নুপি লান দিবস
ইসমাইল মাহমুদ, মৌলভীবাজার
প্রকাশ : ১২ ডিসেম্বর ২০২৩ ১৪:২২ পিএম
নুপি লান আন্দোলনের স্মরণে ইম্ফলের মূর্তি।
আজ ১২ ডিসেম্বর। ঐতিহাসিক মণিপুরি ‘নুপি লান (নারী বিদ্রোহ) দিবস’। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে মণিপুরি নারীদের দ্বারা সংঘটিত নারী বিদ্রোহ। ভারতের মণিপুর রাজ্যে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকদের শোষণের হাত থেকে মুক্তি পেতে এটিই ছিল নারীদের প্রথম সম্মুখ যুদ্ধ।
জানা যায়, ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতের মণিপুরে যখন চরম খাদ্যাভাব তখন যুদ্ধরত সৈনিকদের জন্য মণিপুর থেকে ধান ও চাল পাঠানো শুরু করে। এ অবস্থায় মণিপুর রাজ্যে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কায় চরমভাবে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন প্রজারা। ওই বছরের ১২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় নারী সমাবেশ ও দরবার ঘেরাও কর্মসূচি।
এ অবস্থায় স্টেট দরবারের প্রেসিডেন্ট মি. টিএ সার্প জানান, মণিপুরের মহারাজ স্যার চুড়াচান্দ সিংহের অনুমোদন ছাড়া সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। তখন মহারাজ স্যার চুড়াচান্দ সিংহ নবদ্বীপ ধামে অবস্থান করছিলেন। মণিপুরি নারীরা এ অজুহাত মেনে নিতে রাজি না হয়ে জোরপূর্বক স্টেট দরবারের প্রেসিডেন্টকে ধরে নিয়ে যায় টেলিগ্রাফ অফিসে। সেখান থেকে মি. সার্প ধান-চাল বাইরে না পাঠানোর অনুমোদন চেয়ে মহারাজ স্যার চুড়াচান্দ সিংহের কাছে রিটার্ন টেলিগ্রাম পাঠান। পরে মি. সার্প ফিরে যেতে উদ্যত হলে মণিপুরি নারীরা টেলিগ্রামের জবাব না আসা পর্যন্ত তাকে যেতে দিতে রাজি হননি।
দ্রুত খবরটি ছড়িয়ে পড়লে ৪র্থ আসাম রাইফেলস্ এর কমান্ডেন্ট মেজর বুলফিল্ডের নেতৃত্বে এক প্লাটুন সৈন্য টেলিগ্রাফ অফিসে এসে মি. সার্পকে মুক্ত করার চেষ্টা চালায়। মণিপুরি নারীরাও তাকে ছাড়তে রাজি নয়। এ অবস্থায় শুরু হয় সংঘাত। দুই দিন ধরে অভুক্ত মণিপুরি নারীরা ‘তেম’ (কাপড় বুননের সময় ব্যবহৃত কাঠের তৈরি এক দিক ঈষৎ ধারালো এক ধরনের দণ্ড) হাতে সৈন্যদের প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে। এ সময় মণিপুরি নারীদের অনেকেই আহত হন। টেলিগ্রাফ অফিস থেকে শীর্ষ মণিপুরি নারী নেত্রীদের ১০ জনকে বন্দি করা হয়। এ অবস্থায়ও অসমসাহসী মণিপুরি নারীরা পিছু হটে যায়নি। পরদিন ১৩ ডিসেম্বর মহারাজ স্যার চুড়াচান্দ সিংহ টেলিগ্রামে মণিপুর থেকে ধান-চাল অন্যত্র পাঠানো বন্ধ করার ঘোষণা দেন। পরে মি. সার্পকে মুক্তি দিয়ে আন্দোলনকারী মণিপুরি নারীরা ফিরে যান।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার রামনগর মণিপুরি পাড়ার প্রবীণ বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা ধীরেন্দ্র সিংহ জানান, সেই থেকে দিবসটিকে নারী বিদ্রোহ বা ‘নুপি লান দিবস’ হিসেবে প্রতি বছর বৃহত্তর সিলেটের বিভিন্ন মণিপুরি পাড়ায় পালন করে আসছে। এ আন্দোলনে- খোংনাং দেবী, তোঙ্গৌ দেবী, মুখী দেবী, কুমারী দেবী, অমুবী দেবী, লৈপাকলৈ দেবী, কাবী দেবী, ইবেমহল দেবী, রজনী দেবী, সানাতোম্বী দেবী, চাওবীতোন দেবী, অশংবী দেবী, তিংগোং দেবী, কবোকলৈ দেবী, পিশক দেবী প্রমুখ মণিপুরি নারী সাহসী ভূমিকা পালন করেছিলেন। নানা কর্মসূচির মাধ্যমে তাদের অবদানের কথা স্মরণ করা হয়।