এস এম রানা, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ০৬ ডিসেম্বর ২০২৩ ১৪:৪০ পিএম
আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০২৩ ১৪:৪২ পিএম
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও তাদের মিত্রদলগুলো অংশগ্রহণ করছে না। আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্রদলগুলো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এ ছাড়াও নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বেশকিছু পুরোনো ও নতুন দল। এসব নতুন-পুরোনো দল সম্পর্কে জানেন না চট্টগ্রামের অধিকাংশ ভোটার। দল যেমন অচেনা, তেমনি বেশিরভাগ ভোটারের কাছে দলীয় প্রার্থীরাও অচেনা।
চট্টগ্রামের রিটার্নিং অফিসার আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান ৪ ডিসেম্বর বৈধ প্রার্থীদের একটি তালিকা প্রকাশ করেছেন। সেই তালিকার তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, চট্টগ্রামের ১৬টি আসন থেকে ২৩টি রাজনৈতিক দল এবং স্বতন্ত্রসহ মোট ১৪৮ প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। যাচাই-বাছাই পর্যায়ে ৩২ প্রার্থীর মনোয়নপত্র বাতিল হয়। বাকি ১১৬ জনের মনোনয়ন বৈধ ঘোষিত হয়েছে।
বৈধ প্রার্থীদের রাজনৈতিক দল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তারা ২৩টি দল এবং স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এই ২৩ দলের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চট্টগ্রামে স্থানীয় পর্যায়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল, বাংলাদেশ তরীকত ফেডারেশন, সাম্যবাদী দল এবং বিকল্পধারাসহ মাত্র সাতটি দলের পরিচিতি আছে চট্টগ্রামের ভোটারদের কাছে। বাকি ১৫ দলের উল্লেখযোগ্য পরিচিতি নেই। এসব দলের প্রতীক কী এবং আসনগুলোতে যারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, এলাকায় তাদেরও নেই তেমন পরিচিতি।
বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্টের (বিএনএফ) প্রার্থী মোহাম্মদ ইউসুফ দীর্ঘদিন এলাকায় রাজনীতি করছেন। চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসন থেকে মনোনয়ন সংগ্রহ করেছেন তিনি। কিন্তু তার দলের পরিচিতি এবং মিরসরাইয়ের গ্রামপর্যায়েও দলটির সুসংগঠিত দলীয় কোনো কাঠামো নেই। এ ছাড়াও বাংলাদেশ মুসলিম লীগ নামের দলটির পরিচিতি ছিল স্বাধীনতার আগে-পরে। কিন্তু দলটি এখন প্রায় বিলুপ্ত। এই দল থেকে মিরসরাইয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ঢাকার পুরানা পল্টন তোপখানা রোড এলাকার বাসিন্দা শেখ জুলফিকার বুলবুল চৌধুরী। এলাকায় তার ওই অর্থে পরিচিতি নেই। একসময়ের পরিচিত মুসলিম লীগ প্রার্থী দিতে সক্ষম হয়েছে শুধু এ আসনেই। বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট ও বাংলাদেশ মুসলিম লীগের দুই প্রার্থীর বিষয়ে কথা হয় মিরসরাইয়ের করেরহাট এলাকার বাসিন্দা ব্যবসায়ী সাইদুজ্জামান কাজলের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘মুসলিম লীগ এবং বিএনএফের কার্যক্রম মিরসরাইয়ে নেই। কোনো কর্মসূচিও চোখে পড়েনি কখনও। যে দুজন প্রার্থী হয়েছেন তাদের চিনি না। তবে জুলফিকার বুলবুল চৌধুরীর গ্রামের বাড়ি মিরসরাইয়ে বলে শুনেছি।’
চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসন থেকে প্রার্থী হয়েছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির (বিএসপি) প্রার্থী মোহাম্মদ নুরুল আনোয়ার। ২০২৩ সালের ১০ আগস্ট নিবন্ধন পাওয়া দলটির সাংগঠনিক কাঠামো সন্দ্বীপে বিস্তার করা সম্ভব হয়েছে কি না জানতে চাইলে নুরুল আনোয়ার বলেন, ‘আমরা উপজেলা পর্যায়ে কমিটি গঠন করে কার্যক্রম চালাচ্ছি। পর্যায়ক্রমে ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে কমিটি গঠিত হবে। আমাদের দলীয় প্রতীক একতারা নিয়ে নির্বাচন করছি।’
