রংপুর অফিস
প্রকাশ : ০৯ ডিসেম্বর ২০২৩ ০৯:৪৭ এএম
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ না নিচ্ছে না বিএনপি। ভোটযুদ্ধে নামা দলগুলোর মধ্যে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি (জাপা) ছাড়া বেশিরভাগই নামসর্বস্ব। ফলে নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণসহ উৎসবমুখর ভোট নিয়ে চ্যালেঞ্জ থাকছে দেশজুড়েই। তবে রংপুর জাপার ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত থাকায় দেশের অন্য এলাকার এখানকার চিত্র ভিন্ন হবে বলেই আশা করছেন আসন্ন নির্বাচনের মূল দুই প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ ও জাপার নেতারা। তাদের দাবি, কিছুটা চ্যালেঞ্জ থাকলেও এই এলাকায় উৎসবমুখর ভোটের লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা তূলনামূলকভাবে বেশি।
তবে ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন কিছু বিশ্লেষক ও সাধারণ ভোটার। তাদের দাবি, জাপার সঙ্গে আওয়ামী লীগের আসন ভাগাভাগি হওয়ার কথা শোনা যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত এ রকম সমঝোতা দেখা দিলে আগ্রহ হারাবেন ভোটাররা। তারা আরও বলেন রংপুরে বিএনপির যে বড় প্রভাব যে রয়েছে তার প্রমাণ একাদশ সংসদ নির্বাচন। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-জাপার সঙ্গে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল বিএনপি।
নগরীর সাতগাড়ার বাসিন্দা আব্দুর রহিম বলেন, রংপুরকে জাতীয় পার্টির ঘাঁটি দাবি করা হলেও বিএনপির বড় প্রভাব রয়েছে। গত নির্বাচনে সব কটি আসনে আওয়ামী লীগ ও মহাজোটের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল বিএনপি। তাই বিএনপি নির্বাচনে না আসায় ভোটকেন্দ্রে এবার ভোটারের উপস্থিতি কম হবে। সেই সঙ্গে নির্বাচনী উৎসব দেখা যাবে না।
সদর উপজেলার জামাল শেখ বলেন, ‘আওয়ামী লীগ-জাতীয় পার্টির নির্বাচন হবে। এর মধ্যে কিছু আসন আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভাগাভাগিও হয়ে যাওয়ার কথা শুনতে পাচ্ছি। এটি হলে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে ভোটারদের কদর থাকবে না। ২০১৪ সালের মতো ফাঁকা মাঠে নির্বাচিত হয়ে যাবেন প্রার্থীরা। আর যেসব ছোট দল অংশ নিয়েছে, তাদের কেউ চেনে না, নির্বাচনে বেশিরভাগের জামানত বাজেয়াপ্ত হবে বলে আমি মনে করছি।’
মহানগর সুজনের সভাপতি অধ্যক্ষ খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয়। সরকার সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার দিকে ঝুঁকেছে। গণতন্ত্র টেকসই করতে হলে নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। যেহেতু বিএনপি একটি বৃহৎ দল, তারা একাধিকবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল। তারা নির্বাচনে না আসায় ভোট উৎসব থেকে আমরা বঞ্চিত হব।’
তবে উৎসবমুখর নির্বাচন নিয়ে আশাবাদী জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগ নেতারা। তারা বলেন, জাতীয় পার্টি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকায় উৎসবমুখর ভোট নিয়ে আশা করাই যায়। জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান ও রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা বলেন, ‘নির্বাচনে বিএনপি জোট না আসায় আমাদের প্রার্থীরা সেই ভোটগুলো নেওয়ার চেষ্টা করবে। এ ছাড়া নির্বাচনে জাতীয় পার্টির বাইরের যেসব দলের প্রার্থী অংশ নিয়েছে, সেসব দল নামসর্বস্ব। তাই আগামী নির্বাচনে জাতীয় পার্টির পক্ষে নীরব ভোট বিপ্লব হবে আশা করছি।’
রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘আশা করছি প্রতীক বরাদ্দের পর নির্বাচনী মাঠ সরগরম হবে। প্রতি পাঁচ বছর পর দেশের মানুষ ভোট উৎসবে মেতে উঠতে চায়। বিএনপি-জামায়াত জোট এই ভোট উৎসবকে বানচাল করতে দেশে নানা বিশৃঙ্খলা করে মানুষের মনে আতঙ্কও তৈরি করেছে। তবে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশৃঙ্খলাকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।’
রংপুর-৪ (পীরগাছা-কাউনিয়া) আসনে সংসদ সদস্য বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, ‘চারদিকে মানুষের মাঝে ভোটের উৎসব লক্ষ করা যাচ্ছে। বিএনপি থেকেও অনেকে নির্বাচনে এসেছেন। আমরা আশা করছি উৎসাহব্যঞ্জক, প্রতিযোগিতামূলক উপস্থিতির মাধ্যমে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
নামসর্বস্ব দলই বেশি
রংপুরের ৬টি সংসদীয় আসনে আওয়ামী লীগ, জাপাসহ ১৪টি দল অংশগ্রহণ করছে। দলীয় ও স্বতন্ত্র মিলে ৬টি আসনে মোট বৈধ প্রার্থীর সংখ্যা ৩৯ জন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ৬ জন, জাতীয় পার্টির ৬ জন, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির ১ জন, জাকের পার্টির ২ জন, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির ৫ জন, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির ১ জন, তৃণমূল বিএনপির ১ জন, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের ১ জন, বাংলাদেশ কংগ্রেসের ৪ জন, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির ২ জন, জাসদের ১ জন, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট-বিএনএফের ১ জন, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের ১ জন এবং ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের ১ জন এবং স্বতন্ত্র হিসেবে ৬ জন প্রার্থী নির্বাচনে রয়েছেন।
৩৯ প্রার্থীর মধ্যে ২৮ জনেরই প্রথম
রংপুর জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে বৈধ প্রার্থীদের তালিকা ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, রংপুরের ৬টি সংসদীয় আসনে ৩৯ জন প্রার্থীর মধ্যে প্রথমবারের মতো ২৮ জন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। রংপুর-১ আসনে ১১ জন প্রার্থীর মধ্যে জাপার প্রার্থী হোসেন মকবুল শাহরিয়ার আসিফ, স্বতন্ত্র প্রার্থী মসিউর রহমান রাঙ্গা ও স্বতন্ত্র প্রার্থী আওয়ামী লীগের আসাদুজ্জামানের নির্বাচন করার অভিজ্ঞতা থাকলেও বাকি ৮ জন নবাগত। রংপুর-২ আসনে ৩ জন প্রার্থীর মধ্যে আওয়ামী লীগের আবুল কালাম মো. আহসানুল হক চৌধুরী ডিউক ও জাতীয় পার্টির প্রার্থী আনিসুল ইসলাম মণ্ডল ইতঃপূর্বে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করেছেন। রংপুর-৩ আসনে ৮ জন প্রার্থীর মধ্যে জাপার চেয়ারম্যান জি এম কাদের ছাড়া সবাই জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নবাগত। রংপুর-৪ আসনে ৪ জন প্রার্থীর মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রার্থী টিপু মুনশি ও জাপার প্রার্থী মোস্তফা সেলিম বেঙ্গল ছাড়া বাকি দুইজন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নবাগত। রংপুর-৫ আসনে ৮ জনের সবাই প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচন করছেন। রংপুর-৬ আসনে ৫ জন প্রার্থীর মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শিরীন শারমিন চৌধুরী, জাতীয় পার্টির প্রার্থী নুর আলম মিয়া এবং ন্যাশনাল পিপলস পার্টির প্রার্থী হুমায়ুন ইজাজের জাতীয় সংসদ নির্বাচন করার অভিজ্ঞতা রয়েছে।
জানতে চাইলে মহানগর সুজনের সভাপতি অধ্যক্ষ খন্দকার ফখরুল আনাম বলেন, নির্বাচন এলে কিছু নামসর্বস্ব দলকে দেখা যায় নির্বাচনে অংশ নিতে। তারা নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন নিয়ে মাঠে থাকে না। জনগণের সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ নেই। এসব দল নির্বাচনে এলেও তারা ভোটারদের নির্বাচনমুখী করতে পারবে না। এ ছাড়া রংপুরে এবার বেশিরভাগ প্রার্থীই জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো অংশগ্রহণ করছে। তাই বিএনপির নির্বাচন বয়কট, নামসর্বস্ব দলের নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং বেশিরভাগ নতুন প্রার্থীর প্রথম নির্বাচন হওয়ায় ভোট উৎসবমুখর হবে না তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।