শুনতে কী পাও
এম জাহেদ চৌধুরী, চকরিয়া (কক্সবাজার)
প্রকাশ : ১৩ ডিসেম্বর ২০২৩ ১২:০৩ পিএম
এককালের খরস্রোতা মাতামুহুরী নদী ভরাট হয়ে গেছে। নদীর প্রাণ ফেরাতে নেওয়া হয়েছে নতুন উদ্যোগ
দুই দশক আগেও খরস্রোতা মাতামুহুরী নদী বর্তমানে ভরাট হয়ে কক্সবাজার জেলার চকরিয়াবাসীর জন্য অভিশাপ হয়ে উঠেছে। অল্প বৃষ্টিতেই উজানের ঢলে প্লাবিত হচ্ছে ফসলি জমিসহ হাজার হাজার বসতি। আবার এ নদী পুঁজি করেই একাধিক অসাধু সিন্ডিকেট অবৈধ পন্থায় বালু উত্তোলন করে বনে গিয়েছেন লাখপতি।
ফলে নদীশাসন বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি সরকার হারাচ্ছে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব, অন্যদিকে দুর্দশা কাটছে না বাসিন্দাদের।
আশীর্বাদ থেকে অভিশাপে রূপ নেওয়া মৃতপ্রায় মাতামুহুরী নদী আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে এগিয়ে এসেছে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)।
পার্বত্য জেলা বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার গহিন অরণ্যে মিয়ানমার সীমান্তে মাতামুহুরী নদীর উৎপত্তি। এ নদী কক্সবাজারের চকরিয়া-পেকুয়া হয়ে মিশেছে বঙ্গোপসাগরে। দৈর্ঘ্যে ১৪৬ কিলোমিটার আর গড় প্রস্থে ১৫৪ মিটার। দুই দশক আগেও নদীতে অবাধে চলত ছোটবড় নৌযান। বৃষ্টি হলে মাতামুহুরী হয়ে পানি সমুদ্রে চলে যেত। ফলে পাহাড়ি ঢল নিয়ে চিন্তা ছিল না তীরবর্তী বাসিন্দাদের। কক্সবাজার ও বান্দরবানের পাহাড়গুলো থেকে অবাধে গাছ কাটার পাশাপাশি শেকড়সহ উত্তোলন ও পাহাড় কেটে পাথর ও মাটি-বালু আহরণের ফলে বৃষ্টির সঙ্গে ভেসে আসা পলিমিশ্রিত বালুতে মাতামুহুরীর তলদেশে ভরাট হয়ে গেছে।
২০১৬ সালে তৎকালীন পানিসম্পদ মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ মাতামুহুরী আশ্বাস দিয়েছিলেন নদী খনন করে ভাঙন ও প্লাবন থেকে রক্ষা করা হবে চকরিয়ার বন্যাকবলিত বাসিন্দাদের। তা বাস্তবে রূপ পায়নি। গত ১১ আগস্ট দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমানও চকরিয়ায বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শনে এসে ঘোষণা দেন শিগগিরই মাতামুহুরীর তীর রক্ষাবাঁধ নির্মাণ ও নাব্য ফিরিয়ে আনতে পরিকল্পিত ড্রেজিং করা হবে।
২০১৮ সালে কয়েক দফায় বরাদ্দ দেওয়া প্রায় ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে মাতামুহুরী সেতু পয়েন্ট থেকে ভাটি এলাকার কিছু অংশ ড্রেজিং শুরু হয়। ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত অপরিকল্পিত ড্রেজিংয়ের কোনো আলামতই নেই এখন। ড্রেজিংয়ের নামে বালু ব্যবসায় কিছু মানুষের পকেট ভারী হলেও নদীশাসনের সুফল পাওয়া যায়নি। কয়েক দফা পাহাড়ি ঢলের আগের চেয়েও ভরাট হয়ে গেছে নদী। সরকারের ৭ কোটি টাকা জলে গেছে বলেই অভিমত স্থানীয়দের।
এদিকে মাতামুহুরী নদী খনন না হওয়ায় আলীকদম, লামা, চকরিয়া ও পেকুয়ায় বর্ষা মৌসুমে অল্প বৃষ্টিতেই ভয়াবহ ঢলে প্লাবিত হয় হাজার হাজার ঘরবাড়ি। গত দুই দশকে নদী ভাঙনে হাটবাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ শত শত বসতি বিলীন হয়ে গেছে। হুমকির মুখে রয়েছে অসংখ্য আবাদি জমি ও স্থাপনা।
অন্যদিকে ভরাট মাতামুহুরীর বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে চলছে অবাধে বালু উত্তোলন। ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালালেও অবৈধ ব্যবসা থেমে নেই। অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের ফলে নদীতে সৃষ্টি হয়েছে চোরাবালির। যাতে আটকে প্রায়ই মারা যাচ্ছে শিশুসহ নারী-পুরুষ। এখন মাতামুহুরীর দুই তীর অল্প বৃষ্টিতেই তীব্র ভাঙন দেখা দেয়। হুমকির মুখে পড়েছে শুষ্ক মৌসুমে সেচ সুবিধার্থে বসানো দুটি রাবার ড্যাম। এ নদীর সঙ্গে একীভূত হওয়া অন্তত ২০টি ছড়া বা খাল ভরাট হয়ে বিপুল জমি সেচ সমস্যায় চাষাবাদ হচ্ছে না।
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেপি দেওয়ান বলেন, ‘মাতামুহুরীর চকরিয়া অংশে খনন ও তীররক্ষায় ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে উপজেলা পরিষদের মাসিক সভায় দীর্ঘদিন দাবি উঠে আসছে। এ দাবি রেজুলেশন আকারে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। এতে সরকারেরও নজর কেড়েছে। রাষ্ট্রীয় তৎপরতার কারণে মাতামুহুরীর তীররক্ষা ও ড্রেজিং করতে এগিয়ে এসেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জাইকা। তারা ইতোমধ্যে নদীশাসনকল্পে জরিপ শুরু করেছে। জরিপ শেষ হলেই ২০২৪ সালের পর মাতামুহুরীর হারানো যৌবন ফিরিয়ে আনতে পরিকল্পিত ড্রেজিং ও তীররক্ষার কাজ শুরু হবে।’