মো. শামীম মিয়া, নরসিংদী
প্রকাশ : ০৬ ডিসেম্বর ২০২৩ ১১:২২ এএম
এক পা নিয়েই জীবনযুদ্ধে লড়াই করে চলছেন হুরুন আলী
প্রখর রোদ। দুপুর ১২টা। চোখমুখে ক্লান্তির ছাপ নিয়ে যাত্রীর অপেক্ষায় পঞ্চাশোর্ধ্ব ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালক হুরুন আলী। এক পায়ে অটোরিকশা চালিয়ে ৩ ছেলে, ৪ মেয়ে, স্ত্রীসহ ৯ জনের পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন তিনি। গ্রামের বাড়ি রায়পুরা উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চল বাঁশগাড়ী ইউনিয়নে।
ছয় বছর আগে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে দুপক্ষের সংঘর্ষে একটি পা হারিয়ে পঙ্গুত্ববরণ করেন। চিকিৎসা আর সংসারের খরচ চালাতে সহায়সম্বল সব বিক্রি করে নিঃস্ব হয়ে যান।
নরসিংদীর চরাঞ্চলে ভয়াবহ ও অন্ধকার অধ্যায় টেঁটাযুদ্ধ। পান থেকে চুন খসলেই টেঁটা নিয়ে মরণযুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছে এখানকার মানুষ। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘটিত টেঁটাযুদ্ধে নিহত এবং আহত হয়ে পঙ্গুত্ববরণ করেছেন অনেকে। অনেকে হারিয়েছেন স্বামী-সন্তানসহ প্রিয়জন। এমনই এক সংঘর্ষে পা হারান হুরুন আলী। জীবনের গল্পও তার বিভীষিকাময়। ভাগ্যাহত মানুষটি দমে যাননি। অদম্য ইচ্ছার জোরে রিকশা চালিয়ে জীবনের চাকা ঘোরানোর চেষ্টা করছেন।
কথা হয় হুরুন আলীর সঙ্গে। এই শরীর নিয়ে কেন রিকশা চালান, প্রশ্ন করতেই তার উত্তর মেলেÑ ‘না চালাইয়া করুম কী, খামু কী! পা নাই তো কী অইছে, মনের জোর তো আছে।’
মনের সেই ইচ্ছাশক্তি নিয়েই এক পায়ে অটোরিকশা চালান তিনি। রাস্তায় থাকা ছোট গর্ত কিংবা খানাখন্দে রিকশা আটকে গেলে বেগ পেতে হয় তাকে। তবে সারা দিন রিকশা চালাতে পারেন না হুরুন আলী। সন্ধ্যার মধ্যেই বাড়ি ফেরেন। যে টাকা রোজগার হয় তা দিয়েই সংসার চালান তিনি।
হুরুন আলী জানান, এলাকার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুটি বিবদমান গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ চলাকালে ২০১৭ সালের ২০ নভেম্বর একটি গুলি এসে লাগে তার ডান পায়ে। সেই গুলিতে তার ডান পা হারাতে হয়। দীর্ঘদিন ঢাকা পঙ্গু হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, নরসিংদী জেলা হাসপাতালসহ বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে খরচ হয় প্রায় ৮ লাখ টাকা। চিকিৎসার ব্যয় চালাতে গিয়েই বিক্রি করতে হয় জমি। একপর্যায়ে গ্রামে ফিরে তিনি দীর্ঘদিন বেকার ছিলেন। ৭ সন্তানসহ ৯ জনের ভরণপোষণ জোগান দিতে গ্রামে থাকা জমিগুলোও বিক্রি করে দেন তিনি। পরে জীবিকার তাগিদে একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা কেনেন। অটোরিকশা চালিয়ে পরিবারের ৯ সদস্যের ভরণপোষণ চালানো তার পক্ষে মোটেও সহজ ছিল না।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে হুরুন আলী বলেন, ‘আমি শুধু আমার পা হারাইনি, সাথে হারিয়েছি আমার ছোট ভাইকেও। আজ প্রায় ৬ বছর যাবৎ আমার ছোট ভাই আজিজুল ইসলাম নিখোঁজ। ২০১৭ সালের ২৬ মে আমার ছোট ভাই আজিজুল ইসলামকে পুলিশ প্রকাশ্য দিবালোকে ধরে নিয়ে যায়। আমার ভাইয়ের খোঁজ নিতে ওই দিনই সন্ধ্যায় রায়পুরা থানায় গেলে সেখানে তাকে পাওয়া যায়নি। রায়পুরা থানা-পুলিশ তাকে ধরে আনেনি বলে জানায়। পরে আমরা নরসিংদী পুলিশ সুপার কার্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে খোঁজখবর নিলেও কেউ তাকে ধরে আনার বিষয়টি স্বীকার করেনি। আমি আমার ভাইয়ের পথ চেয়ে বসে আছি। আমি তাকে ফিরে পেতে চাই।’