চট্টগ্রাম-১২ পটিয়া আসনে বাংলাদেশ কংগ্রেস দল থেকে প্রার্থী হয়েছেন সৈয়দ মুহাম্মদ জয়নুল আবেদীন। ফারুকীপাড়া এলাকার ভোটার মহিদ ফারুক বলেন, ‘বাংলাদেশ কংগ্রেস নামে কোনো রাজনৈতিক দল আছেÑ সেটাই তো আমি জানি না। দলটির কার্যক্রম সম্পর্কে বা প্রতীক কীÑ এ বিষয়ে কিছু জানি না।’ বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটের তথ্য মতে, দলটি নিবন্ধন পায় ২০১৯ সালের মে মাসে। দলটির চেয়ারম্যান হিসেবে অ্যাডভোকেট কাজী রেজাউল হোসেন এবং মহাসচিব পদে অ্যাডভোকেট ইয়ারুল ইসলামের নাম রয়েছে এবং নির্বাচনী প্রতীক ডাব। দলটি ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠা পেলেও এর সাংগঠনিক কার্যক্রম পটিয়ার ভোটারদের কাছে অচেনা।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) থেকে পদত্যাগ করে ২০১৩ সালে ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা গঠন করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট (বিএনএফ) নামের দল। নিবন্ধিত দলটিরও দৃশ্যমান কার্যক্রম নেই চট্টগ্রাম-১৪ তথা চন্দনাইশ ও সাতকানিয়া এলাকায়। কিন্তু এই আসন থেকে দলটি থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন গোলাম ইসহাক খান। বিএনএফ বিষয়ে চট্টগ্রাম-১৪ আসনের ভোটার হারুনুর রশিদ বলেন, ‘বাংলাদেশের মূলধারার রাজনৈতিক দল ও তাদের প্রতীক সম্পর্কেই জানি। ক্ষেত্র বিশেষে দলগুলোর প্রার্থীদের বিষয়েও জানি। অচেনা দলের বিষয়ে আপনাদের আগ্রহ থাকলেও ভোটার হিসেবে আমার কোনো আগ্রহ নেই।’
পর্যালোচনার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল শুধু চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। সেখানে প্রার্থী হয়েছেন সাবেক শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া। চট্টগ্রামের বাকি ১৫ আসনে দলটির প্রার্থী নেই।
বাংলাদেশ তরীকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন চট্টগ্রাম-২ আসনের প্রার্থী সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী। চট্টগ্রামে তার দলের পরিচিতি থাকলেও দলটি শুধু চট্টগ্রাম-২ এবং চট্টগ্রাম-১৪ আসনে প্রার্থী দিয়েছে। চট্টগ্রামে বিকল্পধারা বাংলাদেশের পরিচিতি থাকলেও দলটি শুধু চট্টগ্রাম-২ আসনে প্রার্থী দিতে সক্ষম হয়েছে। বিলুপ্তপ্রায় জাকের পার্টিরও পরিচিতি চট্টগ্রামে খুব বেশি নেই। শুধু চট্টগ্রাম-৩ আসন থেকে দলটির প্রার্থী হয়েছেন নিজাম উদ্দীন নাছির। কিন্তু সমর্থনকারী অন্য আসনের ভোটার হওয়ায় তার ফরমটি বাতিল হয়ে যায়।
একইভাবে বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট নামের দলটি চট্টগ্রাম-৩ এবং ১৫ আসনে প্রার্থী দিয়েছে। অন্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে ইসলামী ঐক্যজোট চট্টগ্রাম-১৫ এবং ১৬ আসনে প্রার্থী দেয়। তবে ১৬ আসনের প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে যায় বাছাইপর্বে। এ ছাড়া খেলাফত আন্দোলন চট্টগ্রাম-১৩, জাতীয়তাবাদী আন্দোলন চট্টগ্রাম-১২, গণফোরাম চট্টগ্রাম-১১, ন্যাপ চট্টগ্রাম-৯ এবং ১৬ আসন থেকে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে। এসব দল এবং প্রার্থীদের বহুল পরিচিতি নেই এলাকায়।
বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীকের কারণে দলটির অল্প পরিচিতি আছে চট্টগ্রামে। কল্যাণ পার্টি এবার এই জেলা থেকে চারটি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম-৫ আসনে মুহাম্মদ ইবরাহিম নিজে। বাকি তিন আসনে প্রার্থী দিলেও স্থানীয়ভাবে তাদের পরিচিতি নেই এলাকায়।