নিয়ে আবারও জালসহ পাখিটিকে ধরলাম এবং একই প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি ঘটালাম। এবার পাখিটিকে মুক্ত করে কারেন্ট জালে ঘেরা ধানক্ষেত থেকে খানিকটা দূরে নিয়ে গেলাম। ওর বুকটা ধুঁক ধুঁক করছিল। আসলে দু-দুবার জালে আটকে পড়ে পাখিটি বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিল। তাই গালের কাছে নিয়ে আলতো করে আদর করলাম। এরপর ওকে ছাড়ার জন্য হাতের মুষ্টি খুললাম। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে পাখিটি উড়ল না। ছোট্ট অসহায় পাখিটিকে দেখে মায়া লাগছিল। ধানের শিষে ঠোঁট চালানোর সময় যেমন প্রাণবন্ত ছিল, জালে আটকানোর ধকলে একেবারে কাহিল হয়ে পড়ল। তাই মুক্তি পেয়েও কী করবে বুঝতে পারছিল না। কিছুটা ধাতস্থ হওয়ার পর উড়াল দিল। তবে বেশি দূর গেল না। পাশের ঝোপের ভেতর আশ্রয় নিল। বুঝতে পারলাম যে, সে এখানে খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে শক্তি সঞ্চয় করে চলে যাবে।

সেদিন আমরা ওখানে ছিলাম বিধায় পাখিটিকে বাঁচাতে পেরেছিলাম। কিন্তু প্রতিনিয়ত দেশের বিভিন্ন স্থানে কারেন্ট জালে আটকা পড়ে যে অগুনতি পাখি মারা যাচ্ছে, তাদেরকে কে বাঁচাবে? বেঁচে থাকার জন্য পাখি তথা যেকোনো প্রাণীরই খাদ্যের প্রয়োজন, সেটা ধান বা শস্যই হোক অথবা অন্য কোনো খাবার। যদি ছোট্ট একটি পাখি ধান বা শস্য খায়, তাতে কি ফসলের খুব বেশি ক্ষতি হবে? না, বরং ফসলের ক্ষতিকারক কীটপতঙ্গ খেয়ে প্রকারান্তরে ওরা কৃষকের উপকারই করছে। জেলে বা কৃষক যারাই কারেন্ট জাল ব্যবহার করছে, তারা কিন্তু এটা নিষিদ্ধ জেনেই করছে। তাই এটা এক ধরনের অপরাধ। নিজেদের আপাত লাভের আশায় পাখি হত্যা করে তারা শুধু দেশের আইনই অমান্য করছে না, বরং দেশের প্রকৃতি ও পরিবেশের ক্ষতি করছে। কাজেই সম্মানিত চাষি ও জেলে ভাইদের প্রতি অনুরোধ আপনারা ফল-ফসল-সবজি রক্ষা ও মাছ ধরার নামে নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ব্যবহার বন্ধ করুন। পাখি ও প্রকৃতি রক্ষায় এগিয়ে আসুন। আসুন আমরা নিজেদের সুস্থভাবে বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রকৃতির অলংকার পাখিদের রক্ষা করি।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা